প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
রামায়ণ পড়লে জানা যায়, ভগবান রাম লঙ্কা অভিমুখে বানরসেনাকে দিয়ে এক সেতু নির্মাণ করান যাকে বলে রামসেতু। ভারতের বহু মানুষের বিশ্বাস, আজও সেই সেতুর ভগ্নাংশ রয়ে গেছে ভারতের রামেশ্বরম দ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কার মান্নার দ্বীপ-এর মাঝখানে। কিন্তু এই রামসেতু কি আদতেই প্রাচীন নির্মাণ? না কি এ কেবল প্রাকৃতিকভাবে গঠিত চুনাপাথরের স্তর?
রামসেতু কোথায় অবস্থিত?
রামসেতু, বা আধুনিক নামে অ্যাডামস ব্রিজ, রয়েছে ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত রামেশ্বরম দ্বীপ (পম্বন) এবং শ্রীলঙ্কার উত্তর-পশ্চিমের মান্নার দ্বীপ-এর মাঝখানে।
এই অংশে সমুদ্রের জল খুবই অগভীর
✅ কোথাও মাত্র ১ থেকে ১০ মিটার গভীর
✅ বহু অংশেই জল সরে গেলে চরে হেঁটে যাওয়া সম্ভব
এই অঞ্চলটি পক প্রণালী (Palk Strait) নামে পরিচিত এবং এখানেই বিস্তৃত রয়েছে রামসেতু। বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ব বলছে রামসেতু মূলত তৈরি হয়েছে লাইমস্টোন বা চুনাপাথরের শিলা ও বালির চরের জোগান থেকে। এই অংশে বহু বছরের জোয়ার-ভাটার প্রভাবে ও পলি জমার ফলে একাধিক খণ্ড খণ্ড শিলাচর গড়ে ওঠে, যেগুলি আজও উপগ্রহচিত্রে স্পষ্ট। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-এর উপগ্রহচিত্রও এই অঞ্চলে একটি নৈসর্গিক ভূগঠনের প্রমাণ দেয়। তবে এই ভূগঠনের একটি বিস্ময়কর দিক তার সোজা রেখায় বিস্তার যা অনেকের কাছে প্রকৃতির নয়, বরং মানুষের নির্মাণ বলেই মনে হয়।
বিশ্বাস বনাম বাস্তবতা
লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাস, এটি ভগবান রামের নির্দেশে বানানো সেতু, যাতে লঙ্কায় পৌঁছে সীতা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের বহু স্থানে আজও সেতুবন্ধন উৎসব পালন করা হয়। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI), ISRO ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা একে প্রাকৃতিক শিলাচর ও লাইমস্টোন ব্যাঙ্ক বলে মনে করেন।রেডিওকার্বন ডেটিং অনুসারে, এই অংশের শিলা ও বালির বয়স ৪০০০-৭০০০ বছর হতে পারে, যা রামায়ণের কালের সঙ্গে কিছুটা মিলে গেলেও মানবনির্মাণের সরাসরি প্রমাণ নেই।
রামসেতু ও আধুনিক বিতর্ক
বহু বছর ধরে সেতুসমূহ তৈরির প্রকল্প (Sethusamudram Project) এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ঝুলে রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই চুনাপাথরের স্তর ভেঙে সমুদ্রপথ তৈরি করলে বিশ্বাসীদের আবেগে আঘাত লাগতে পারে। তাই একে ঘিরে রয়েছে রাজনীতি, আবেগ, বিজ্ঞান ও পরিবেশের এক জটিল সমীকরণ।
রামসেতু একদিকে পুরাণের ঐতিহ্য, অন্যদিকে ভূগোলের বিস্ময়। হয়তো একে আমরা কখনো পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারব না তবে এটুকু নিঃসন্দেহ, এই অঞ্চল শুধু ভৌগোলিক নয়, মানবিক ও সাংস্কৃতিক ভাবেও এক ঐতিহাসিক বন্ধনরেখা। রামসেতু তাই শুধু এক জলতলের শিলা নয় তা এক মনের ভিতর জেগে থাকা সেতু, যা বিজ্ঞান আর বিশ্বাসকে যুক্ত করে রাখে।