19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পুজোর সময় পায়ে আলতা পড়েন কেন মহিলারা জানেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


পায়ে আলতা একটি ছোট্ট অথচ অত্যন্ত অর্থবহ উপাদান, যা বছরের বিশেষ সময়ে, বিশেষত দুর্গাপুজোর মতো পার্বণে বাংলার ঘরে ঘরে মহিলাদের সাজে একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আলতা শব্দটি শুনলেই মনে পড়ে লাল রঙে রাঙা পা, সাদা শাড়ির পাড়ে লাল রঙের ঝলক, আর তার সঙ্গে এক অপূর্ব নারীত্বের ছটা। কিন্তু কেন এই প্রথা? কেন বাঙালি নারী দুর্গাপুজোর সময় বিশেষভাবে পায়ে আলতা পরেন? এ কি কেবল সাজের জন্য, নাকি এর পিছনে আছে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা আয়ুর্বেদিক কোনো গভীর তাৎপর্য? এই প্রবন্ধে আমরা সেইসব দিককে বিশ্লেষণ করব ঐতিহ্য থেকে বিজ্ঞান, পুরাণ থেকে সামাজিক মনস্তত্ত্ব, সবকিছুর আলোকেই।


ঐতিহাসিক পটভূমি ও আলতার উৎপত্তি

আলতার ব্যবহার প্রাচীন ভারতে বহু যুগ ধরেই প্রচলিত। প্রাচীনকাল থেকে, নারীশরীরকে অলংকরণের জন্য কেবল গয়নাই নয়, রং ও চিহ্নের ব্যবহারও ছিল প্রচলিত। বিভিন্ন সভ্যতায় নারীরা হাতে-মুখে, পায়ে রঙ বা আলঙ্কারিক চিহ্ন আঁকতেন। ভারতে এই সংস্কৃতি বিশেষ করে হেনা বা মেহেন্দি এবং আলতা হিসেবে গড়ে উঠেছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে আলতার প্রবেশ ঘটে মূলত বৈষ্ণব আন্দোলনের সময়। কৃষ্ণভক্ত রাধা ও গোপীদের পায়ে আলতার বর্ণনা বহু সাহিত্যে পাওয়া যায়। এছাড়া মধ্যযুগীয় বাংলার কবি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, কিংবা কবিকঙ্কন মুখোপাধ্যায়ের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে রাঙা পায়ের বারংবার উল্লেখ দেখা যায়।


দুর্গাপুজো ও নারীর রূপ-অন্বেষা

দুর্গাপুজো কেবল দেবীর আরাধনা নয় এটি নারীর রূপ, শক্তি, করুণা, মাতৃত্ব ও সাহসিকতারও উদযাপন। পুজোর সময় বাঙালি নারীরা যেন নিজের মধ্যেই মা দুর্গার এক প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। এই প্রতিরূপ সজ্জা কেবল গয়না বা সাজে নয়, বরং আচরণ, ভঙ্গিমা ও চেতনার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। আলতা পড়ার রীতি এই রূপকথারই একটি বহিঃপ্রকাশ। আলতার রঙ যেমন লাল, তা শক্তির প্রতীক, অগ্নির প্রতীক, রক্তের প্রতীক। মা দুর্গার পদযুগল যেমন রক্তিম তেমনই রক্তিম হয় নারীসত্তার প্রতিটি পদক্ষেপ যখন সে নিজের শক্তি, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় দিক

১. দেবীর অনুকরণ:
দুর্গাপুজোর সময় মা দুর্গাকে সাজানো হয় শৃঙ্গার রূপে। তাঁর পায়ে আলতার মতন লাল রঙ দেখা যায়। সেই অনুকরণে নারীরাও সেই সময় নিজেদের পায়ে আলতা পরেন, যাতে তারা ঐশ্বরিক শক্তির অংশীদার হন।

২. শুভলক্ষণ:
আলতা ধরা হয় এক শুভ লক্ষণ। নববধূ যখন শ্বশুরবাড়ি প্রবেশ করেন, তখনও তাঁর পায়ে আলতা থাকে। এটি মঙ্গল, সম্প্রীতি, ও নতুন জীবনের সূচক।

৩. পদস্পর্শের পবিত্রতা:
একটি বিশ্বাস আছে—যে নারী পায়ে আলতা পরে ঘরের মধ্যে হাঁটেন, তিনি সেই ঘরকে পবিত্র করেন। বিশেষত ষষ্ঠী বা নবমীর দিন বাড়ির বড়দের পায়ে আলতা লাগিয়ে বরণ করা হয় শুভ শক্তিকে আহ্বানের প্রতীক হিসেবে।


সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক

১. নারীর আত্মপরিচয় ও সৌন্দর্যবোধ:
আলতা পড়া একধরনের আত্মচেতনার প্রকাশ। এটি একটি নিজেকে সাজানোর আনন্দ, যা নারীকে মনে করিয়ে দেয় যে সে কতটা মূল্যবান। বিশেষত শহরের ক্লান্ত জীবনে এই একটু সাজ, একটু রঙিনতা এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়।

২. বয়ঃসন্ধি থেকে পরিণতিতে:
বাঙালি সমাজে একটি মেয়ে যখন কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখে, তখন থেকেই সে প্রথমবার আলতা পড়ে। এটি এক ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি—তাঁর নারীত্বে প্রবেশের, পরিণত জীবনের।

৩. একাত্মতার প্রতীক:
দুর্গাপুজো মানে পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ—সবাই মিলে একসাথে উদযাপন। এই সময়ে একই রকম করে সাজা, একে অপরকে আলতা পড়িয়ে দেওয়া এক ধরনের সামাজিক সংহতির প্রতীক।


রঙ হিসেবে লালের তাৎপর্য

আলতার প্রধান রঙ হলো উজ্জ্বল লাল। এই রঙটি হিন্দু সংস্কৃতিতে বহুমাত্রিক প্রতীক—

  • শক্তি: মা দুর্গা, মা কালী—উভয়েরই প্রধান রঙ লাল। এটি নারীর অগ্নিসদৃশ শক্তির প্রকাশ।

  • মঙ্গল: লাল হল শুভকার্যের রঙ। বিয়ে, পুজো, অন্নপ্রাশন—সব উৎসবে লাল ব্যবহৃত হয়।

  • ভালবাসা ও উর্বরতা: নারীর প্রজনন ক্ষমতা, মাতৃত্ব, সৃজনশীলতা—সব কিছুর প্রতীক হিসেবে লাল ব্যবহৃত হয়।


আয়ুর্বেদিক ও শারীরিক দিক

আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, পায়ের কিছু বিশেষ পয়েন্টে চাপ পড়লে শরীরে রক্তসঞ্চালন ভাল হয়, মানসিক প্রশান্তি আসে। পায়ের তালুতে আলতা লাগালে কিছুটা শীতলতা পাওয়া যায়—বিশেষত গরমকালে। এছাড়া, ঐতিহ্যবাহী আলতা তৈরি হয়েছিল ল্যাক ডাই থেকে—যা অ্যান্টিসেপটিক হিসেবেও কাজ করত।


পুজোয় আলতার বিশেষ গুরুত্ব

১. ষষ্ঠী থেকে দশমী:
ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, সেদিন থেকেই অনেক নারী আলতা পরা শুরু করেন। অষ্টমীতে কুমারী পূজার সময় ছোট ছোট কন্যাদেরও আলতা পরানো হয়। দশমীতে, বিশেষ করে সিঁদুরখেলায় পায়ে আলতা, হাতে সিঁদুর—সবকিছু মিলিয়ে এক অপূর্ব নারীত্বের উৎসব হয়ে ওঠে।

২. দেবীর বিদায় ও নারীশক্তির জয়:
দশমীর পায়ে আলতা পরা নারীরা যখন একে অপরকে সিঁদুর পরান, তখন তা কেবল এক আচার নয়—বরং নারীর জয়, ঐশ্বরিকতার ছোঁয়া এবং ভবিষ্যতের আশীর্বাদের প্রতীক।


গ্রামবাংলার প্রথা ও লোকজ বিশ্বাস

গ্রামের নারীরা অনেক সময় আলতা নিজের হাতে তৈরি করতেন। পলাশফুল, মহুয়া ফুল, ল্যাক গাছের রস দিয়ে তৈরি হত প্রাকৃতিক আলতা। তাদের বিশ্বাস ছিল—পায়ে আলতা পড়লে নজর লাগে না, সংসারে শান্তি থাকে, এবং সন্তান-সন্ততির মঙ্গল হয়।


আধুনিক সময়ে আলতার বিবর্তন

বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন রকমের আলতা পাওয়া যায়—লিকুইড, গ্লিটার যুক্ত, এমনকি জেল ফর্মেও। অনেক নারী পার্লার থেকে আলতা ডিজাইন করান—ঠিক যেমন হাতে মেহেন্দির ডিজাইন। তবে, প্রথার আদি সৌন্দর্য আজও অটুট। পুজোর দিন সকালে এক থালা জল ও আলতা নিয়ে বসে মা, মেয়ে, বউ, জা সবাই মিলে আলতা পরেন—এই ছবিটা বাঙালি বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ।


সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় আলতার প্রতিচ্ছবি

  • সাহিত্য: রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় ‘রাঙা পায়ের দোলা’র কথা উঠে এসেছে।

  • চলচ্চিত্র: ‘চোখে চোখ রাখি’, ‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘চোখের বালি’—সব ছবিতেই আলতা এক প্রতীক হয়ে এসেছে।

  • চিত্রকলা: চিত্রশিল্পীরা নারীর পা আঁকেন আলতার রেখায়—যা একটি বাঙালি নারীত্বের পরিচয়।


পায়ে আলতা মানেই কেবল সাজ নয়, এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

আলতা পড়া একদিকে যেমন নারীর ব্যক্তিগত রুচি ও সৌন্দর্যবোধের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি অন্যদিকে এটি এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের চিহ্ন। পুজোর সময় পায়ে আলতা পড়া মানে নিজেকে দেবীর প্রতিরূপ হিসেবে চিনে নেওয়া, নিজের নারীত্বকে সম্মান জানানো এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। এই ছোট্ট রঙিন প্রথার মধ্যে লুকিয়ে আছে নারীশক্তির, সৌন্দর্যের, সংস্কৃতির, সমাজচেতনার এক অপরূপ মেলবন্ধন। তাই পায়ে আলতা পড়া কেবল রূপচর্চা নয় এ এক চেতনার উদযাপন।


আপনি কি আলতা পরেছেন আজ? যদি না পরেন, তবে এই পুজোয় একবার পায়ে লাল আলতা মেখে দেখুন নিজেকে একটু অন্যভাবে চিনতে পারবেন। কারণ, প্রতিটি রাঙা পা মানেই একেকটি শক্তির প্রতিচ্ছবি..

Archive

Most Popular