প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের আর্কাইভ। ছবি, ভিডিও, ব্যাংকিং ডিটেইল, OTP, ইমেল, পাসওয়ার্ড সবকিছুই এখন একটি ছোট ডিভাইসের মধ্যে গচ্ছিত। তাই ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হওয়া মানে শুধু একটি অ্যাপের ক্ষতি নয় এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সম্পর্কের জন্যও গুরুতর হুমকি। দেশজুড়ে সাইবার অপরাধ বাড়ছে, এবং হোয়াটসঅ্যাপ ক্লোনিং, সিম সোয়াপ, ম্যালওয়্যার, ফিশিং এ সবের মাধ্যমে ফোনের নিয়ন্ত্রণ খুব সহজেই দুষ্কৃতীদের হাতে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সমস্যা মেটাতে প্রথম ৫–১০ মিনিট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত, সচেতন এবং প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে বেশিরভাগ ক্ষতি রুখে দেওয়া যায়। এই প্রতিবেদনে ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হওয়ার সম্ভাব্য লক্ষণ, তাৎক্ষণিক করণীয়, সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের প্রতিরোধ—সবকিছুই পর্যায়ক্রমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রথমেই বোঝা দরকার, ফোন কীভাবে হ্যাক হয়। সাধারণত তিন ধরনের পথে হ্যাকাররা ফোনে প্রবেশ করে—(১) ম্যালওয়্যার ইনস্টল করিয়ে, (২) ফিশিং লিংক বা ভুয়ো SMS/ইমেল পাঠিয়ে, এবং (৩) সিম সোয়াপ বা অ্যাকাউন্ট ক্লোনিং করে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অজান্তেই সন্দেহজনক অ্যাপ ডাউনলোড করেন, যেগুলি ফোনের স্ক্রিন, কন্ট্যাক্ট, OTP—সবকিছু দেখতে পারে। আবার ফেসবুক বা মেসেঞ্জারে আসা “ইউ, ইজ দিস ইউ?” ধরনের লিংক খুললেই ব্রাউজার ডেটা ও পাসওয়ার্ড চলে যেতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো সিম সোয়াপ—যেখানে আপনার নাম-ঠিকানা দিয়ে মোবাইল অপারেটরকে ভুল পথে চালিয়ে আপনার নম্বরটি নতুন সিমে অ্যাক্টিভ করে নেয় দুষ্কৃতীরা। একবার সিম সোয়াপ হলে হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যাংকিং, ইমেল—সব OTP তারা পেতে শুরু করে, আর আপনার ফোন সিগন্যাল হারায়।
হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ আছে। হঠাৎ চোখে পড়তে পারে, আপনার চ্যাটে অচেনা ডিভাইস লগইন করা আছে। হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েবের সেটিংস খুললে দেখা যায় ‘Active sessions’–এ অপরিচিত ব্রাউজার। আবার কখনো আপনার নাম দিয়ে অন্যদের কাছে মেসেজ চলে যাচ্ছে অথচ আপনি পাঠাননি। ফোনে অতিরিক্ত গরম হওয়া, ব্যাটারি অস্বাভাবিক দ্রুত কমে যাওয়া, ডেটা ইউসেজ বেড়ে যাওয়া—এ সবই ম্যালওয়্যারের লক্ষণ। অনেকে বলেন, হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বের করে দেয় বা OTP না চাইতেই আসে। এগুলো মানে কেউ লগইন চেষ্টা করছে। আর যদি হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতেই না পারেন, তাহলে সম্ভবত আপনার নম্বর দিয়ে অন্য ডিভাইসে ভেরিফাই করা হয়েছে।
এই অবস্থায় প্রথম ৫ মিনিটের পদক্ষেপ সবচেয়ে জরুরি। সর্বপ্রথম ফোনটিকে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করুন—মোবাইল ডেটা ও ওয়াইফাই বন্ধ করুন। এতে হ্যাকারদের ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হবে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে Two-Step Verification চালু করুন, যেখানে ছয় ডিজিটের পিন কোড সেট করতে হয়। এটি হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষা। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েবে গিয়ে সব অচেনা ডিভাইস থেকে লগআউট করে দিন। যদি লগইনই করতে না পারেন, তবে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটি আবার ভেরিফাই করার চেষ্টা করুন। বেশিরভাগ সময় আগের হ্যাক হওয়া ডিভাইস লগআউট হয়ে যায়। তবে যদি OTP না আসে, তাহলে বুঝতে হবে সিম সোয়াপের সম্ভাবনা রয়েছে—এই ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি কাস্টমার কেয়ার বা নিকটবর্তী অপারেটর স্টোরে গিয়ে সিম ব্লক করতে হবে।
ফোনে ম্যালওয়্যারের সন্দেহ থাকলে ডিভাইস সেফ মোডে চালু করুন। বেশিরভাগ অ্যান্ড্রয়েড ফোনে পাওয়ার বাটন চেপে ধরে ‘Safe Mode’–এ প্রবেশ করা যায়। সেখানে গিয়ে অপরিচিত অ্যাপগুলো আনইনস্টল করুন। গ্যালারি, নোটস, ব্যাংকিং অ্যাপে কোনো অদ্ভুত পরিবর্তন হলে তা নোট করুন। কিছু ম্যালওয়্যার অ্যাপ নিজেদের আইকন লুকিয়ে রাখে, কিন্তু ‘Device Administration Apps’–এ গেলে দেখা যায়। সেগুলোৎক্ষণাৎ নিষ্ক্রিয় করুন। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে পুরো ফোন স্ক্যান করুন। আর যদি নিশ্চিত হন ফোন পুরোপুরি আক্রান্ত, তবে গুরুত্বপূর্ণ ডেটার ব্যাকআপ নিয়ে ‘Factory Reset’ করাই সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান।
ব্যাকআপ নিয়ে কথা বলতে গেলে, হোয়াটসঅ্যাপে গুগল ড্রাইভ ব্যাকআপ একটি বড় সুবিধা। একবার ডিভাইস ফরম্যাট করলে ব্যাকআপ থেকে চ্যাট ফেরত আনা যায়, তবে খেয়াল রাখতে হবে—হ্যাকার যদি ব্যাকআপও নষ্ট করে থাকে তাহলে রিস্টোর কাজ নাও করতে পারে। তাই ব্যাকআপ নিয়মিত নিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। ফোন হ্যাক হলে প্রথমেই গুগল অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ব্যাংকিং অ্যাপ—সব জায়গায় পাসওয়ার্ড বদলে দিন। অচেনা লগইন লোকেশন বা ডিভাইস আছে কিনা দেখে নিন। গুগল সিকিউরিটি পেজে গিয়ে ‘Sign out of all devices’ করে দিন। এতে হ্যাকার যদি আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট ধরে ফোনে ঢুকেও থাকে, তাও বেরিয়ে যাবে।
সিম সোয়াপ ফ্রড নিয়ে আলাদা করে সতর্ক থাকা দরকার। আপনার ফোন হঠাৎ নেটওয়ার্ক হারালে বা ‘Emergency calls only’ দেখালে প্রথমেই অপারেটরকে ফোন করুন—যদি সত্যিই কোনো টেকনিক্যাল সমস্যা না থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে কেউ সিম ক্লোন করেছে। তখন পুরনো সিম ব্লক করে নতুন সিম জারি করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদল করা জরুরি, কারণ হ্যাকার OTP পাওয়ার চেষ্টা করবে। অনেক ক্ষেত্রেই সিম সোয়াপের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা খোয়া গেছে, তাই এই সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী ধাপ হলো আইনগত পদক্ষেপ। আজকাল প্রতিটি রাজ্যেই পৃথক Cyber Cell রয়েছে, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক বা ডিজিটাল ফ্রডের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ করতে হলে ফোন নম্বর, স্ক্রিনশট, সন্দেহজনক লিংক, OTP-এর সময়—এসব তথ্য দিতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগের পরই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সুরক্ষিত করা হয় এবং হ্যাকারদের ট্র্যাক করা সম্ভব হয়। অনেকেই ভাবেন ছোটখাটো হ্যাকিং রিপোর্ট করার দরকার নেই—এটি ভুল ধারণা। সাইবার সেল যত বেশি তথ্য পাবে, অপরাধী চক্র তত দ্রুত ধরা পড়বে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য কিছু সুরক্ষামূলক অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। “অচেনা কেউ লিংক দিলে খুলবেন না”—এটি সবচেয়ে মৌলিক এবং সবচেয়ে উপেক্ষিত নিয়ম। হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক কখনোই ‘Verification’ বা ‘Check this photo’ নামে লিংক পাঠায় না। ফোনে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ রাখবেন না, বিশেষ করে যেগুলি বারবার পারমিশন চায়। Play Store ছাড়া অন্য কোথাও থেকে অ্যাপ ইনস্টল করবেন না। ফোন লক স্ক্রিনে OTP দেখা যায় এমন নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। ব্যাংকিং ও সোশ্যাল মিডিয়া—সব জায়গায় Two-Factor Authentication চালু রাখুন। ব্যাকআপ সপ্তাহে অন্তত একবার নিন। আর ফোন হারিয়ে গেলে বা সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে পাসওয়ার্ড বদলে দিন।
এ ছাড়া সচেতন থাকতে হবে পরিবারের বয়স্ক সদস্য বা বাচ্চাদের নিয়ে। কারণ হ্যাকিংয়ের সবচেয়ে সহজ শিকার হয় বয়স্ক মানুষ—ফোনে লিংক এলে তারা না বুঝে চাপ দিয়ে দেন। তাই পরিবারের সবাইকে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রাথমিক নিয়ম শেখানো জরুরি। কর্পোরেট অফিস বা সরকারি চাকরিতে থাকলে নিয়মিত সাইবার ট্রেনিং নেওয়া উচিত। অনেক সময় অফিস ইমেল থেকেই হ্যাকাররা ফোন নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করে।
সবশেষে, ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হওয়া মোটেই লজ্জার কিছু নয়। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে অপরাধীরাও দক্ষ হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, হ্যাক হওয়া বুঝেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। যত দ্রুত ব্যবস্থা, তত কম ক্ষতি। আজ স্মার্টফোন আমাদের জীবনযাপন, যোগাযোগ, স্মৃতি, ব্যাংকিং—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। তাই ফোনের নিরাপত্তা মানেই নিজের নিরাপত্তা। সচেতনতা, সঠিক তথ্য ও কিছু প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি থাকলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। ডিজিটাল স্পেস যত বাড়বে, ঝুঁকিও বাড়বে—কিন্তু সতর্ক থাকলে সাইবার সুরক্ষার শক্ত দেয়াল গড়ে তোলা সম্পূর্ণ সম্ভব।