বিনোদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ব্রত এই শব্দটি উচ্চারণ করলেই চোখে ভেসে ওঠে এক নারীর প্রতিকৃতি। লালপাড় সাদা শাড়ি, হাতে ধুপ-ধুনো, ঠাকুরের সামনে নিষ্ঠা সহকারে প্রার্থনা করছেন। ব্রত বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন। এখানে ধর্ম আর জীবনশৈলীর মধ্যে কোনও প্রাচীর নেই সবকিছু মিশে গেছে প্রতিটি ব্রতকথায়। এগুলি শুধু আচার নয়, বরং এক একটি জীবনদর্শন, যেখানে নারী নিজেকে খুঁজে পান স্ত্রীরূপে, মাতারূপে, কন্যারূপে এবং সর্বোপরি এক শক্তিরূপে।
ব্রতকথা: লোকাচার থেকে নারীর আত্মপ্রকাশ
বঙ্গদেশের ব্রত মূলত নারীকেন্দ্রিক। কৃষিনির্ভর সমাজে নারীরা সংসারের মঙ্গল কামনায়, সন্তানের দীর্ঘায়ু ও স্বামীর সাফল্যের জন্য বিভিন্ন ব্রত পালন করেন। এগুলির মধ্যে গল্প বা কথা রয়েছে যা পুরাণ, লোকগাথা, বা স্থানীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। এই ব্রতকথাগুলি একদিকে যেমন পৌরাণিক, অন্যদিকে তেমনই মাটির গন্ধমাখা। ব্রতের মাধ্যমে নারী সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কারণ, ধর্মীয় আচারের মধ্যেও তাঁরা তৈরি করেন এক সামাজিক একতা, সম্প্রদায়-ভিত্তিক শক্তি, এবং পারিবারিক ঐক্য।
ব্রতের ধরণ: ঋতু, গ্রাম ও বিশ্বাসভিত্তিক বৈচিত্র্য
বঙ্গদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ব্রতের প্রচলন রয়েছে। এগুলি ঋতুভিত্তিক, উৎসবভিত্তিক বা ব্যক্তিগত সংকল্পভিত্তিক হতে পারে।
১. জামাইষষ্ঠী বা অরণ্যষষ্ঠী:
মায়েরা জামাই বা সন্তানের দীর্ঘজীবনের কামনায় পালন করেন। এতে শাশুড়ি জামাইকে আমন্ত্রণ জানান এবং ব্রতপালনের পর ফল-মিষ্টি দেন।
২. মনসা পূজা ও মনসার ব্রত:
বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে প্রচলিত। সাপের দেবী মনসার কৃপা লাভের আশায় মহিলারা মনসার পুথি পাঠ করে, বোনা বাঁশ দিয়ে বানানো মনসার প্রতিমা পূজা করেন।
৩. সাতিয়া বা সাঁওতালি ব্রত:
উত্তর-পূর্ব বঙ্গ বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রচলিত। এখানে নারী নিজেই প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন।
৪. অম্বুবাচী:
এই ব্রতকে কামাখ্যা দেবীর ঋতুকাল বলে মানা হয়। যদিও এটি বেশি প্রচলিত অসমে, তবু উত্তরবঙ্গেও এই সময়ে নারী বিশেষ নিয়ম পালন করেন।
৫. লক্ষ্মী ব্রত ও কোজাগরী পূর্ণিমা:
গৃহলক্ষ্মীর কৃপা লাভের জন্য প্রত্যেক বৃহস্পতিবার বা নির্দিষ্ট পূর্ণিমায় বাঙালি গৃহবধূরা পালন করেন এই ব্রত।
ব্রতগুলির কথার মধ্যে নারীর শক্তি, বুদ্ধি, সহিষ্ণুতা ও আত্মত্যাগের কাহিনি বারবার ফিরে আসে। যেমন শীতলা ব্রতের গল্পে আমরা দেখি এক মা কীভাবে নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে দেবীর আশ্রয় নেন। মনসার ব্রতের কাহিনিতে চাঁদ সদাগরের মতো পুরুষ-অহঙ্কারের বিপরীতে দাঁড়ায় বেহুলার নীরব প্রার্থনা ও আত্মবলিদান। শিব-গৌরীর ব্রতকথায় নারীর সতীত্ব ও ভক্তি দিয়ে পাহাড় গলানোর আখ্যান তৈরি হয়। এই গল্পগুলির মাধ্যমে নারী সমাজ এক অন্য ভাষায় নিজেদের পরিচয়, শক্তি ও বিশ্বাস তুলে ধরেন যা ছিল মৌখিক, ঘরোয়া, কিন্তু গভীরভাবে প্রভাবশালী।
ব্রতের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
১. সমবায় চেতনার জন্ম:
গ্রামবাংলায় ব্রত মানেই ছিল পাড়ার মেয়েদের একসঙ্গে মাটিতে বসে আঁল বসানো, চাল বাছা, আলপনা আঁকা ও গান গাওয়া। এই সমবায়িকতা নারীদের মানসিক শান্তি দিত।
২. মানসিক অবলম্বন:
নারীরা যখন নিজেদের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারতেন না, তখন ব্রতের মাধ্যমে তাঁরা একধরনের আত্মোপলব্ধির জায়গা পেতেন।
৩. নারীর অবচেতন প্রতিবাদ:
বহু ব্রতকথায় নারীর কণ্ঠস্বর চাপা থাকলেও, তাঁর নিষ্ঠা, প্রেম, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে এক প্রকার প্রতিবাদ প্রকাশ পায়। সমাজে নারীর গৌরব ও অবস্থান নিশ্চিত করতে এই ব্রত এক নিঃশব্দ হাতিয়ার ছিল..
ব্রতের অন্যতম আকর্ষণ ব্রতগান। এগুলি ছিল ছড়ার আকারে রচিত, সহজ ভাষায়, ছন্দে বাঁধা ও মাটির গন্ধে ভরপুর। যেমন:
আয় গৌরী চলে যাই
দুধে ভাতে বর পাঈ।
শ্বশুর শাশুড়ি দেবে মান,
আয় গৌরী চলে যাই।
এই গানগুলি শুধু কল্পনার নয়, একজন কিশোরী বা বধূর জীবনের স্বপ্ন ও অভ্যন্তরীণ ভাবনার প্রতিফলন। আজকের আধুনিক সমাজে ব্রতের আচার অনেকটাই কমে এসেছে। তবে ব্রতের মূলে থাকা কেয়ার, ভবিষ্যৎ ভাবনা, ও আধ্যাত্মিকতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ব্রতের বহিরঙ্গী আচারে না থেকেও, তার অন্তর্নিহিত দর্শন নারীর সংহতি, প্রার্থনা, ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ আজও জীবন্ত। বঙ্গদেশের ব্রতকথা শুধু ধর্মীয় আচারের দলিল নয়, এগুলি নারীর মুখে মুখে গড়ে ওঠা এক প্রজন্মান্তর সংস্কৃতি। এই ব্রত নারীদের দিয়েছে এক আত্মিক বল, একতাবদ্ধতা এবং সমাজে নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও এই ব্রত আমাদের শেখায় প্রার্থনা, অধ্যবসায়, ও ভালোবাসা দিয়েও শক্তি অর্জন করা যায়। তাই ব্রতকথা শুধুই অতীত নয়, বরং বর্তমানেরও এক শিক্ষা নারীর ইতিহাস, তার সৃষ্টিশীলতা ও অদৃশ্য প্রতিবাদের এক চিরন্তন রূপ।