প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
গ্লো চাই? তো তাহলে গ্লাইকোলিক অ্যাসিড দিন ত্বকে।
এক্সফোলিয়েট করতে চাইলে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড ছাড়া উপায় নেই!
এই রকম ডায়লগ এখন ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম খুললেই চোখে পড়ে। ইউটিউবে হাজারো স্কিন ইনফ্লুয়েন্সার রোজই শিখিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে AHA, BHA, Lactic Acid, Kojic Acid ব্যবহার করলে ত্বক হবে নিখুঁত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এই অ্যাসিডগুলো কি সবাই ব্যবহার করতে পারেন? নাকি সৌন্দর্যের ছদ্মবেশে এগুলো একটি স্লো পোয়জন? অ্যাসিড শব্দটা শুনলেই ভয়! কিন্তু... প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার সব অ্যাসিড ক্ষতিকর নয়। অনেক অ্যাসিড চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কার্যকর, যেমন:
গ্লাইকোলিক অ্যাসিড (AHA): মৃত কোষ ঝরাতে সাহায্য করে।
স্যালিসাইলিক অ্যাসিড (BHA): ব্রণর সমস্যা কমাতে কার্যকর।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিড: আদতে একটি ময়শ্চারাইজার উপাদান, যা ত্বকে জল ধরে রাখে।
কোজিক অ্যাসিড: ত্বকের কালচে দাগ হালকা করতে সাহায্য করে।
এই উপাদানগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে কিছু কিছু স্কিন সমস্যায় উপকারী। তবে শুধুমাত্র সঠিক মাত্রা, ব্যবহারের সময় ও ত্বকের ধরণ অনুযায়ী এগুলো প্রয়োগ করলেই উপকার হয়। না হলে…?
রূপচর্চায় অ্যাসিডের অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহারে দেখা দিতে পারে নানা বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
1. ত্বকের বার্ন বা পোড়া ক্ষত – AHA বা BHA অ্যাসিড ব্যবহারে ভুল মাত্রা বা প্রলম্বিত ব্যবহারে ত্বকে দগ্ধের মতো জ্বালা বা ফোসকা হতে পারে।
2. ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে পড়া – হায়ালুরোনিক অ্যাসিড বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিডের অত্যধিক ব্যবহারে ত্বক নিজস্ব সুরক্ষা হারায়।
3. সানবার্ন ও হাইপারপিগমেন্টেশন – অ্যাসিড ব্যবহারের পর যদি সানস্ক্রিন না ব্যবহার করা হয়, তবে ত্বক আরও বেশি কালো হয়ে যেতে পারে।
4. অ্যালার্জি ও র্যাশ – সংবেদনশীল ত্বকে অ্যাসিড ব্যবহার করলে লালচে ভাব, চুলকানি, বা ব্রণজাত সমস্যা বাড়তে পারে।
কে কাকে অনুসরণ করছেন? ইনফ্লুয়েন্সার না চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ?
বর্তমানে তরুণীরা স্কিন কেয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের ভিডিও দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন এই অ্যাসিড ব্যবহারে। কিন্তু প্রত্যেকের ত্বক আলাদা, আবহাওয়া আলাদা, অভ্যাস আলাদা সেটা না জেনেই অনেকে নিয়মিত ব্যবহার করছেন অ্যাসিড-ভিত্তিক পিল, সিরাম বা মাস্ক। ফলে বাড়ছে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে ছুটে যাওয়ার সংখ্যা।পিউ (২২) কলেজছাত্রী। গ্লাইকোলিক অ্যাসিড সিরাম লাগিয়ে ৭ দিনের মধ্যেই মুখে শুরু হয় জ্বালা ও ত্বক উঠতে থাকে। পরে চিকিৎসায় জানা যায় অ্যাসিড বার্ন হয়েছে। রিনা (৩৫), কর্মজীবী নারী। রং উজ্জ্বল করতে বাজারচলতি অ্যাসিড ক্রিম ব্যবহার করে ফেসে হালকা দাগের বদলে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যায়। এগুলি নিছক ব্যতিক্রম নয়, বরং ক্রমবর্ধমান সমস্যা।
সতর্কতার উপায়: অ্যাসিড ব্যবহারে কিছু নিয়ম
1. চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসিড জাতীয় প্রোডাক্ট ব্যবহার করবেন না।
2. সবসময় প্যাচ টেস্ট করুন। নতুন কোনো পণ্যের আগে হাতে বা গলার নিচে একটু লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা দেখুন কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না।
3. অ্যাসিড ব্যবহারের পর ভালো ময়শ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন লাগানো বাধ্যতামূলক।
4. সপ্তাহে ২-৩ দিনের বেশি অ্যাসিড সিরাম ব্যবহার করবেন না (চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের নির্দেশ ছাড়া)।
5. রাতেই ব্যবহার করুন, দিনে অ্যাসিড লাগিয়ে বাইরে বেরোনো বিপজ্জনক।
৭ দিনে গ্লো, স্কিন পিল অফ করে ফেলুন, নতুন স্কিন আনুন—এই সব দাবি শুনতে যতটা চটকদার, বাস্তবে ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। মনে রাখা দরকার, ত্বকের কোনো পরিবর্তন রাতারাতি হয় না। ত্বককে সুস্থ রাখতে চাইলে ধৈর্য, নিয়মিত পরিচর্যা আর পেশাদার পরামর্শের কোনও বিকল্প নেই।
অ্যাসিডের বিকল্প হিসেবে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা যায় যা অনেকটাই নিরাপদ:
মধু ও অ্যালোভেরা – হালকা স্কিন পিলিং ও হাইড্রেশন
ওটমিল স্ক্রাব – ডেলিকেট এক্সফোলিয়েশন
দই ও টমেটোর রস – হালকা প্রাকৃতিক অ্যাসিড, নিয়মিত ব্যবহারে দাগ হালকা হতে পারে!
তবে এগুলোও অবশ্যই সংবেদনশীল ত্বকে সাবধানে ব্যবহার করা উচিত। ত্বক আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ, আর তার যত্ন নেওয়া মানে সৌন্দর্যই শুধু নয়, স্বাস্থ্যবোধও। সোশ্যাল মিডিয়ার অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং নিজের ত্বকের প্রয়োজন বুঝে তবেই প্রোডাক্ট ব্যবহার হোক। অ্যাসিড হোক রাস্তা নয়, শুধুমাত্র এক বিকল্প সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহারের বিকল্প নেই। আপনার ত্বক আপনি চিনুন। রূপচর্চা কখনোই হোক না বিপদের কারণ। সৌন্দর্য হোক আত্মবিশ্বাসের, কৃত্রিমতার নয়।