19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাচ্চাকে মারধর করেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


“শিক্ষার জন্য এক চড় কিছুই না!” এই কথাটা আমরা অনেক সময়ই শুনে বড় হয়েছি। অনেক পিতামাতা, এমনকি সমাজের প্রবীণরাও বিশ্বাস করেন, “মার খেলে বাচ্চা শিখবে।” কিন্তু আজকের সময়ে এই ভাবনা কি এখনও গ্রহণযোগ্য? বাচ্চার শৈশব, তার মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস সব কিছুর উপরে এর প্রভাব কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা আমরা অনেক সময়ই বুঝতে পারি না। বাচ্চাকে মারধর করা কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, এটি এক গভীর মানসিক আঘাত। যা তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ছাপ ফেলে। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কেন অনেক অভিভাবক বাচ্চাকে মারধর করেন, এর ফল কী, এবং কীভাবে ভালোবাসা ও সংলাপ দিয়েই শাসনের বিকল্প তৈরি করা যায়।


১.মারধরের সংস্কৃতি কোথা থেকে এল?

ভারতীয় সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষার নাম করে শারীরিক শাস্তির প্রথা বহু পুরোনো। স্কুলে শিক্ষক থেকে শুরু করে বাড়িতে বাবা-মা সবাই “শাসন”কে সমানভাবে গুরুত্ব দিতেন। বাক্যাংশটি প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল “চড় খেলে বুদ্ধি আসে।” এর পেছনে যুক্তি ছিল সহজ ভয় দেখিয়ে ঠিক পথে আনা যায়। কিন্তু এই ভয় যে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল তৈরি করে, যা শিশুমনের স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয়, তা আমরা তখন ভাবিনি। আজ যখন শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তখন বোঝা যাচ্ছে শাস্তি নয়, ভালোবাসাই শিক্ষার প্রকৃত উপাদান।


২.কেন বাবা-মায়েরা মারেন?

বেশিরভাগ সময়ই অভিভাবকরা ইচ্ছে করে বাচ্চাকে মারেন না। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে বাচ্চাকে “ভালো” মানুষ বানানো। কিন্তু অজান্তে তাঁরা এমন কিছু আচরণ করেন, যা শিশুর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। কয়েকটি সাধারণ কারণ

  1. রাগ বা হতাশা থেকে প্রতিক্রিয়া:
    কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি, বা সংসারের সমস্যা অনেক সময় অভিভাবকদের অস্থির করে তোলে। তখন বাচ্চার ছোট ভুলেও রাগ বেড়ে যায়।

  2. নিজের শৈশবের প্রতিফলন:
    অনেক সময় যারা ছোটবেলায় নিজেরাই মারধর খেয়েছেন, তারা অবচেতনে একই প্যাটার্ন অনুসরণ করেন, ভাবেন “আমার সাথেও তো এমনই হয়েছিল।”

  3. ভয় “না শুনলে বখে যাবে”:
    সমাজ এখনও এমনভাবে তৈরি, যেখানে সন্তানকে ‘কঠোর হাতে’ গড়া ভালো অভিভাবকত্ব বলে মনে করা হয়।

  4. দ্রুত সমাধানের লোভ:
    কথা বলে বোঝাতে সময় লাগে, কিন্তু এক চড় বা ধমক তখনই কাজ দেয় বলে মনে হয়। কিন্তু এটি সাময়িক সমাধান, স্থায়ী নয়।


৩.শিশুর মনে মারধরের প্রভাব

একটি শিশুর মন কোমল। সে শেখে, অনুভব করে, এবং তার চারপাশের পরিবেশ থেকেই নিজের চরিত্র গঠন করে।
যখন সেই পরিবেশে ভয়, রাগ বা অপমান মিশে যায়, তখন তার চিন্তা ও আচরণে এক ভয়ানক পরিবর্তন আসে।

  1. ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়:
    বাচ্চা তখন শেখে “ভুল করলে শাস্তি।” সে ভুল স্বীকার করতে ভয় পায়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় পায়।

  2. আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি:
    বারবার শাসনের ফলে শিশুর মনে হয় সে অযোগ্য। সে নিজেকে বিশ্বাস করতে শেখে না।

  3. সহিংসতার প্রতি সহনশীলতা:
    যেই শিশু নিয়মিত মার খায়, সে বড় হয়ে সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। এমনকি সম্পর্কের মধ্যেও তা প্রয়োগ করে।

  4. মনের মধ্যে আক্রোশ জমে:
    ভিতরে ভিতরে সে ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। পরিণামে মানসিক অসুস্থতা, উদ্বেগ, এমনকি বিষণ্ণতার শিকার হয়।


৪.বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, বোঝিয়ে শেখানো উচিত।
American Academy of Pediatrics (AAP) স্পষ্টভাবে জানিয়েছে  “Physical punishment increases aggression in children, lowers self-esteem, and damages parent-child relationships.”

বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক শিশু মনোবিদেরও মত মারধরের বদলে ইতিবাচক আচরণ (Positive Reinforcement) ব্যবহার করা উচিত।
যেমন:

  • ভালো কাজ করলে প্রশংসা করা,

  • ভুল করলে ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো,

  • নিজে শান্ত থেকে উদাহরণ স্থাপন করা।


৫.“শাসন” আর “সহিংসতা” দুটোর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য

অনেক অভিভাবক বলেন, “আমি মারধর করি না, শাসন করি।”
কিন্তু শাসনও যেন সীমা না ছাড়িয়ে যায়।
শাসন মানে হল দিকনির্দেশনা দেওয়া, শেখানো। কিন্তু যখন সেই নির্দেশনার মধ্যে ভয়, অপমান, বা রাগ ঢুকে যায়, তখন তা সহিংসতায় পরিণত হয়।

একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক জানেন বাচ্চাকে শাসন করা মানে তাকে ভয় দেখানো নয়, বরং তাকে বোঝানো যে কেন কিছু কাজ ভুল।


৬.বিকল্প পথ, ভালোবাসার মাধ্যমে শাসন

সংলাপ স্থাপন করুন

প্রতিটি সমস্যার সমাধান কথোপকথনে।
যখন বাচ্চা ভুল করে, তার সাথে সময় নিয়ে কথা বলুন কেন ভুলটা হয়েছে, ভবিষ্যতে কিভাবে ঠিক করা যায়।

নিজের আচরণে উদাহরণ দিন

শিশুরা শেখে অনুকরণে।
আপনি যদি শান্ত, ধৈর্যশীল ও সহমর্মী হন, আপনার সন্তানও তাই শিখবে।

সময় দিন, মনোযোগ দিন

অনেক সময় বাচ্চারা খারাপ আচরণ করে মনোযোগ পাওয়ার জন্য।
তাদের সাথে সময় কাটান, গল্প করুন, একসাথে খেলা করুন।

সীমা নির্ধারণ করুন, কিন্তু ভালোবাসায় আবৃত রাখুন

“না” বলতে জানুন, কিন্তু সেই “না”-এর মধ্যে যেন ভালোবাসার আবহ থাকে।
যেমন “তুমি এটা করলে আমি দুঃখ পাব” এমন বাক্য বাচ্চাকে চিন্তায় আনতে পারে।


৭.স্কুলে মারধর এখনো কি চলছে?

স্কুলে শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের হাতে মারধর এখন আইনত অপরাধ। ভারতের “Right to Education Act, 2009”-এর ধারা 17 অনুযায়ী শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও অনেক জায়গায় এখনও “শাসন” নামেই বাচ্চাদের অপমান বা শাস্তি দেওয়া হয়। অভিভাবকদের উচিত স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা, এমন কোনো ঘটনা ঘটলে অভিযোগ করা, এবং বাচ্চাকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা।


৮.বাচ্চার সাথে সম্পর্ক গড়ার শিল্প

প্রতিটি সন্তান আলাদা। কেউ সহজে বোঝে, কেউ জেদী, কেউ চুপচাপ। তাদের মনের দরজা খুলতে হলে আমাদেরও মন খুলতে হবে। একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়তে পারলে বাচ্চা নিজের ভুল, ভয় বা সমস্যার কথাও নিজের মুখে বলবে। এবং সেটাই ভালো অভিভাবকত্বের আসল মানে “তোমার সন্তান তোমাকে ভয় নয়, ভরসা করুক।”


৯.ভবিষ্যতের সমাজ, সহিংসতামুক্ত শৈশবের স্বপ্ন

যে সমাজে বাচ্চারা ভয় ছাড়া বড় হয়, সেখানে করুণা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতা, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসা ও সম্মান পায়, তবে বড় হয়ে সেই একই ভালোবাসা সমাজে ফেরত দিতে পারবে।

বাচ্চাকে মারধর করে আমরা হয়তো সাময়িকভাবে চুপ করাতে পারি, কিন্তু তার ভেতরের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে থামিয়ে দিই। সন্তানের ভুলের শাস্তি নয়, তার ভুল বোঝার সাহস দিন। কারণ একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় জয় তখনই, যখন সন্তান নিজের ভুল স্বীকার করে আপনার কাছে আসে, ভয় নয়, বিশ্বাস নিয়ে। ভালোবাসা, ধৈর্য, আর সংলাপ এই তিনেই আছে আসল শিক্ষা। বাচ্চাকে মারধর নয়, বরং তার হৃদয়ে ভালোবাসার ছোঁয়া দিন। তবেই সে শেখাবে মানুষ হওয়া মানে কেমন। শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক বাড়িতে, স্কুলে, সমাজে। প্রতিটি বাচ্চা হোক মুক্ত, নিরাপদ, ও ভালোবাসায় ভরপুর এক পৃথিবীর নাগরিক।

Archive

Most Popular