প্রতিবেদন
সুস্মিতা মিত্র
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় পালিত এই উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং মানবিক সংযোগের প্রতীক। দেবতা যেন তাঁর অনন্ত বিশ্রাম ছেড়ে নিজেই ধরণীর গৃহে আগমন করেন, স্নান করেন, ক্লান্ত হন, অসুস্থ হন এবং মানুষের মতো বিশ্রামে যান। এই মানবিক রূপদানের মধ্য দিয়েই ঘটে ঈশ্বরের সর্বসাধারণের সঙ্গে এক মধুর সংলাপ। স্নানযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমায়, ওড়িয়াতে একে বলা হয় দেবস্নান পূর্ণিমা। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই জগন্নাথদেবের আবির্ভাব ঘটে পৃথিবীতে। এই দিন তিন ভাই-বোন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা বিশ্বভরণ মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন ‘স্নানবেদী’ নামক একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মে, যা মন্দির প্রাঙ্গণের মধ্যে অবস্থিত। সেখানেই সম্পন্ন হয় দেবতাদের মহা স্নান।
এই স্নান শুধু প্রতীকী নয়, রীতিমতো এক বর্ণাঢ্য আচারানুষ্ঠান। মোট ১০৮ কলস পবিত্র জল বিভিন্ন পবিত্র কূপ ও নদী থেকে সংগ্রহ করে শুদ্ধাচারে তা দিয়ে স্নান করানো হয়। জল সংগ্রহের আগে পুরোহিতেরা নানা মন্ত্রপাঠ, যজ্ঞ ও পূজা করেন যাতে জল দেবতার স্পর্শ পায়। এরপর এক সুদৃশ্য শোভাযাত্রা সহকারে ওই জল মন্দিরে আনা হয়। তিনটি দেবমূর্তিকে ১০৮টি জলভর্তি কলস দিয়ে স্নান করানো হয়। স্নান শেষে সাজিয়ে তোলা হয় নানা ফুলে, সুগন্ধি ও চন্দনে। জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাকে সাজানো হয় গজবেশে যেখানে জগন্নাথ ও বলরামকে সাদা ও কালো হাতির মতো রূপদান করা হয়, আর সুভদ্রা থাকেন পদ্ম-আলংকৃত রূপে। এই বেশের মাধ্যমে তাঁদের দেখা যায় দেবী লক্ষ্মী-নারায়ণ ও দেবী দুর্গার রূপে।
এই মহা স্নানের পর, দেবতারা নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েন। একে বলা হয় অনাসার বা অবকাশ এই সময়ে দেবতারা আর জনসমক্ষে থাকেন না। বিশ্বাস, অতিরিক্ত স্নানের ফলে তাঁরা জ্বরে আক্রান্ত হন। এ সময় তাঁদের রাখা হয় গোপন কক্ষে, যেখানে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সেবকগণ প্রবেশাধিকার পান। এই কয়েকদিন তাঁরা ভাত খান না, ফল, দুধ ও ওষুধে চলে। এই অনাসার সময়েই এক অদ্ভুত মায়াবি ঘটনা ঘটে লোকচক্ষুর অন্তরালে গড়ে ওঠে নতুন তিনটি মূর্তি। পুরনো কাঠের মূর্তির প্রাণরূপী অংশ (ব্রহ্ম পদার্থ) গোপনে স্থানান্তরিত হয় নতুন মূর্তিতে। এই আচারকে বলা হয় ‘নবকলেবর’। তবে এই নবকলেবর উৎসব শুধুমাত্র প্রতি ১২ বা ১৯ বছরে একবার হয়, যখন অশ্বমেধ পূর্ণিমা ও আষাঢ় মাস একসঙ্গে পড়ে।
স্নানযাত্রা উপলক্ষে মন্দির চত্বর জনসমুদ্র হয়ে ওঠে। দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী আসেন এই মহামানবীয় ইশ্বরদর্শনের জন্য। মন্দির প্রাঙ্গণে বসে মেলা, পরিবেশিত হয় নানা রকম ভোগ, শোনা যায় ওডিয়া ভজন ও কীর্তন। এই আনন্দোৎসব শুধুমাত্র ভক্তদের ভক্তিপূর্ণ রসপান নয়, বরং এক সামাজিক মিলনের আয়োজনও। স্নানযাত্রার প্রায় পনেরো দিন পরে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি বিশাল উৎসব রথযাত্রা। দেবতাদের স্নান ও অসুস্থতা শেষে যখন তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তখনই হয় রথে চড়ে গুন্ডিচা মন্দিরে যাত্রা। এই রথযাত্রা হল জগন্নাথদেবের জগতে পুনরাগমনের প্রকাশ। একে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অগণিত লোককথা, গান, কবিতা ও নাট্যচর্চা।
স্নান যাত্রার মধ্য দিয়ে এক অসাধারণ তাত্ত্বিক বার্তা পাওয়া যায় ঈশ্বর শুধু পূজার পাত্র নন, তিনি ভক্তের অনুভবেরও কেন্দ্র। ঈশ্বরের স্নান, অসুস্থতা, বিশ্রাম এই সবকিছুই দেখায় তিনি আমাদেরই মতো, আমাদের মাঝেই। এই ভক্ত-প্রতিভাস যুক্তি পুরীর ভক্তধর্মের কেন্দ্রে স্থান পায়। এই উপলব্ধির মধ্যে রয়েছে ঈশ্বর ও মানবের বন্ধনের এক আন্তরিক ভাষ্য। শুধু ওড়িশা নয়, বাংলাতেও স্নানযাত্রার বিস্তার রয়েছে। অনেক শাক্ত ও বৈষ্ণব মন্দিরে এদিন বিশেষ পুজো ও স্নান উৎসব পালিত হয়। নদীয়ার শ্রীরামপুর, মেদিনীপুরের গড়বেতা, হুগলির গুড়াপ কিংবা বর্ধমানের কাটোয়া এইসব অঞ্চলেও জগন্নাথের স্নানযাত্রা পালন এক চিরায়ত পরম্পরা। অনেকে এই দিন গৃহদেবতার স্নান ও বিশেষ ভোগ দেন।
আজকের দিনে, যেখানে ধর্মাচার অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ, সেখানে স্নানযাত্রা এক ব্যতিক্রম। এই উৎসব এখনও স্বতঃস্ফূর্ত, প্রাণবন্ত এবং সার্বজনীন। বহু আন্তর্জাতিক ভক্ত, বিশেষত ইসকন সংগঠনের সদস্যরাও এই স্নানযাত্রা পালন করেন, যার ফলে উৎসবটি আন্তর্জাতিক মাত্রাও পেয়েছে। জগন্নাথের স্নানযাত্রা কেবল একটি তিথি নয়, বরং এটি এক ঐশ্বরিক সংলাপ, যেখানে ঈশ্বর নিজে মানুষের হয়ে ওঠেন। এই স্নানের মধ্যে দিয়ে আমরা যেমন দেখি আচার-আস্থার এক গভীর মিলন, তেমনি পাই উৎসবের আনন্দ আর মানবিকতার ছোঁয়া। পুরীর গরম রোদ, ঢাকের আওয়াজ, ফুলের গন্ধ আর চন্দনের শীতল পরশ সব মিলিয়ে স্নানযাত্রা আমাদের চেতনার পবিত্রতম বৃষ্টির মতো। এই উৎসব কেবল বিশ্বাসের নয়, বরং ভালোবাসার এক দেবতা, যিনি আমাদের মতোই খান, ক্লান্ত হন, অসুস্থ হন, বিশ্রাম নেন এই মানবিক জগন্নাথই আজও কোটি মানুষের হৃদয়ের চাবিকাঠি।