19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বিসর্জনের দিনে সিঁদুর খেলা হয় কেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসব। দেবী দুর্গার আগমন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পর্বের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিশেষ আবেগ, সামাজিক রীতি এবং গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। দুর্গাপূজার শেষ দিনে, অর্থাৎ বিজয়া দশমীতে, দেবীকে বিসর্জনের আগে সিঁদুর খেলার যে অনুষঙ্গ দেখা যায়, তা শুধু আনন্দ আর উল্লাসের নয় বরং এর পেছনে রয়েছে প্রাচীন বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও নারীর শক্তি ও স্নেহের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, বিসর্জনের দিনে সিঁদুর খেলা কেন হয়, এর ইতিহাস, প্রতীকী মানে এবং আজকের দিনে এর তাৎপর্য কী।

হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সিঁদুরের ব্যবহার বহু পুরোনো। বিবাহিত হিন্দু নারীর জন্য সিঁদুর কেবল অলংকার নয়, এটি স্বামীর দীর্ঘায়ু ও দাম্পত্য সৌভাগ্যের প্রতীক। দুর্গা দেবীকে হিন্দু সমাজে মায়েরূপে পূজা করা হয়। শাস্ত্রমতে তিনি গৃহিণী, কন্যা ও মাতৃত্বের প্রতীক। বিজয়া দশমীতে দেবীকে যখন বিদায় জানানো হয়, তখন তাঁকে যেন এক গৃহবধূ রূপেই বিদায় দেওয়া হয়। তাই তাঁর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে নারীরা নিজেদের দাম্পত্যজীবনের কল্যাণ ও পরিবারের সুখশান্তি কামনা করেন। নবরাত্রি শেষে দশম দিনে দেবী দুর্গা কৈলাসে ফিরে যান। বাংলায় এটি বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। বিজয়ার অর্থই হলো জয়ের দিন অসুর শক্তির উপর দেবী শক্তির বিজয়। একই সঙ্গে এটি দেবীর মাতৃরূপের বিদায়ের দিনও। এদিন ভক্তরা দেবীকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানালেও সিঁদুর খেলাকে কেন্দ্র করে আবারও আনন্দের রঙে রাঙিয়ে তোলে সেই বিদায়কে। এভাবে অশ্রু ও আনন্দ একসঙ্গে মিলেমিশে যায়। সিঁদুর খেলার রীতি মূলত বিবাহিতা নারীদের মধ্যে পালিত হয়। প্রথমে তাঁরা দেবী দুর্গার কপালে, সিঁথিতে এবং মুখে সিঁদুর পরান। এরপর একে অপরের কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সঙ্গে মিষ্টি খাওয়ানো, আলিঙ্গন ও শুভকামনা বিনিময় হয়। এই রীতি শুধু আচার নয়, বরং এটি নারীদের একাত্মতার এক অনন্য প্রকাশ।


প্রতীকী মানে

১. দাম্পত্য সুখের কামনা: বিবাহিতা নারীরা বিশ্বাস করেন, দেবীর কপালে সিঁদুর পরানোর মাধ্যমে নিজের স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গল কামনা করা যায়।
২. মাতৃরূপের বিদায়: দুর্গা মায়ের বিদায়ে তাঁকে সিঁদুর পরানো যেন কন্যারূপী মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি ফেরানোর আগে আশীর্বাদ জানানোর মতো।
৩. আনন্দ ও ঐক্য: বিদায়ের মুহূর্তে দুঃখকে ছাপিয়ে আনন্দের মাধ্যমে মিলন ঘটানো হয়। সিঁদুরের লাল রঙ শক্তি, উষ্ণতা ও জীবনের প্রতীক।
4. নারীর শক্তির প্রতীক: সিঁদুর হলো নারীশক্তির রঙ। দেবীর সঙ্গে নারীরা এই রঙ ভাগ করে নেন, যা তাঁদের অন্তরের শক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে প্রকাশ করে।

সিঁদুর খেলা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি নারীদের সামাজিক মিলনমেলার একটি উপলক্ষও। বছরের পর বছর একসঙ্গে এই রীতি পালনের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। এখানে বয়স, জাতপাত বা সামাজিক বিভাজন থাকেনা সবাই একই সিঁদুরে রাঙা হয়ে ওঠেন। আজকের দিনে সিঁদুর খেলা কেবল আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দুর্গাপূজার এক বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। মণ্ডপে সিঁদুর খেলতে আসেন অগণিত নারী, এমনকি অনেকে ফটোগ্রাফি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই মুহূর্ত ভাগ করেন। তবে এখনও রীতি অনুযায়ী সিঁদুর খেলা বিবাহিতা নারীর জন্যই সংরক্ষিত, যদিও আধুনিক কালে অনেক জায়গায় অবিবাহিত নারী বা বিদেশিরাও আনন্দে যোগ দেন। যদিও অধিকাংশ মানুষ এই আচারকে আনন্দময় ও ইতিবাচক হিসেবে দেখেন, কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা রয়েছে। যেমন,

  • সিঁদুর খেলা বিবাহিত নারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ফলে অবিবাহিতা, বিধবা বা অন্য পরিচয়ের নারীরা এর বাইরে থেকে যান।

  • আধুনিক নারীবাদী আলোচনায় অনেকেই বলেন, নারীর সুখ বা ক্ষমতাকে শুধু দাম্পত্য ও স্বামীর দীর্ঘায়ুর সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
    তবে তবুও এই আচার আজও বহমান, কারণ এটি মানুষের অন্তরে গভীর আবেগ ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।

বাংলার প্রতিটি অঞ্চলে সিঁদুর খেলার ধরণে খানিকটা পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও দেবীর বিসর্জনের আগে, আবার কোথাও বিসর্জনের পর সিঁদুর খেলা হয়। কোথাও নারীরা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে শুভেচ্ছা জানান, আবার কোথাও শুধু আলিঙ্গনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই বৈচিত্র্যই বাংলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। লাল রঙ চিরকালই শক্তি, জীবন ও আবেগের প্রতীক। দেবীর রূপ লাল আভায় ভাস্বর তাঁর পরাজয় নেই, তিনি চিরজীবনীশক্তির আধার। সেই লাল সিঁদুরে নারীরা নিজেদের জীবনকে নতুন করে উদযাপন করেন। এটি যেন এক অদৃশ্য আশীর্বাদের ছোঁয়া, যা অশ্রুর মাঝেও আশা জাগায়। বিসর্জনের দিনে সিঁদুর খেলা শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতি নয়, বরং এটি বাংলার নারীদের সামাজিক বন্ধন, আনন্দ ভাগাভাগি আর আশাবাদের এক অনন্য প্রকাশ। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দুঃখকে আনন্দের রঙে মুড়ে দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানানোর প্রতিশ্রুতি এ আচার বহন করে। এই খেলায় লুকিয়ে আছে মাতৃত্ব, দাম্পত্য, শক্তি, ঐক্য ও নারীর অদম্য জীবনশক্তি। তাই বলা যায়, বিসর্জনের দিনে সিঁদুর খেলা কেবল এক দিনের আচার নয়, এটি বাঙালি জীবনের এক অনন্য রঙিন প্রতীক, যা প্রতিবারই মনে করিয়ে দেয় বিদায় মানেই শেষ নয়, বরং নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি।

Archive

Most Popular