বিনোদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
শারদীয়া মানেই বাঙালির জীবনে এক বিশেষ সময়। মনের ভেতর জমে থাকা আনন্দ যেন হঠাৎ মুক্তির রাস্তা খুঁজে পায়। নতুন জামা, সাজপোশাক, প্যান্ডেল হপিং, আলো-ঝলমলে রাত্রি সবকিছুই যেন একসাথে এসে জীবনের রঙ পাল্টে দেয়। কিন্তু ফ্যাশনের কথা উঠলেই আমরা সাধারণত জামাকাপড়, গয়না কিংবা মেকআপ নিয়েই ভাবি। অথচ আমাদের স্টাইলকে সম্পূর্ণ করে তোলার জন্য এক অনন্য উপাদান হলো চশমা। চশমা শুধু চোখের সমস্যা মেটানোর জন্য নয়, আজ এটি আধুনিক ফ্যাশনের অন্যতম পরিচয়পত্র। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে, যখন সবাই নিজের সেরা রূপটিকে তুলে ধরতে চায়, তখন চশমা হতে পারে স্টাইল স্টেটমেন্টের নতুন সংজ্ঞা।
একসময় চশমা ছিল শুধুমাত্র দৃষ্টিশক্তি সংশোধনের উপকরণ। প্রাচীন যুগে চশমা মানেই দুর্বল চোখের লজ্জা ঢাকার উপায়। কিন্তু কালের পরিবর্তনে চশমা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্বের অংশ।
উনবিংশ শতকে: ইউরোপে গোল ফ্রেমের চশমা শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষের প্রতীক হয়ে ওঠে।
বিশ শতকে: চলচ্চিত্র ও পপ কালচারের প্রভাবে চশমা ফ্যাশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। এলভিস প্রিসলি থেকে অড্রে হেপবার্ন—সবাই চশমাকে গ্ল্যামারের উচ্চতায় নিয়ে যান।
ভারত ও বাংলা: অমিতাভ বচ্চনের এভিয়েটর সানগ্লাস, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পাতলা ফ্রেম, কিংবা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর সানগ্লাস আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।
আজকের দিনে চশমা শুধুমাত্র কার্যকরী উপাদান নয়, বরং ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি।
দুর্গাপুজো মানেই ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে তোলা। জামা যতই সুন্দর হোক না কেন, অ্যাকসেসরিজ ছাড়া সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর এই অ্যাকসেসরিজের জগতে চশমা হতে পারে গোপন অস্ত্র।
স্টাইল স্টেটমেন্ট: সঠিক চশমা মুখের আকৃতি ও পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সাধারণ সাজও ঝলমলে হয়ে ওঠে।
প্রোটেকশন: প্যান্ডেল হপিং-এর সময় রোদ বা ধুলো থেকে চোখকে রক্ষা করে।
কনফিডেন্স: যারা চশমা ছাড়া অস্বস্তি বোধ করেন, তাদের জন্য এটি আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
বৈচিত্র্য: একাধিক ফ্রেম ও লেন্স বদল করে প্রতিদিন নতুন লুক তৈরি করা সম্ভব।
পুজোতে সাজতে গেলে প্রথমেই দরকার নিজের মুখের আকৃতি বোঝা। কারণ চশমা মুখের গঠন অনুযায়ী নির্বাচন করলে সেটি ফ্যাশনকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
গোল মুখ: আয়তাকার বা ক্যাট-আই ফ্রেম মানানসই।
চৌকো মুখ: গোলাকার বা ওভাল ফ্রেম মুখকে নরম করে তোলে।
ওভাল মুখ: প্রায় সব ধরনের ফ্রেম মানায়, বিশেষ করে এভিয়েটর বা ওয়েফারার।
হার্ট-শেপড মুখ: হালকা ফ্রেম বা পাতলা গোল চশমা আদর্শ।
যারা চোখের সমস্যার কারণে প্রতিদিন চশমা পরেন, তাদের জন্য পুজোর বিশেষ দিনগুলোতে ফ্যাশনেবল ফ্রেম বেছে নেওয়া জরুরি।
পাতলা মেটাল ফ্রেম
ট্রান্সপারেন্ট বা কালারড ফ্রেম
রেট্রো গোল ফ্রেম
দিনের বেলায় প্যান্ডেল হপিং-এ সানগ্লাস একেবারেই অপরিহার্য।
এভিয়েটর: কখনো পুরোনো হয় না।
ক্যাট-আই: মেয়েদের জন্য রেট্রো ফ্লেভার।
ওভারসাইজড: গ্ল্যামারাস লুক।
স্পোর্টস স্টাইল: যারা ক্যাজুয়াল রাখতে চান।
আজকাল অনেকেই সাজের অংশ হিসেবে পাওয়ার ছাড়া ফ্যাশন গ্লাসেস ব্যবহার করেন। রঙিন লেন্স বা ইউনিক ফ্রেম দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা যায়।
শাড়ি: রেট্রো শাড়ির সঙ্গে গোল চশমা বা ক্যাট-আই ফ্রেম মানানসই।
সালোয়ার কামিজ বা কুর্তি: ট্রেন্ডি ওয়েফারার বা কালারড ফ্রেম।
ওয়েস্টার্ন ড্রেস: ওভারসাইজড সানগ্লাস বা ট্রান্সপারেন্ট ফ্রেম।
পাঞ্জাবি-পায়জামা: ক্লাসিক এভিয়েটর বা পাতলা মেটাল ফ্রেম।
কুর্তা-জিন্স: ওয়েফারার বা স্পোর্টস সানগ্লাস।
ফরমাল লুক: কালো বা টরটয়েসশেল ফ্রেমের চশমা।
দুর্গাপুজোর পাঁচদিন আলাদা সাজ থাকে। তাই প্রতিদিনের সঙ্গে চশমার মিলও বদলানো যায়।
ষষ্ঠী: হালকা ফ্রেম বা মিনিমাল সানগ্লাস।
সপ্তমী: কুর্তা বা শাড়ির সঙ্গে ট্রেন্ডি রঙিন ফ্রেম।
অষ্টমী: গর্জিয়াস শাড়ির সঙ্গে ওভারসাইজড বা ক্যাট-আই গ্লাস।
নবমী: ফিউশন লুকের সঙ্গে স্পোর্টি সানগ্লাস।
দশমী: সাদা-লাল শাড়ি বা ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে ক্লাসিক গোল ফ্রেম।
চশমা থাকলে মেকআপে কিছু বাড়তি যত্ন দরকার।
চোখের কাজকে হাইলাইট করতে হবে, তবে ভারী না করে।
আইলাইনার ও মাসকারা ব্যবহার করলে চোখ স্পষ্ট দেখায়।
লিপস্টিকের শেড মুখকে ব্যালান্স করে।
ফাউন্ডেশন এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে চশমার নাকের কাছে দাগ না পড়ে।
আজকের যুগে পুজোর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ফটোশুট অপরিহার্য। চশমা ফটোতে একটি আলাদা আকর্ষণ যোগ করে।
রোদেলা দুপুরে সানগ্লাস পরে ফ্রেম করা ছবি।
প্রতিমার সামনে চশমা পরা ক্যান্ডিড শট।
বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ ফটোতে ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেমের চশমা।
ব্লু-লাইট প্রটেকশন গ্লাস: মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের কারণে এটি আজকাল খুব জনপ্রিয়।
ট্রান্সপারেন্ট ফ্রেম: আধুনিক ও হালকা লুকের জন্য।
গ্রেডিয়েন্ট লেন্স সানগ্লাস: ফ্যাশন ও প্রোটেকশন একসঙ্গে।
রঙিন ফ্রেম: লাল, সবুজ, হলুদ রঙে চশমার নতুন ঢেউ।
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া: এভিয়েটর সানগ্লাসের জন্য বিখ্যাত।
দীপিকা পাড়ুকোন: ওভারসাইজড সানগ্লাসে তার গ্ল্যামারাস লুক সবসময় নজরকাড়া।
অমিতাভ বচ্চন: চশমাকে পুরুষ ফ্যাশনের অপরিহার্য অংশ করে তুলেছেন।
আজকাল ফ্যাশনের সঙ্গে পরিবেশের কথাও ভাবা হচ্ছে। বাজারে এসেছে বাঁশ, কাঠ বা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের তৈরি ফ্রেম। দুর্গাপুজোর মতো উৎসবে এই ধরনের ফ্রেম ব্যবহার করলে তা পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতারও পরিচয়।
চশমা আর কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের ফ্যাশন নয়। শিশুদের জন্যও রঙিন সানগ্লাস বাজারে জনপ্রিয়। পারিবারিক প্যান্ডেল হপিং-এ বাবা-মা ও বাচ্চাদের মিলিয়ে চশমার থিম তৈরি করা যায়।
ফ্যাশনের পাশাপাশি চশমার যত্ন নেওয়াও জরুরি।
সবসময় নরম কাপড় দিয়ে মুছতে হবে।
গরম গাড়ির ড্যাশবোর্ডে চশমা রেখে দেওয়া উচিত নয়।
হার্ড কেসে রাখলে লেন্স ও ফ্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্মার্ট গ্লাসও এখন বাজারে আসছে। এতে শুধু দৃষ্টিশক্তিই নয়, স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, ফটো ক্যাপচার, এমনকি হেলথ মনিটরিং-ও সম্ভব। আগামী দিনে পুজোর ফ্যাশনে স্মার্ট গ্লাস হতে পারে বড় আকর্ষণ। দুর্গাপুজোতে সাজগোজ মানে শুধু নতুন পোশাক নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। সেই প্রকাশে চশমা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সঠিক ফ্রেম ও লেন্স বেছে নিলে চশমা আপনাকে আলাদা করে তুলবে, আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে এবং আপনার ফ্যাশনকে সম্পূর্ণ করবে। তাই এবারের পুজোয় চশমা থাকুক ফ্যাশনে ও! কারণ ফ্যাশন মানে কেবল বাহ্যিক সাজ নয়, বরং নিজের সত্তাকে নতুনভাবে উদযাপন করা।