19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

প্রতিবছর জগন্নাথের রথের কাঠ আসে কোথা থেকে জানেন?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ভারতের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম উৎসবগুলির একটি হল রথযাত্রা। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা হিন্দুদের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যেও সমান জনপ্রিয়। রথযাত্রা শব্দটির সঙ্গে যে নামটি অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে, তা হল পুরীর জগন্নাথদেব। বিশ্বব্যাপী যত রথযাত্রা পালিত হয়, তার মধ্যে সবথেকে বড় ও আকর্ষণীয় এই পুরীর রথযাত্রাই।

এই উৎসবের মূল আকর্ষণ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার তিনটি বিশাল রথ। প্রতি বছর নতুন করে তৈরি হয় এই তিন রথ। পাঁচ মাস আগে থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। মাঘ মাসের বসন্ত পঞ্চমীতে কাঠ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় রথ নির্মাণের প্রাথমিক কাজের। মূল কাঠামো নির্মাণ শুরু হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে। প্রতিটি রথের রয়েছে নির্দিষ্ট উচ্চতা, চাকা, ধ্বজা, বেদি ও রঙিন পট্টবস্ত্রের সাজ। তিনটি রথেই থাকে চারটি করে তোরণ, মণ্ডপের চারপাশে সজ্জিত হয় বাহারি অলংকার, ছবি ও পুতুলে।

রথ নির্মাণে ব্যবহার হয় নিখাদ কাঠ – প্রধানত নিমগাছের কাঠ। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এত বিশাল পরিমাণ কাঠ প্রতিবছর আসে কোথা থেকে?

উত্তর লুকিয়ে আছে পুরীর কাছের দুটি সংরক্ষিত জঙ্গলে—দাশপাল্লা ও রাণাপুর। এই দুটি অরণ্য বিশেষ ভাবে সংরক্ষিত, যেখানে মূলত নিমগাছই প্রচুর পরিমাণে জন্মে। মন্দির কর্তৃপক্ষ ও ওড়িশা সরকারের বনবিভাগ যৌথ ভাবে প্রতিবছর এখান থেকেই সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নিমকাঠ। তবে পরিবেশ সচেতনতার দৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। প্রতি বছর যে সংখ্যক গাছ কাটা হয়, তার অন্তত দ্বিগুণ গাছ পুনরায় রোপণ করা হয় ওই দুই জঙ্গলে। ফলে জঙ্গলের কাঠের ভাণ্ডার কখনওই ফুরায় না। গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের এই প্রক্রিয়া শতাব্দী প্রাচীন রীতি হিসেবেই চলে আসছে, যা আধুনিক বন-পরিচালনার কাছেও এক অনন্য উদাহরণ।

রথ নির্মাণে কোনও ধাতব উপাদান ব্যবহার হয় না। নেই কোনও লোহার পেরেক বা আধুনিক যন্ত্রাংশ। কাঠের হাতুড়ি ও কাঠের চিপ দিয়েই তৈরি হয় রথ। প্রায় পঞ্চাশজন সেবায়েত ও কারিগর দিনের পর দিন পরিশ্রম করে তৈরি করেন এই রথ, যার আয়ু মাত্র আট দিন! কারণ উল্টোরথে জগন্নাথ শ্রীমন্দিরে ফিরে এলেই শুরু হয় রথ ভাঙার পবিত্র কাজ। তবে রথ ভাঙা মানেই তাৎক্ষণিক ধ্বংস নয়। ভক্তিভরে আলাদা করা হয় প্রতিটি অংশ। প্রথমে রথের চাকার কাঠ বিলি করা হয় ভক্তদের মধ্যে। কারণ, রথের চাকা বাড়িতে রাখা শুভ বলে বিশ্বাস করা হয়। বাকি কাঠ সংগ্রহ করে পাঠানো হয় মন্দিরের ভোগ রান্নার জন্য। জগন্নাথের প্রসাদ শুধু কাঠ জ্বালিয়ে রান্না হয়, এবং এই কাঠের একটা বড় অংশ আসে পুরনো রথ ভেঙে সংগৃহীত কাঠ থেকেই।

এইভাবে প্রভুর রথযাত্রা শুধুমাত্র এক ধর্মীয় বা ঐতিহ্যবাহী উৎসব নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জগন্নাথের রথ তৈরি ও ভাঙার পরেও তার কাঠ নতুন জীবন পায় রান্নাঘরে, আর গাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় নতুন গাছ লাগানোর প্রক্রিয়া। এ যেন প্রকৃতি, পরমেশ্বর ও মানুষের মধ্যে এক আশ্চর্য ভারসাম্য ও সহযোগিতার উৎসব! জগন্নাথদেবের রথ যেমন ভক্তির প্রতীক, তেমনই তা পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত উদাহরণ। বছর বছর যে কাঠ দিয়ে তৈরি হয় তিন রথ, সেই কাঠই আবার ফিরিয়ে দেয় জীবনের পরবর্তী চক্রে নতুন বৃক্ষ, নতুন খাদ্য, নতুন পুণ্য।

Archive

Most Popular