19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মহালয়া তে তর্পণ কেন করা হয়?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাঙালির দুর্গোৎসবের সূচনা হয় মহালয়া দিয়ে। ভোরবেলা চণ্ডীপাঠ, রেডিওয় বাজতে থাকা জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী সব মিলিয়ে মহালয়া আমাদের মনে আনে এক বিশেষ আবেগ। তবে মহালয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পিতৃতর্পণ। এই দিনে গঙ্গা বা অন্য পবিত্র জলে স্নান করে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে অঞ্জলি দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় তর্পণ। প্রশ্ন জাগে মহালয়া তে তর্পণ কেন করা হয়?


তর্পণ শব্দের অর্থ

তর্পণ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু তৃপ্ থেকে, যার অর্থ তৃপ্ত করা বা পরিতৃপ্তি দেওয়া। অর্থাৎ, জলের মাধ্যমে পিতৃপুরুষ ও দেবতাদের তুষ্ট করা, তাঁদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করাই তর্পণের মূল উদ্দেশ্য।


মহালয়ার তাৎপর্য

  • পিতৃপক্ষের সমাপ্তি: মহালয়া হলো পিতৃপক্ষের শেষ দিন। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষ থেকে শুরু হয় শ্রাদ্ধপক্ষ, যা মহালয়া অবধি চলে। এই সময়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ, দান ও তর্পণ করা হয়।

  • দেবীপক্ষের সূচনা: মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয় দেবীপক্ষ, অর্থাৎ দুর্গার আহ্বান। তাই পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবীর আগমনকে স্বাগত জানানো হয়।

  • পুরাণোত্তর কাহিনি: কিংবদন্তি মতে, এই দিনে মহিষাসুর বধের জন্য দেবী দুর্গাকে জাগ্রত করা হয়েছিল দেবতাদের আহ্বানে। একইসঙ্গে পূর্বপুরুষদের সন্তুষ্ট করার আচারও এদিন সম্পন্ন হয়।


তর্পণের ধর্মীয় কারণ

  1. পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ প্রার্থনা: বিশ্বাস করা হয়, পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীতে নেমে আসেন। তাঁদের তুষ্ট করলে পরিবার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করে।

  2. আত্মার মুক্তি: তর্পণ ও শ্রাদ্ধের মাধ্যমে মৃত আত্মার তৃপ্তি হয় এবং তাঁদের পরলোকে উন্নতি ঘটে।

  3. ঋণমোচন: শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মানুষ জন্মসূত্রে তিন ঋণে আবদ্ধ দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ। তর্পণের মাধ্যমে পিতৃঋণ শোধ করার চেষ্টা করা হয়।


শাস্ত্রীয় উল্লেখ

  • মনুস্মৃতিগরুড় পুরাণে বলা হয়েছে, যাঁরা জীবদ্দশায় তাঁদের পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান, তাঁদেরই বংশধররা সুখ ও সমৃদ্ধি ভোগ করেন।

  • মহাভারতে কর্ণের কাহিনি রয়েছে তিনি মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে দেখলেন খাবার পাচ্ছেন না, কারণ জীবনে কখনও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্নদান করেননি। এই গল্প থেকেই বোঝা যায় তর্পণের গুরুত্ব।


তর্পণের প্রক্রিয়া

  • সাধারণত গঙ্গার ঘাটে বা পবিত্র নদীর জলে পুরোহিতের মাধ্যমে তর্পণ করা হয়।

  • কুশ ঘাস, জল, কালো তিল, অক্ষত চাল, ফুল ইত্যাদি ব্যবহার হয়।

  • পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করে জল অর্ঘ্য দেন পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে।

  • পরিবারে যাঁরা তর্পণ করেন, তাঁরা কুলপুরোহিতের নির্দেশ অনুযায়ী আচার পালন করেন।


সামাজিক ও মানসিক তাৎপর্য

তর্পণ কেবল আচার নয়, এর মধ্যে গভীর সামাজিক ও মানসিক দিকও রয়েছে।

  1. পূর্বপুরুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা: আমাদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি তাঁদের হাত ধরেই এসেছে। তর্পণ সেই স্মৃতিচারণ ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উপায়।

  2. পারিবারিক ঐক্য: মহালয়ার সকালে পুরো পরিবার মিলে তর্পণ করতে যায়। এতে পারিবারিক বন্ধন মজবুত হয়।

  3. মানসিক শান্তি: পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে দান বা অর্ঘ্য দেওয়া মানুষের মনে একধরনের শান্তি ও পরিতৃপ্তি আনে।


আধুনিক প্রেক্ষাপটে তর্পণ

আজকের দিনে তর্পণ শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার হিসেবেই নয়, একধরনের সাংস্কৃতিক পরম্পরা হিসেবেও পালিত হয়। কলকাতার বাবুঘাট, বালি, শেওড়াফুলি সর্বত্র হাজার হাজার মানুষ ভোরে তর্পণ করতে আসেন। শহরের কোলাহল ভুলে এই এক সকাল জুড়ে থাকে আধ্যাত্মিক আবহে। মহালয়া তাই দ্বিমুখী তাৎপর্যের দিন একদিকে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা ও দেবী দুর্গার আহ্বান। তর্পণ হলো আমাদের কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, আত্মার মুক্তির কামনা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই মহালয়ার সকালে গঙ্গার ঘাটে মন্ত্রোচ্চারণ আর তর্পণের জলধারায় এক অনন্য আবেগে ভেসে যায় সমগ্র বাঙালি সমাজ।

পিতৃতর্পণের সঙ্গে মহালয়া ও পিতৃপক্ষের উৎপত্তি নিয়ে দুটি প্রধান কাহিনি প্রচলিত:

রামায়ণ অনুসারে, রাবণবধের পূর্বে শ্রী রামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করার সংকল্প নেন। সেই সময় দেবীর পূজার আচার হিসেবে তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল ও অন্ন নিবেদন করেন। বিশ্বাস করা হয়, তিনি এই তর্পণ করেছিলেন মহালয়ার দিনেই। তাই মহালয়া থেকেই শুরু হয় দেবীপক্ষ, আর তার আগে সমাপ্ত হয় পিতৃপক্ষ। অনেকে মনে করেন, এই ঘটনাই মহালয়ার দিনে তর্পণের সূচনার ভিত্তি। মহাভারতে বর্ণিত একটি অতি জনপ্রিয় কাহিনি হলো কর্ণকে ঘিরে। কর্ণ সারাজীবন স্বর্ণ, রত্ন, ধনরত্ন প্রভৃতি দান করতেন, কিন্তু কখনো পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল বা খাদ্য দেননি। কারণ তিনি নিজের প্রকৃত পিতৃপরিচয় জানতেন না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে মৃত্যুর পর যখন তাঁর আত্মা স্বর্গে গেল, সেখানে তাঁকে সোনাদানা পরিবেশন করা হয় কিন্তু খাদ্য নয়। অবাক হয়ে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে কারণ জানতে চাইলে ইন্দ্র বলেন, তিনি জীবনে কখনো পিতৃপুরুষকে জল বা অন্ন দেননি, তাই এ ফল পাচ্ছেন। কর্ণ তখন তাঁর অজ্ঞাতসারে ঘটে যাওয়া ভুলের কথা জানালে ইন্দ্র দয়া করে তাঁকে এক পক্ষকালের জন্য মর্ত্যে ফিরে এসে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন নিবেদনের অনুমতি দেন। কর্ণ সেই পক্ষকাল ধরে তর্পণ সম্পন্ন করেন। এরপর থেকেই সেই পক্ষকালকে বলা হয় পিতৃপক্ষ

এই দুই কাহিনি রামচন্দ্রের তর্পণ ও কর্ণের অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে জন্ম নেওয়া আচার বাঙালি সমাজে মহালয়া ও তর্পণের গুরুত্বকে ব্যাখ্যা করে। একদিকে দেবীপূজার আগে পূর্বপুরুষকে তুষ্ট করার আচার, অন্যদিকে সন্তানদের কাছে পিতৃঋণ স্মরণ করিয়ে দেওয়া এই দুই মিলেই মহালয়া আজও আমাদের জীবনের অন্যতম আধ্যাত্মিক দিন।

Archive

Most Popular