19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

আচারকাকু, আমার স্কুল আর প্রিয় বন্ধুরা...

প্রতিবেদন

সুস্মিতা মিত্র


স্কুলের পশ্চিমের গেট পেরিয়ে ঠিক উল্টোদিকের ফুটপাতটা আমাদের কাছে ছিল সব পেয়েছির আসর। বাড়ির বড়দের কথা অনুযায়ী সবরকম অখাদ্য কুখাদ্যের আস্তানা। সার সার দেওয়া রঙিন পেপসি, কুলফি, নারিকেল দেওয়া কাঠি আইসক্রিম, আলুকাবলি, হজমিগুলি, কারেন্ট নুন আর বড় বড় কাচের বয়ামে রাখা আচারের দোকান। সবই ঠেলাগাড়ির মতো, ওই স্কুলের সময়টুকুর জন্য। মাঝে মাঝে ভাবতাম দিনের  বাকি সময়টুকু এরা কী কাজ করে! এখন বুঝি, ওই ৬ ঘণ্টার ছোট ছোট খুশির জোগান দিতে এদের বাকি গোটা দিনরাত সবটাই হয়তো কেটে যেত! পাশের ঘুপসি গলিতে ছিল মাছ লজেন্স, মৌরি দেওয়া টিকটিকির ডিম লজেন্স আর বিভিন্নরকম চিপসের দোকান। এসবের সঙ্গে ট্রাম্প কার্ড দিত তখন। চিপস খাওয়ার থেকে ওই ট্রাম্প কার্ড জমানোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত, তখন ক্লাস এইট। মাঝেমধ্যে একটা দোকান বসত ফুচকার থেকে একটু বড় এমন সাইজের লুচি আর না-ঝাল না-নুন এমন মশলা ছাড়া ঝোল ঝোল ঘুগনি। ওপরে গ্রেট করা রঙিন পেঁপে আর ভাজা মশলা দেওয়া। তিনটে পাঁচ টাকা। যেন ছোট্টখাট্টো একটা মেলার মতো।
একেই তো গার্লস স্কুল, একবার ভিতরে ঢুকে প্রেয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লে স্কুল ছুটির ঘণ্টা না-বাজলে বেরোনোর উপায় নেই। দিদিমণিদের হুকুম, সঙ্গে ভোলাদা আর ছায়াদির কড়া পাহারা। যারা স্কুল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল। ওসব পেরিয়ে পুঁচকে ইঁদুর পর্যন্ত গলে বেরোতে পারবে না। আর সেসব পেরিয়ে যদি কেউ হঠাৎ করেই 'খতরোঁ কা খিলাড়ি' হয়ে উঠত, একবার কারওর চোখে পড়লেই তাঁর জীবন শেষ; অবধারিতভাবে হেড মিস্ট্রেসের ঘরের সামনে কান ধরে দাঁড়ানো-সহ গার্জিয়ান কল।
হলুদ হাসনুহানায় ঘেরা কেমিস্ট্রি ল্যাব পার করে টিচার্স রুম ছাড়িয়ে বকুলের মোরামে ঢাকা রাস্তা, একধারে ক্লাস ফাইভ-এ, আরেকদিকে রংবেরঙের পাতাবাহারিতে সাজানো কমন রুমের বিল্ডিং। এসব ছাড়িয়ে সোজা হেঁটে গেলে মূল দরজা। আর তাতে মস্ত বড় একখানা পিতলের তালা। রাজপথ ধরে বেয়ে আসা ব্রজবালিকাদের প্রবেশপথ। সেই বিশাল লোহার দরজায় জেলের আসামিদের মতো একটা ঘুপসি ছোট দরজাও ছিল। ক্লাস ইলেভেন-টুয়েলভ-এর স্টুডেন্টদের ক্লাস না-থাকলে কেবলমাত্র তারাই ছুটির আগে বেরোতে পারত। তো টিফিন পিরিয়ডে ওই ঘুপসি জানলার মতো দরজা থেকে অর্ধেক হাত বের করে যার যা পছন্দ সেসব খাবারদাবার কিনতে পারত। বলাই বাহুল্য একজন কিনলে তার ভাগ পেত সব্বাই। যত না খাওয়া তার থেকে অহেতুক হুড়োহুড়ি বেশি। মজা তো এখানেই। খাবারের স্বাদ বেশি ছিল নাকি প্রিয় বন্ধুরা সঙ্গে ছিল বলে সাধারণ খাবারগুলোই অসাধারণ হয়ে উঠত, উত্তর নেই!
স্কুল শেষে কলকল স্রোতে জনজোয়ার হুমড়ি খেয়ে পড়ত উল্টোদিকের ফুটপাতে। সাদা স্কার্ট, শার্ট, লাল বেল্ট, টাই, আর সাদা কেডস জুতো-মোজায় দলবেঁধে হানা দিত যে যার পছন্দের দোকানে। একটাকার হজমিগুলি বা কারেন্ট নুন। রাংতায় মোড়া চবনপ্রাশ টাইপ একটা চ্যাটচ্যাটে বস্তু ৫০ পয়সা প্রতি পিস। দু'টাকার আমসি, তেঁতুল অথবা কুলের আচার। ওপরে ছড়ানো থাকত বিটনুন আর রসময়ীর গুঁড়ো মশলা। আচার কাকুকে বললে এমনিতেই হাতের তালুতে এক চামচ দিত, চেটে চেটে খেতাম। আমার সবথেকে প্রিয় ছিল মটকা কুলফি আর আচার। বড় বড় কাচের বয়াম, গামলায় পরপর সাজানো কতরকম আচার, লাল রঙের আম তেল, আমসত্ত্ব। ওই আমতেল আলুকাবলি বা ঝালমুড়িতেও মেশাতো লক্ষ করেছি। আবার কেউ চাইলে আলাদা করেও কিনতে পারত। কিন্তু খেতে গেলেই তো বিপদ। অপটু হাতে খেতে গিয়ে কশ বেয়ে নামা আসা আমতেল লেগে যেত গোটা জামায়। আর বাড়ি ফিরেই অবধারিতভাবে কপালে জুটত বকুনি।
আসলে বাড়িতেও তো আমতেল বানানো হত প্রতিবছর। দু'খানা ফজলি আমের গাছ ছিল। কালবৈশাখীর ঝড়ে নীচে পড়লেই বিভিন্নরকম আচার হত। আম তেল সেরামিক বয়ামের মুখে মলমল কাপড় বেঁধে রোদে দেওয়া হত। কিন্তু সেসব আমি কোনওদিন খেতাম না। ওই আচারকাকুর বানানো আম তেলে কী ম্যাজিক ছিল, জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না! আসল নাম কখনও জানা হয়নি। সবাই আচারকাকুই বলতাম। সবসময় প্রাণখোলা হাসি, সবাইকে বাবু মনা এসব বলে ডাকত, এটুকুই শুধু মনে আছে। স্কুল শেষের দিন ওই আচারকাকুকেও মনখারাপ করে বলতে শুনেছি, 'আর তো দেখা হবে না, তোমরাও বড় হয়ে গেলে।' একবার সব বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করে আচার খেতে গিয়েছিলাম, ওই শেষ। তারপর যা হয় একে একে যে যার মতো এদিক-ওদিক ছিটকে গেল। বছরের পর বছর কেটে যায়, ভিডিও কলে সবার সঙ্গে সবার দেখা হয়। আর কেউ না কেউ একবার হলেও বলে চল না সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে যাই। প্ল্যান শেষে সময় এলে দেখি ওই ২-৩ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। তবুও জানি প্রিয় বন্ধুরা সেই আগের মতোই প্রিয় আছে। দু'বছর হোক কি দশ, ওরা ছিল, আছে, থাকবে। দেখা হলে সেই শেষবার যেখানে আলোচনা শেষ হয়েছিল সেখান থেকে আবার শুরু হবে। শেষমেশ আচারকাকুর ওই কথাটাই কানে বাজে, "তোমরাও বড় হয়ে গেলে..."

Archive

Most Popular