প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। দেবী দুর্গা কেবল শক্তির প্রতীক নন, তিনি মা, যিনি মহিষাসুর বধ করে শুভশক্তির জয় নিশ্চিত করেন। দুর্গাপূজার প্রতিমা সাধারণত একচালা কাঠামোর মধ্যে নির্মিত হয় মাঝখানে মা দুর্গা, পাশে গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি প্রতিমার পেছনে একটি বিশেষ ছবি বা কাঠামো আঁকা থাকে, যেখানে শিবের উপস্থিতি অনিবার্য। প্রশ্ন জাগে কেন প্রতিটি দুর্গা প্রতিমার পেছনে শিবের ছবি থাকে?
এর উত্তর নিহিত রয়েছে পুরাণকথা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শিল্পরীতি এবং আধ্যাত্মিক প্রতীকের মধ্যে। এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব শিবের এই পেছনের ভূমিকা নিয়ে।
হিন্দু ধর্মীয় দর্শনে শিব ও দুর্গা বা পার্বতী একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দেবী দুর্গা আসলে পর্বতকন্যা পার্বতী, যিনি শিবের অর্ধাঙ্গিনী। শিবপুরাণ, কালিকাপুরাণ এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবী মহাত্ম্যমে দেবীর শক্তির উত্স হিসেবে শিবের উল্লেখ রয়েছে।
শিবই শক্তিহীন শব এমন এক প্রচলিত উক্তি আছে। অর্থাৎ, শিব যদি শক্তিহীন হন, তবে তিনি মৃতদেহের মতো। আর শক্তি, অর্থাৎ দুর্গা, শিবকে কার্যকরী করে তোলেন।
দেবী দুর্গার আরাধনা হয় মহিষাসুর বধের জন্য, কিন্তু তাঁর শক্তির উৎস আসলে শিব। তাই প্রতিমার পেছনে শিবের প্রতীক রাখা হয়, যাতে বোঝা যায় দুর্গা একা নন তিনি শিবশক্তিরই প্রতিরূপ।
কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে, দেবী দুর্গা শরৎকালে মর্ত্যে আসেন। তিনি কৈলাসে থাকেন শিবের সঙ্গে, আর পূজার সময় মাত্র চার দিন তিনি বাবার বাড়ি আসেন সন্তানদের নিয়ে। তাই মূর্তির পেছনে শিবের ছবি বা প্রতীক দেখানো হয় এটি যেন বোঝায়, দুর্গা তাঁর গৃহস্থালি ছেড়ে বাপের বাড়ি এসেছেন, কিন্তু স্বামী শিব আছেন তাঁর নেপথ্যে।
১. একচালা প্রতিমার গঠন: একচালা প্রতিমার কাঠামোয় শিবকে পেছনে আঁকা হয় যাতে পুরো কাঠামো পূর্ণতা পায়।
২. ভৌগোলিক প্রতীক: অনেকে মনে করেন, পেছনে শিব পাহাড়ের প্রতীক কারণ দুর্গা পার্বতী, তিনি হিমালয়ের কন্যা। তাই পেছনে শিব মানে আসলে কৈলাস পর্বতের প্রতীক।
৩. শিল্পরীতি: কুমোরটুলি বা বাংলার প্রতিমাশিল্পে এই রীতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এটি একধরনের লোকশিল্পের ধারাবাহিকতা।
শক্তি-শিবের ঐক্য: প্রতিমার সামনে দুর্গা, কিন্তু পেছনে শিব। এটি বোঝায় জগতে নারীশক্তি ও পুরুষশক্তি আলাদা নয়; তারা একে অপরের পরিপূরক।
চেতনা ও শক্তি: শিব হলেন চেতনা, দুর্গা শক্তি। চেতনা ছাড়া শক্তি অচল, আর শক্তি ছাড়া চেতনা নিস্প্রভ।
রক্ষা ও আশীর্বাদ: পেছনে শিবকে রাখা মানে দুর্গার আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে শিবের আশীর্বাদও প্রার্থনা।
বাংলার গ্রামে গ্রামে প্রচলিত আছে যে, মা দুর্গা যখন বাপের বাড়ি আসেন, শিব তখনও তাঁর ছায়ার মতো সঙ্গে থাকেন। তাই শিবকে কখনো বাঘে-চড়া, কখনো ধ্যানমগ্ন যোগী রূপে আঁকা হয়। এটি একধরনের লোকবিশ্বাস স্ত্রীর আনন্দযাত্রার পেছনে স্বামী থাকবেন নিশ্চুপ, অবিচল, আশ্রয়দাতা।
শিবের পেছনের উপস্থিতি আসলে নারীর শক্তিকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক। সমাজে প্রাচীনকাল থেকে নারীকে শক্তি হিসেবে মানা হয়েছে, কিন্তু তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়েছে পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। দুর্গা প্রতিমার পেছনে শিবের উপস্থিতি তাই অনেকের মতে এই সামাজিক দর্শনের প্রতিফলন।
কালীঘাটের পটুয়া শিল্পে দেখা যায়, দুর্গার প্রতিমার পেছনে সবসময় শিব অঙ্কিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কবিতায় বলেছেন
শক্তি আর শিব, এ দুই অখণ্ড,
একে বাদ দিলে জগত অচল।
বাংলার লোকগানে শোনা যায় উমা এল বাপের বাড়ি, শিব রইল আঁধারে।
আজকের দিনে যখন নারীশক্তির ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন দুর্গার প্রতিমার পেছনে শিবের উপস্থিতি নতুন অর্থ দেয়। এটি বোঝায় নারী তাঁর শক্তি নিয়ে সামনের সারিতে থাকলেও, সমাজে পুরুষের সহায়তাই তাঁকে পূর্ণতা দেয় না; বরং দুজনের ঐক্যেই জীবন সুন্দর হয়।
কিছু মতানুসারে, প্রতিমার পেছনে শিবের উপস্থিতি নারীশক্তিকে পুরুষের সঙ্গে যুক্ত করে রাখার এক সামাজিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ মনে করেন, দুর্গা নিজেই সর্বশক্তিময়ী; তাঁকে পেছনে শিবের প্রয়োজন নেই। তবে আবার অনেকে বলেন, এটি ক্ষমতার দ্বৈত প্রতীক একজন সামনে, আরেকজন পেছনে, মিলেই সম্পূর্ণ শক্তির প্রতিফলন। প্রতিটি দুর্গা প্রতিমার পেছনে শিবের ছবি থাকা কেবল শিল্পকলার ঐতিহ্য নয়; এর মধ্যে নিহিত আছে পুরাণকথা, দার্শনিক দর্শন, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক প্রতীকীতা। দুর্গা যখন শক্তির প্রতীক, তখন শিব চেতনার প্রতীক। সামনের সারিতে শক্তির প্রকাশ, আর নেপথ্যে চেতনার অবিচল উপস্থিতি। এই দ্বৈত সমন্বয়েই তৈরি হয় পূর্ণতা। তাই দুর্গাপূজার প্রতিমায় শিবের ছবি সবসময় থেকে যায় অদৃশ্য ছায়ার মতো, নীরব আশ্রয়ের মতো। অতএব, প্রতিটি দুর্গা প্রতিমার পেছনে শিবের ছবি থাকে কারণ শক্তি ও শিব অবিচ্ছেদ্য, দেবী পার্বতী ও মহাদেব একে অপরের অর্ধাঙ্গ, আর এই ঐক্য ছাড়া জগতের অস্তিত্বই অসম্পূর্ণ।