19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ওড়িশার শাড়ি শিল্প বৈচিত্র্য

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


ভারতের বস্ত্রশিল্পের ইতিহাসে ওড়িশা এক অনন্য স্থান অধিকার করে রেখেছে। এখানকার শাড়ি শুধু পরিধানের উপকরণ নয়, এক একটি শাড়ি যেন কণ্ঠস্বরে বলা সংস্কৃতির ইতিহাস। ওড়িশার নানা অঞ্চলের নিজস্ব শৈলী, রঙের মায়াজাল, এবং নিখুঁত বুনন কৌশল এই রাজ্যকে ভারতের শাড়ি মানচিত্রে বিশেষ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিটি শাড়ির মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জীবনধারা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রকৃতির নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। চলুন দেখে নেওয়া যাক ওড়িশার শাড়ি শিল্পের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য।


ওড়িশার শাড়ি শিল্পের বৈচিত্র্য: ঐতিহ্য, কারুকার্য এবং সৃজনশীলতার মেলবন্ধন

১. বোমকাই শাড়ি: উপজাতি সংস্কৃতির ছোঁয়া

ভারতের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প হল বোমকাই শাড়ি। ওড়িশার গঞ্জাম জেলার বোমকাই গ্রাম থেকে উৎসুত এই শাড়ি, তার জটিল নকশা, ঐতিহ্যবাহী মোটিফ এবং হাতের বুনন কৌশলের জন্য সমগ্র দেশে বিখ্যাত। উপজাতি জীবনের রূপ-রস এবং প্রকৃতির ছন্দ এখানে সূক্ষ্মভাবে মিশে গেছে। বোমকাই শাড়ির ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের পুরনো। মূলত দানাপানি সম্প্রদায়ের তাঁতিদের হাত ধরে এই শাড়ির সূচনা। প্রথমদিকে শুধু তুলোর (cotton) উপর তৈরি হতো এই শাড়ি, পরে কটকি সিল্ক ও বোমকাই সিল্কের মেলবন্ধন ঘটতে থাকে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব, উপজাতি সংস্কৃতি ও কৃষিজীবন এই তিনের মিশ্রণ বোমকাই শাড়ির মোটিফ ও রঙের বৈচিত্র্যে প্রতিফলিত হয়।

আজকের দিনে বোমকাই শাড়ি শুধুমাত্র গঞ্জাম বা ওড়িশার গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের নানা প্রান্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন প্ল্যাটফর্মেও এর কদর বাড়ছে। ডিজাইনাররা বোমকাই মোটিফ নিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করছেন যেমন কুর্তা, স্কার্ফ, জ্যাকেটেও এর নকশা ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগ, যেমন GI Tag (Geographical Indication) পাওয়ার মাধ্যমে বোমকাই শাড়িকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

২. সম্ভলপুরী শাড়ি: বাঁধা-রঙের জাদু

ভারতের পূর্বাঞ্চলের গর্ব ওড়িশা তার বৈচিত্র্যময় বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এই রাজ্যের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সৃষ্টি হল সম্ভলপুরী শাড়ি। সুদৃশ্য মোটিফ, রঙের নিখুঁত ব্যবহার এবং সূক্ষ্ম হস্তবুননের জন্য সম্ভলপুরী শাড়ি আজ দেশজুড়ে একটি সমাদৃত নাম। প্রাকৃতিক অনুপ্রেরণায় ভরা নকশা আর প্রাচীন বাঁধা-রঙের কৌশল সম্ভলপুরী শাড়িকে এনে দিয়েছে এক অনন্য পরিচিতি। সম্ভলপুর অঞ্চল, পাশাপাশি বরগড়, বলাঙ্গীর, সোনপুর এই এলাকাগুলির তাঁতিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্ভলপুরী শাড়ি বুনে আসছেন। শুধু পরিধানের জন্য নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্যও সম্ভলপুরী বস্ত্রের এক বিশেষ মর্যাদা ছিল। সম্ভলপুরী শাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ইকত (Ikat) বা বাঁধা-রঙ (tie-and-dye) পদ্ধতি, যা এই অঞ্চলের তাঁতিদের এক অনন্য পরিচয় দেয়।

আজ সম্ভলপুরী শাড়ি শুধু ভারতেই নয়, বিদেশেও ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে খ্যাত। বিশেষ করে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা যখন সম্ভলপুরী শাড়ি পরিধান করেন (যেমন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সম্ভলপুরী শাড়ি বিশেষ পছন্দ করতেন), তখন এর জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়। ফ্যাশন ডিজাইনাররা আজ সম্ভলপুরী মোটিফ ব্যবহার করে কুর্তা, স্কার্ফ, জ্যাকেট, এবং গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করছেন, যা এই শিল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরো প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। সম্ভলপুরী শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয়; এটি এক ইতিহাসের বাহক। এটি হাজারো তাঁতির পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও মমতার প্রতীক। প্রতিটি সুতোয় বোনা থাকে প্রকৃতি, বিশ্বাস এবং নান্দনিকতার অপূর্ব সম্মিলন। এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প আমাদের গর্ব, এবং আমাদের কর্তব্য এটিকে রক্ষা করা, সমুন্নত করা এবং বিশ্বের দরবারে এর স্বকীয়তা তুলে ধরা।

৩. পসাপাল্লি শাড়ি: দাবার ছকের নকশা

ওড়িশার সম্ভলপুর অঞ্চলের শিল্পঐতিহ্যের অন্যতম মণিমুক্তা হল পসাপাল্লি শাড়ি। জ্যামিতিক নকশা, সূক্ষ্ম বাঁধা-রঙ (Ikat) কারুকাজ এবং সুপরিকল্পিত রঙের সংমিশ্রণ এই সব মিলিয়ে পসাপাল্লি শাড়ি আজ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় হস্তশিল্প। পসা শব্দের অর্থ দাবার ছক, আর সেই অনুপ্রেরণাতেই তৈরি পসাপাল্লি শাড়ির বুননপদ্ধতি আমাদের নিয়ে যায় এক অনন্য নান্দনিক জগতে। ওড়িশার সম্ভলপুর জেলার পসাপাল্লি গ্রাম থেকে উৎপত্তি এই শাড়ির। সদর থেকে আসা তাঁতিরা প্রাচীন বাঁধা-রঙ কৌশলকে নতুন করে রূপ দিয়েছিলেন, যেখানে সুতোতেই তৈরি হয় নকশা, এবং বুননের পরে তা ফুটে ওঠে এক অভূতপূর্ব রূপে। সাধারণভাবে কৃষিজীবী সমাজের মধ্যেই এই শাড়ির উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটেছিল, যারা প্রকৃতি, ধর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনের অনুপ্রেরণায় মোটিফ তৈরি করতেন।

পসাপাল্লি শাড়ি আজ আর শুধু গ্রামের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। শহুরে ফ্যাশনপ্রেমী মহলেও এর চাহিদা ক্রমবর্ধমান। ডিজাইনাররা এখন পসাপাল্লি মোটিফ ব্যবহার করে বিভিন্ন পোশাক যেমন কুর্তা, ব্লাউজ, স্কার্ফ, ও স্টোল ডিজাইন করছেন। এই শাড়ির অনন্য জ্যামিতিক সৌন্দর্য আধুনিক এবং ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। সরকারি উদ্যোগে পসাপাল্লি শাড়ি আজ GI Tag (Geographical Indication Tag) অর্জন করেছে, যা এর স্বকীয়তা ও গর্ব বহন করে। 

৪. কটপাড় শাড়ি: প্রকৃতির রঙে রাঙানো

ওড়িশার কোরাপুট জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা এক অনন্য ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প হল কটপাড় শাড়ি। প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো, পরিবেশবান্ধব এবং উপজাতি জীবনের রূপ-রস ধারণকারী এই শাড়ি ভারতের হস্তশিল্পের গর্ব। কটপাড় শাড়ি শুধু কাপড় নয়; এটি প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের প্রতি মানুষের ভালোবাসার এক নিদর্শন। কটপাড় শাড়ির জন্ম কোরাপুট জেলার মিরগন সম্প্রদায়ের হাতে। এই উপজাতি জনগোষ্ঠী প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, এবং তাদের জীবনধারাই শাড়ির বুনন ও রঙের মূল অনুপ্রেরণা। প্রকৃতির উপকরণ ব্যবহার করে, যেমন গাছের ছাল, শিকড়, বীজ ইত্যাদি থেকে প্রাকৃতিক রঙ প্রস্তুত করে তাঁতিরা শাড়ির সুতো রাঙাতেন। এই শাড়ি মূলত বিবাহ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিশেষ সামাজিক উপলক্ষে ব্যবহৃত হতো।

আজ কটপাড় শাড়ি শুধু উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নয়, শহুরে ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছেও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনকে সমর্থন করেন, তাঁদের কাছে কটপাড় শাড়ি এক অন্যতম পছন্দ। সরকারি উদ্যোগে কটপাড় শাড়ি GI Tag (Geographical Indication Tag) অর্জন করেছে, যা এই শিল্পের আন্তর্জাতিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। অনেক ডিজাইনার এখন কটপাড় মোটিফ ব্যবহার করে নতুন নতুন পোশাক ও অ্যাকসেসরিজ তৈরি করছেন।

৫. হাবিসপুরী শাড়ি: ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক প্রতিফলন

ওড়িশার কোরাপুট জেলার এক অনন্য ঐতিহ্য বহনকারী শাড়ি হল হাবিসপুরী শাড়ি। উপজাতি সংস্কৃতি, প্রকৃতির অনুপ্রেরণা এবং ধর্মীয় মোটিফের অপূর্ব সমন্বয়ে তৈরি এই শাড়ি ভারতীয় হস্তশিল্পের এক গর্বিত নিদর্শন। হাবিসপুরী শাড়ি শুধু পরিধান নয়, এটি এক নিরব শিল্পকথন যেখানে প্রত্যেক সুতোয় লেখা রয়েছে প্রকৃতি ও বিশ্বাসের গল্প। কোরাপুট জেলার হাবিসপুর অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী মূলত এই শাড়ির স্রষ্টা। প্রাকৃতিক রঙ, স্থানীয় উপকরণ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাবে তাঁতিরা এক অসাধারণ নকশার সৃষ্টি করেন। হাবিস শব্দটির সঙ্গে খাদ্য বা ভক্তিভাবের একটি সম্পর্ক আছে যা নির্দেশ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সাধনা। এই কারণে হাবিসপুরী শাড়িতে ধর্মীয় প্রতীক ও আচার-অনুষ্ঠানের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

বর্তমানে হাবিসপুরী শাড়ি ক্রমেই শহুরে মহলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বহু ডিজাইনার ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিবেশবান্ধব ও উপজাতি-শিল্পকে তুলে ধরার অংশ হিসেবে হাবিসপুরী শাড়ি তাদের কালেকশনে অন্তর্ভুক্ত করছেন। ওড়িশা সরকার এবং কেন্দ্রের হস্তশিল্প মিশন এই শাড়ির সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে হাবিসপুরী শাড়ির জন্য GI Tag (Geographical Indication) আবেদনও করা হয়েছে।

৬. বারপালি ও সোনপুরী শাড়ি: ঐশ্বর্যময় বুননের ছন্দ

ওড়িশার সম্ভলপুর অঞ্চলের বিখ্যাত দুই ধরণের শাড়ি হল বারপালি এবং সোনপুরী শাড়ি। সুচারু হস্তশিল্প, বাঁধা-রঙ (Ikat) কৌশল এবং নিখুঁত কারুকাজের জন্য এই শাড়িগুলি সারা দেশে সমাদৃত। শুধু দৈনন্দিন ব্যবহার নয়, রাজকীয় আভিজাত্য এবং উৎসবের জাঁকজমক প্রকাশে বারপালি ও সোনপুরী শাড়ির জুড়ি মেলা ভার। বারপালি ও সোনপুর অঞ্চল, উভয়ই ওড়িশার পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভলপুর অঞ্চলের অন্তর্গত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দুই অঞ্চলের তাঁতিরা সম্ভলপুরী ইকতের ছায়ায় নিজেদের স্বতন্ত্র স্টাইল ও বৈচিত্র্য গড়ে তুলেছেন। সোনপুরী শাড়িকে মাঝে মাঝে পাসাপাল্লি শাড়ির একটি বিলাসিতার সংস্করণও বলা হয়, যেখানে জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি জরি ও সূক্ষ্ম মোটিফের সূচনাও ঘটে।

বারপালি ও সোনপুরী শাড়ি আজ শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সেলিব্রিটি এবং ডিজাইনাররা এই শাড়ির জ্যামিতিক নকশা এবং সমৃদ্ধ রঙের প্রেমে পড়ে গেছেন। ফিউশন ফ্যাশনে এখন বারপালি ও সোনপুরী মোটিফের কুর্তা, গাউন, স্কার্ফ, ড্রেস মেটেরিয়াল ইত্যাদিতেও ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগ এবং হস্তশিল্প মিশনগুলির মাধ্যমে এই শাড়িগুলি GI Tag অর্জন করেছে, ফলে এর আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও বাজার সম্প্রসারণ ঘটেছে।

এই শাড়িগুলির প্রতিটি সুতোর ফাঁকে লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের গল্প, সংস্কৃতির ছোঁয়া এবং শিল্পীর নিখুঁত সৃষ্টিশীলতা। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা এবং বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। ওড়িশার শাড়ি শিল্প কেবলমাত্র পোশাকের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক গর্বিত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। প্রতিটি শাড়ি এক একটি গল্প বলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, প্রকৃতির রূপ-রস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সৃষ্টিশীলতার অনুপম প্রকাশ। আধুনিক যুগের দ্রুত গতির ফ্যাশন প্রবাহের মাঝেও এই প্রাচীন শাড়িগুলি আজও সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে জীবন্ত থেকে যাচ্ছে, নিজেদের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। আমাদের কর্তব্য, এই বিস্ময়কর হস্তশিল্পের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানিয়ে তার সংরক্ষণ ও প্রসারে সচেষ্ট হওয়া। 

Archive

Most Popular