প্রতিবেদন
সুস্মিতা মিত্র
জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, ভাই বলভদ্র ও দেবী সুভদ্রাকে হাজারো স্রোতে স্নান করানো হয়। এই জন্য, দেবতাদের স্নান মণ্ডপে নিয়ে আসা হয় এবং জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে উপস্থিত কূপের জল দিয়ে স্নান করানো হয়। জলে ফুল, চন্দন, জাফরান ও কস্তুরীও মেশানো হয়। সহস্ত্র ধারা স্নান শেষ হলে ভগবানকে সদা বেশ এর সাজে সাজানো হয়। বিকেলে, হাতিবেশ অর্থাৎ ভগবান গণেশের সাজে সাজানো হয়।
সহস্ত্র ধারায় স্নান করার পরে, ভগবান জগন্নাথ ১৪ দিন ভক্তদের কাছে উপস্থিত হন না। বিশ্বাস করা হয় অতিরিক্ত স্নানের ফলে ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই ১৪ দিন ধরে ঈশ্বরের চিকিৎসা চলতে থাকে, অর্থাৎ আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে মন্দিরের দরজা খোলা হয়, যাকে বলা হয় নেত্র উৎসব। নেত্র উৎসবের পরের দিন অর্থাৎ আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় দিনে জগন্নাথ রথযাত্রা শুরু হয়, যেখানে সারা বিশ্বের মানুষ অংশ নিতে আসে।
মাহাত্ম্য
স্কন্দ পুরাণ অনুসারে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার পরেই প্রথম বার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। স্নানযাত্রার আগের দিন জগন্নাথ, বলভদ্র বা বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহের একটি বিশাল শোভাযাত্রা মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বার করে স্নানবেদীতে এনে রাখা হয়। এছাড়া তাঁদের সঙ্গে থাকে সুদর্শন চক্র। মদনমোহনের ভক্তেরা এই সময় জগন্নাথ দেবকে দর্শন করতে আসেন।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দীর্ঘগরমে ভক্তকূলের মতোই কষ্ট পান জগন্নাথ। সঙ্গে মাথা ধরে। তাই গ্রীষ্মকালে তাঁর কপালে চন্দনের প্রলেপ দেওয়া হয়, যাকে বলে চন্দন উৎসব। বর্ষাগমনের শুরুতেই স্নানযাত্রা। এদিন মনের সুখে প্রতিবছর স্নান করেন তিন ভাইবোন। আর এত স্নান করলে শরীর খারাপ তো হবেই!
এই স্নানের পরেই জ্বরে পড়েন জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রা - এই তিন ভাইবোন। স্নানযাত্রার পর অসুস্থ জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে আলাদা একটি সংরক্ষিত কক্ষে রাখা হয়। রাজবৈদ্য তাঁদের চিকিৎসা করেন। ঈশ্বরের এই অসুস্থতার সময়টি 'অনসর' নামে পরিচিত। এই সময় ভক্তেরা দেবতার দর্শন পান না। সর্দি-জ্বর হলে যেমন রোগীকে কিছুদিনের জন্য আলাদা রাখা হয়। তেমনই স্নান করে জ্বর এলে ১৪ দিনের জন্য আলাদা একটি ঘরে রাখা হয় স্বয়ং দেবতাকেও।
এই কয়েকটি দিন মূল মন্দিরে ভক্তদের দর্শনের জন্য জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহের পরিবর্তে তিনটি পটচিত্র রাখা হয়। এই সময় ব্রহ্মগিরিতে অলরনাথ মন্দিরে যান অনেক ভক্তই। তাঁরা বিশ্বাস করেন, 'অনসর' পর্যায়ে জগন্নাথ 'অলরনাথ' রূপে অবস্থান করেন। কথিত আছে, রাজবৈদ্যের আয়ুর্বৈদিক পাঁচন খেয়ে দিন ১৫-র মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন তাঁরা। সুস্থ হয়ে উঠে এরপর জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রাজবেশে সজ্জিত হয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি যান।
স্নানযাত্রার সময়সূচি
এই বছর শনিবার ২২ জুন ২০২৪ পালিত হবে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার স্নানযাত্রা। পূর্ণিমা তিথি পড়বে ২১ জুন সকাল ৭টা ৩২ মিনিটে এবং তিথির অবসান হবে ২২ জুন সকাল ৬টা ২২ মিনিটে। উদয়া তিথির হিসেবে স্নানযাত্রা পালিত হবে ২২ জুন।