19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

লোখান্ডি-লোহারি, হিমালয়ের বুকে এক অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা..

ভ্রমণ

মধুবন্তী দে


কখনও ভিড়ভাট্টার বাইরে শান্ত কোনও অনাবিষ্কৃত জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে হয়? পাহাড়, তারা ভরা আকাশ, কাঠের ঘরবাড়ি আর সরল মানুষের আতিথেয়তা; সব মিলিয়ে লোখান্ডি ও লোহারি আপনাকে দেবে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সেই মুহূর্তগুলো মনকে পৌঁছে দেয় এক নতুন প্রশান্তিতে।

লিখেছেন: মধুবন্তী দে

কখনও মনে হয়েছে এবার একটু ব্রেক চাই, আমি কোনও জায়গায় চলে যেতে চাই; যা দুনিয়ার চোখে এখনও অনাবিষ্কৃত। পরিচিত দ্রষ্টব্য স্থানের অতিরিক্ত ভিড়ভাট্টা কোনও দিনই আমার মন টানে না, তাই বার বার আনেক্সপ্লোর্ড জায়গায় শান্তির খোঁজে বেরিয়ে পড়তে মন চায়। লোখান্ডি (চক্রাতা) উত্তরাখণ্ডের একটি ক্রম আবিষ্কৃত জায়গা, তারই অন্তর্গত পাহাড়ের কোলে লোহারি একটি শান্তিপূর্ণ গ্রাম। গাঢ় নীল আকাশের নীচে নেমে গেলেই জনসারি জনপদের তৈরি ছোট্ট ছোট্ট কাঠের তৈরি অপূর্ব সুন্দর ঐতিহ্যপূর্ণ ঘরবাড়িগুলো দেখা যায়। লোখান্ডি মূলত পরিচিত ট্রেকিং, হাইকিং, ক্যাম্পিং এবং হিমালয়ের নৈসর্গিক দৃশ্যের জন্য। দেহরাদুন থেকে বাইকে প্রথমে চক্রাতা পৌঁছে একটু ব্রেক নিলাম। সেখানে চা কফি আর হালকা কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম। সন্ধ্যেয় সূর্য ডোবার প্রাক মুহূর্তে পৌঁছলাম লোখান্ডি। পাহাড়ে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এলো। পড়ন্ত বিকেলে পাহাড়ের স্তরে স্তরে পড়ন্ত সূর্যকিরণের স্বপ্নময় রূপটি ক্যামেরাবন্দি করলাম।

এরপর সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম চার পাঁচটার বেশি হোটেল সেখানে নেই আর সেগুলো সব ইতিমধ্যেই ভরে গেছে। কারণ জানুয়ারির সময়টায় এই জায়গাটা বরফে ঢেকে যায়। তাই সবাই ঘুরতে আসে। অগত্যা ওখানকার স্থানীয় লোকেরা আমাদের মতো আরও বেশ কিছু লোক যারা রুম পায়নি তাদের ক্যাম্পিং-এর জন্য ইনসিস্ট করে। কিন্তু আমার ইচ্ছে না থাকায় ওদের মধ্যে থেকে একজন বলে ওঠেন “দিদি আমাদের বাড়িতে থাকবেন? এই কাছেই নিচে ৪ কিমি গেলেই আমাদের ছোট্ট গ্রাম লোহারি।” প্রস্তাবটি শোনার পর আর কিছু ভাবতে চাইনি, রাজি হয়ে গেলাম। ওদের সাথেই আমরা বাইক নিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু রাস্তা ধরে নিচে নেমে লোহারি গ্রামে পৌঁছে গেলাম। চারিদিকে তখন গাঢ় অন্ধকার নেমেছে। আকাশের দিকে হঠাৎ চোখ পড়তেই আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম, এত অসংখ্য তারা! হঠাৎ করেই খালি চোখে বহু বছর পর রাতের আকাশের এই মনোমুগ্ধকর রূপ এবং হালকা হিমেল হাওয়া আমার প্রতিদিনের জীবনের যাবতীয় গ্লানিকে যেন এক লহমায় দূর করে দেয়। কাঠের বাড়িগুলো দোতলা; নিচের ২/৩ টি ছোট্ট ছোট্ট ঘুপচি ঘর সারা বছরের আনাজ, শস্য স্টোর করে রাখার জন্য। উপরের অন্যান্য ঘরগুলি বড়, কাচের সারসি/জানলা দিয়ে বাইরের দূরের ঘরগুলোর টিমটিমে আলো চোখে পড়ে। রান্নাঘরটি সেপারেটেড। সেখানে চুলার ধারে পরিবারের সব বড়রা বসে প্রতিদিনের গল্প করছেন। মহিলারা সবাই মিলে হাতে হাত লাগিয়ে রান্না করছেন। সেদিন ওরা সিড্ডু বানিয়েছিলেন। সিড্ডু প্রধানত হিমাচল প্রদেশের খাবার। তবে এই লোখান্ডি-লোহারি জায়গাটি উত্তরাখণ্ড-হিমাচলের বর্ডার সংলগ্ন হওয়ায় এখানকার মানুষেরাও তাদের বিশেষ আনন্দ অনুষ্ঠানে বা পূজা পার্বণে এই খাবারটি বানিয়ে থাকেন। আমি বিশ্বাস করি; যেখানে যাচ্ছি সেই জায়গাটিকে সমস্ত দিক থেকে এক্সপ্লোর করতে। তাই রান্নার কাজে হাত লাগালাম। সকলের সাথে আলাপ পরিচয় ও সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে রান্না ও খাওয়া পর্ব শেষ হলো। বাইরে তখনও ক্যাম্প ফায়ারের মতো আগুন জ্বলছে; আমাদের বাকি সঙ্গীরা সেখানে বসে শীতের রাতের স্বচ্ছ নক্ষত্রময় আকাশের নিচে নরম উষ্ণতার আঁচ উপভোগ করছে।

খাওয়া দাওয়া সেরে শোবার ঘরে এসে দেখি কোজি সফ্ট বেড ইস রেডি। ঘর কাঠের হওয়ায় প্রকৃতিগতভাবেই উষ্ণ। সারাদিনের ক্লান্তিতে অতিশয় তাড়াতাড়ি ঘুম চলে এল। ভোরবেলা উঠতেই কাছের সারসি দিয়ে ভোরের প্রথম আলো ঘরে এসে পড়ে। সারি বাধা পাইনের বন ও তার নিচে নিচে টুকরো টুকরো বরফ! শালটা জড়িয়ে বাইরে যেতেই প্রকৃতির অপরূপ চিত্র মুগ্ধ করে। আকাশ চূড়ান্ত নীল। ওদিকে উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখি ওরা পাহাড়ি নমক বানানোর উপকরণ সাজিয়ে রাখছে। একটা কাঠের বড় গামলা আর বড় হামানদিস্তা। নানা রকম পাহাড়ি জড়িবুটি ও মশলা দিয়ে তৈরি হবে এই লবণ। আমিও হাত লাগালাম। খেয়াল করলাম, যুবতী মহিলারাও কেউ কেউ নিচে ক্ষেতের কাজ করতে ছাউনিতে চলে যাচ্ছেন পিঠে খাবারের পুঁটলি বেঁধে। আমি সকালের রুটিন মাফিক সূর্যনমস্কার ও অন্যান্য যোগাভ্যাস করে নিই, ঘরের ছোট বাচ্চারা সেটা এনজয় করে ও ভাগ নেয়। রাতেই কথা পাকা হয়ে গিয়েছিল, ওদের আমায় ভীষণ পছন্দ হওয়ায় ওদের ঐতিহ্যবাহী জনসারি পোশাক ও গয়না পরিয়ে দেয়। ঘাগড়া, লম্বা ব্লাউজ, ওপরে হাফ কোট আর মাথায় রুমাল। পাহাড়ি গয়নার ডিজাইনেও একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম মইলা টপ-এর উদ্দেশ্যে। আসার সময় ওদের পরিবারের পক্ষ থেকে পাহাড়ি নমক, মশলা ও কিছু ফল উপহার হিসেবে পেয়ে যার পর নাই খুশি হলাম।

এরপর বরফের মধ্যে দিয়ে ৬ কিমির ট্রেক শুরু হলো। কিছু দূর গিয়ে পাইনের ঘন বন শুরু হলো। জঙ্গলের মধ্যে ২.৫ কিমি চড়াই উতরাই পেরিয়ে পৌঁছতে হবে মইলা টপ-এর প্রধান ভিউ পয়েন্টে। সেখানে আছে ঐতিহাসিক শিব মন্দির। কথিত আছে এই মন্দির পাণ্ডবদের দ্বারা নির্মিত। ট্রেকিং পথে সেই মন্দিরের পুরোহিতের সাথে পরিচয় হয়ে যাওয়ায় তিনি আমাদের তুলনামূলক শর্টকাট ট্রেইল ধরে নিয়ে গেলেন ও ওই মন্দির সম্বন্ধীয় আরও তথ্য দিলেন। টপ-এ পৌঁছে চোখের সামনেই বরফে সুসজ্জিত হিমালয়ের প্যানোরমিক স্তরভিত্তিক দৃশ্য আর চারপাশে শ্বেতশুভ্র বরফ দেখে ট্রেকিং পথের যাবতীয় শারীরিক ক্লেশ কষ্ট দূর হলো। ছিমছাম আড়ম্বরহীন গ্রাম্য এই মন্দিরটি যথার্থই ধ্যান উপযোগী; তথা মনের শান্তি আনে। মন্দির দর্শন করে আর বরফের মাঝে যেখানে সবুজ ঘন ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ জমি, সেখানে সবাই বিশ্রাম করলাম। একটু ধ্যান আর প্রকৃতির অপরিমেয় শোভা প্রাণ ভরে দেখে নিলাম। তারপর সেখানকার ছোট গুহা আর ছোট ঝিল ঘুরে ট্রেইল ধরে ফিরে এলাম লোখান্ডি, সেখান থেকে চক্রাতা হয়ে টানটান দেহরাদুন।

দেহরাদুন থেকে লোখান্ডি – ১০৮ কিমি।

বাইক/গাড়িতে যেতে সময় লাগে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে সস্তা ও রিজনেবল প্রাইসে যাওয়া যায়; সেক্ষেত্রে বুলেরো/জীপ গাড়ি/বাস অ্যাভেলেবল (দেহরাদুন–লোখান্ডি)।

ট্রেকিং ক্যাম্পিং সারা বছর অ্যাভেলেবল।

ডিসেম্বর-জানুয়ারি বাদে সারা বছরই হোটেল অ্যাভেলেবল। তবে গ্রামের অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন +91 75057 67168 (চৌহান জী)।

Archive

Most Popular