19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

উপোসের ভালো-মন্দ..

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


উপোস একটি শব্দ, যা আমাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং স্বাস্থ্যচেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপবাস শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ঈশ্বরের সান্নিধ্যে থাকা (সংস্কৃতে উপ মানে কাছাকাছি, বাস মানে বাস করা)। ভারতীয় সংস্কৃতিতে উপোস শুধুমাত্র খাবার না খাওয়া নয় এটি আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, এবং আত্মিক অনুশীলনের এক রূপ। কিন্তু আধুনিক জীবনে এই উপোস কতটা প্রাসঙ্গিক? উপোস কি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নাকি এতে বাস্তব উপকারও আছে? উপোস কি শরীরের জন্য ভালো, না কি ক্ষতিকরও হতে পারে? এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা উপোসের ভালো-মন্দ দুটি দিকই বিচার করব ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।


উপোসের ভালো দিক

উপোসের মূল উদ্দেশ্য হলো মনকে পরিশুদ্ধ করা, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ঈশ্বরচিন্তায় নিবিষ্ট থাকা। উপোসের দিন মানুষ নিজেকে সংযত রাখে নানা ধরনের লোভ, ক্ষোভ, কামনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান ধর্মেও উপোস বা উপবাসের গুরুত্ব আছে। যেমন রামনবমী, শিবরাত্রি, একাদশী, করবা চৌথ, সব ধর্মেই উপোস মানে নিজেকে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করার একটি উপায়।

প্রতিদিনের খাওয়া-দাওয়া হজম প্রক্রিয়াকে একটানা ব্যস্ত রাখে। উপোস করলে অন্ত্র ও পাচনতন্ত্র কিছুটা বিশ্রাম পায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য ও অ্যাসিডিটির সমস্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। উপোস করলে শরীর প্রথমে গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে, তারপর শরীর চর্বি ভাঙা শুরু করে। এভাবে নিয়মিত উপোস করলে ফ্যাট কমে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটিকে বলা হয় কিটোসিস বা fat-burning state। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর উপোস করলে রক্তে ইনসুলিন হরমোন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা কমে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে। নোবেলজয়ী গবেষক ড. ইয়োশিনোরি ওসুমি প্রমাণ করেছেন উপোসে শরীর নিজেই কোষের অপ্রয়োজনীয় অংশ গলিয়ে দেয় (autophagy)। ফলে শরীর নিজেকে সুস্থ রাখতে পারে, বার্ধক্য বিলম্বিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপোস করলে কোলেস্টেরল কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পায়। অটোফ্যাজির মাধ্যমে কিছু ক্ষতিকর কোষ ধ্বংস হওয়ায় ক্যান্সারের ঝুঁকিও কিছুটা কমে।

উপোস মানুষকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাগ সবকিছুর উপর নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হতে পারে। উপোসের সময় কম খাওয়ায়, কম কাজ করায় ও কম কথা বলায় মন শান্ত হয়। অনেকেই বলেন, উপোসের সময় তাদের চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হয় এবং মনঃসংযোগ বাড়ে, অধিকাংশ মানুষ উপোসের সময় গন্ধ, স্বাদ, শব্দ ইত্যাদি তীব্রভাবে অনুভব করেন। এটি ইন্দ্রিয়কে জাগ্রত রাখতে সাহায্য করে। করবা চৌথ, একাদশী, সাবিত্রী ব্রত এইসব উপোস ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি পরিবারের, সমাজের মধ্যে একতা গড়ে তোলে। একই দিনে সবাই উপোস করে, একসঙ্গে ইফতার বা উপোসভঙ্গ করে। উপোসের জন্য মানুষ সচেতন হয় তাদের খাওয়া-দাওয়া ও শরীরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে। এটি এক প্রকার স্বাস্থ্যশিক্ষা হিসেবেও কাজ করে।


উপোসের মন্দ দিক ও সতর্কতা


১. শারীরিক কষ্ট ও দুর্বলতা

বিশেষত ডায়াবেটিক, হৃদরোগী বা কম রক্তচাপের রোগীদের জন্য উপোস বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক সময় রক্তে শর্করা বা সোডিয়ামের মাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে মাথা ঘোরা, বমি, অজ্ঞান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিনা খাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাটালে পেট খালি থাকায় পেটের অ্যাসিড বাড়ে, যা গ্যাস্ট্রিক, আলসার ও বুকজ্বালার কারণ হতে পারে।


২. মানসিক অস্থিরতা

কিছু মানুষ উপোসে চঞ্চলতা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, একাগ্রতা হারিয়ে ফেলা, মাথাব্যথার মতো সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে যারা চা-কফিতে অভ্যস্ত। অনেক সময় মানুষ ধর্মীয় উপোসে না খেয়ে থাকলেও খাবারের চিন্তায় একধরনের “emotional hunger” তৈরি হয়, যা উপোসের আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।


৩. অপব্যবহার ও প্রতিযোগিতা

অনেকেই উপোসকে একটি প্রদর্শনের বস্তু বানিয়ে ফেলেন কে কতক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারল, কে কত কঠোর ব্রত পালন করল ইত্যাদি। অনেক পরিবারে বা সমাজে নারীদের ওপর উপোস চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা তার স্বাস্থ্য ও মনোস্তত্ত্বের উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।


৪. অতিরিক্ত উপোসের স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • দীর্ঘ সময় ধরে উপোস করলে প্রোটিন ও খনিজের অভাব দেখা দিতে পারে।

  • মাসিক বন্ধ হওয়া, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, হাড় দুর্বল হওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।

  • শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণদের ক্ষেত্রে উপোস বিপজ্জনকও হতে পারে।


সতর্কতা ও সুস্থ উপোসের কৌশল

যাদের ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার বা হৃদরোগ আছে তারা উপোসের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।পর্যাপ্ত জল ও তরল খেলে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয় না।

উপোস ভাঙার সময় হালকা, সহজ পাচ্য খাবার খাওয়া উচিত যেমন ফল, ছানা, দই, খিচুড়ি।

উপোসের দিন সঠিক পরিকল্পনায় পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম রাখা দরকার।

উপোস মানেই শুধুই খাবার ত্যাগ নয়। এটি একধরনের শৃঙ্খলা, এক ধরণের অন্তর্জগতে প্রবেশ, নিজেকে নতুন করে চিনে নেওয়ার সুযোগ। কেউ যদি উপোস করেন তবে সেটি যেন দেহ ও মনের সুস্থতার জন্যই হয়। উপোস একদিকে যেমন প্রাচীন সংস্কৃতির অমূল্য ধন, তেমনই এটি আধুনিক বিজ্ঞানেও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। কিন্তু উপোস করতে গেলে চাই সঠিক জ্ঞান, প্রস্তুতি, এবং আত্মসচেতনতা। ধর্ম, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত উপলব্ধির মধ্যে সেতুবন্ধন করেই হতে পারে এক সুন্দর, নিরাপদ ও উপকারী উপোস। স্মরণে রাখা জরুরি, উপোসের আসল উদ্দেশ্য হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, এবং অন্তরের শুদ্ধতা অর্জন সেই উদ্দেশ্য পূরণ করলেই উপোস সত্যিকার অর্থে সফল হয়।

Archive

Most Popular