স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
২১শ শতকে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় করেছে। ই-কমার্স, ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন শিক্ষা, আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট নির্ভরতা বাড়ছে। তবে এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে বেড়েছে সাইবার অপরাধ ও হ্যাকিং। তথ্য ফাঁস, ডেটা চুরি, র্যানসমওয়্যার, ফিশিং এসব আক্রমণ প্রতিদিন নতুন রূপ নিচ্ছে।
এমন এক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence- AI) সামনে এনেছে নতুন দিগন্ত। একদিকে AI সাইবার নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে, অন্যদিকে অপরাধীরাও এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে আরও জটিল আক্রমণ চালানোর জন্য। ফলে আজকের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার যুগল যাত্রা সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন প্রযুক্তি যা মানুষের মতো চিন্তা, শেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। এর মধ্যে মেশিন লার্নিং (ML), ডীপ লার্নিং (DL), ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP), কম্পিউটার ভিশন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এই প্রযুক্তি বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ডেটাবেসে আক্রমণ ঘটলে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হতে পারে। যেমন
২০১৭ সালের WannaCry ransomware attack-এ ১৫০টি দেশে প্রায় ২ লক্ষ কম্পিউটার আক্রান্ত হয়।
২০১৮ সালে ভারতের আধার তথ্যভাণ্ডার হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটা ফাঁসের খবর প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রচলিত ফায়ারওয়াল বা অ্যান্টিভাইরাস যথেষ্ট নয়। দরকার বুদ্ধিমান, অভিযোজনশীল সিস্টেম—যেখানে AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।
অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ (Anomaly Detection):
AI-চালিত সিস্টেম রিয়েল-টাইমে নেটওয়ার্ক ট্রাফিক বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও ব্যবহারকারী হঠাৎ অস্বাভাবিক সময়ে বিপুল ডেটা ডাউনলোড করলে AI সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা দিতে পারে।
ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ (Predictive Analysis):
মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম পূর্বের আক্রমণের ডেটা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হুমকি অনুমান করতে পারে। ফলে আক্রমণ ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা:
AI সিস্টেম হুমকি শনাক্ত করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপও নিতে পারে যেমন কোনও আইপি অ্যাড্রেস ব্লক করা বা সন্দেহজনক ফাইল কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো।
ফিশিং প্রতিরোধ:
ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ব্যবহার করে AI ই-মেইল বা বার্তার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ফিশিং প্রচেষ্টা চিহ্নিত করতে পারে।
বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা:
মুখাবয়ব চিনতে পারা, আঙুলের ছাপ বা ভয়েস রিকগনিশন এসবই AI-এর সাহায্যে উন্নত হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাইকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলছে।
যেভাবে AI সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করছে, ঠিক তেমনি অপরাধীরাও AI ব্যবহার করছে উন্নত আক্রমণে।
ডীপফেক প্রযুক্তি: AI-চালিত ভিডিও বা অডিও জালিয়াতি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার বড় হুমকি।
অটোমেটেড হ্যাকিং: AI ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসওয়ার্ড ভাঙা, নেটওয়ার্ক স্ক্যান করা ও ম্যালওয়্যার ছড়ানো সম্ভব।
অ্যাডভার্সারিয়াল আক্রমণ: হ্যাকাররা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ডেটা ব্যবহার করতে পারে যাতে AI মডেল বিভ্রান্ত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজিটাল বাজার। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েকশো কোটির কাছাকাছি। ফলে ভারত সাইবার আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু।
CERT-In (Indian Computer Emergency Response Team) জানিয়েছে, ২০২২ সালে ভারতে প্রায় ১৩ লাখ সাইবার আক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
ভারতীয় ব্যাংক ও পেমেন্ট গেটওয়েগুলো প্রায়শই ফিশিং ও ডেটা ব্রিচের শিকার হচ্ছে।
ভারত সরকার ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি পলিসি ও বিভিন্ন AI-চালিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে দক্ষ জনবল, উন্নত প্রযুক্তি ও আইনগত কাঠামো আরও জোরদার করা জরুরি।
১. AI-সক্ষম SOC (Security Operations Center): ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কেন্দ্রগুলো AI দ্বারা চালিত হবে, যা ২৪/৭ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হুমকি চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করবে।
২. গ্লোবাল সহযোগিতা: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডেটা শেয়ারিং ও যৌথ AI নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি।
৩. নৈতিক AI ব্যবহার: সাইবার নিরাপত্তায় AI ব্যবহারের পাশাপাশি তার নৈতিক দিকও গুরুত্ব পাবে—যাতে এটি গণতান্ত্রিক অধিকার ও গোপনীয়তার ক্ষতি না করে।
৪. কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও AI: ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সঙ্গে AI যুক্ত হলে এনক্রিপশন ভাঙা যেমন সহজ হবে, তেমনি আরও শক্তিশালী সুরক্ষাও তৈরি করা সম্ভব হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ সাইবার নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার। এটি দ্রুত হুমকি শনাক্ত, আক্রমণ প্রতিরোধ এবং ঝুঁকি পূর্বাভাসে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে। তবে একইসঙ্গে AI নতুন ধরনের হুমকিও তৈরি করছে ডীপফেক, অ্যাডভার্সারিয়াল আক্রমণ, স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিং ইত্যাদি।
তাই ভবিষ্যতের নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়তে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, উন্নত গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং AI-এর নৈতিক ব্যবহার। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু প্রযুক্তির উন্নতি নয়, বরং মানবসমাজের জন্য একটি নিরাপদ সাইবার জগত গড়ে তুলতে পারে।