19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সবুজের মাঝে কুয়াশায় ঘেরা শীতের জঙ্গলমহল..

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


ডিসেম্বরের সকাল। সূর্যের আলো তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। চারদিক ঘিরে আছে ঘন কুয়াশা। দূরে কোথাও একটা মোরগ ডেকে উঠছে, আর কাছেই শোনা যাচ্ছে বাঁশঝাড়ের পাতায় হালকা ঝিরঝির আওয়াজ। মাটির গন্ধে, কুয়াশার ভেজা সোঁদা সুবাসে, আর নিস্তব্ধতার মায়াবী ছোঁয়ায় জেগে উঠছে জঙ্গলমহল—পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সেই অরণ্যভূমি, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের শীতকালীন পোশাক পরে বসে থাকে। এই জঙ্গলমহল কেবল ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি এক রূপকথার পৃথিবী, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে অনন্য সুরে। শীতের এই সময়ে সবুজের বুক চিরে যখন কুয়াশা নামে, তখন জঙ্গলমহল হয়ে ওঠে এক রহস্যময় সৌন্দর্যের রাজ্য।


জঙ্গলমহল বলতে মূলত পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলার পাহাড়ি, অরণ্যময় অঞ্চলকে বোঝানো হয়। একসময় এই অঞ্চলকে বলা হতো “জঙ্গলতরাই”—চুয়া নদী, কংসাবতী, সুবর্ণরেখা, দারকেশ্বর ও শিলাবতীর তীরে বিস্তৃত এই বনাঞ্চল ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য উপজাতি ও গ্রামীণ সমাজ। ইতিহাস বলছে, মল্লভূমের রাজারা যখন বিষ্ণুপুরে তাঁদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তখন এই জঙ্গলমহলই ছিল তাঁদের সীমান্ত অঞ্চল। তাই আজও এখানে ছড়িয়ে আছে টেরাকোটা মন্দির, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, ও লোকসংস্কৃতির নানা নিদর্শন।


শীতকাল জঙ্গলমহলের সবচেয়ে সুন্দর ঋতু। গ্রীষ্মের রুক্ষ লাল মাটি তখন নরম হয়ে যায় শিশিরে ভিজে, আর কুয়াশার পর্দায় ঢাকা পড়ে যায় দূরের পাহাড় ও শাল-সেগুনের বনের মাথা। সকালবেলায় সূর্যের আলো যখন কুয়াশার ভেতর দিয়ে ছিদ্র করে ঢোকে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন এক জাদুকরী দৃশ্য এঁকেছে সোনালি তুলির আঁচড়ে। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝুলে থাকা কুয়াশা, ক্ষেতের ওপর জমে থাকা শিশির, দূরে পাথরের পাহাড়ের গা ঘেঁষে গরুর পাল, আর মাটির বাড়ির চুলোর ধোঁয়া—সব মিলে যেন এক রূপকথার ক্যানভাস। শীতের সকালে জঙ্গলমহলের নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। প্রথমে শোনা যায় বাঁশপাতার ফিসফিস, তারপর চুপচাপ ভেসে আসে গরুর ঘণ্টার শব্দ। গ্রামের বউরা তখন কাঁধে পানির কলস নিয়ে কুয়োয় যাচ্ছে, বাচ্চারা খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে শিশিরভেজা পথে। একটু দূরে দেখা যায়—গোড়ালি পর্যন্ত লুঙ্গি গুটিয়ে একজন মেঠো কৃষক মাঠে নেমে গেছেন। মাটি তখন ঠান্ডা, কিন্তু তার মনে কাজের উষ্ণতা। জঙ্গলমহলের মানুষ জানে, শীতকালই তাদের ফসল তোলার, আনন্দের, আর উৎসবের সময়। এই অঞ্চলে শীতের সময় ধান কাটার মৌসুম। ক্ষেতের ধান গাছগুলো সোনালি রঙে ঝলমল করে, যেন প্রতিটি গাছ সূর্যের আলো নিজের শরীরে বেঁধে ফেলেছে। ধান কাটা শেষ হলে শুরু হয় “নবান্ন” উৎসব। নতুন ধানের ভাত, পিঠে, চিঁড়ে, মুড়ি—এইসব দিয়ে গ্রামজুড়ে চলে আনন্দ-উৎসব। মেয়েরা পরেন লাল পাড় সাদা শাড়ি, ছেলেরা ঢাক বাজায়, আর সন্ধ্যাবেলায় আগুন জ্বেলে শুরু হয় নাচগান। “ঝুমুর” আর “ছৌ নৃত্য” এই অঞ্চলের প্রাণ। ঢোল, কাঁসা, মাদল, বাঁশির তালে তালে নাচে পুরুষ আর নারী—তাদের শরীরের তালে যেন জেগে ওঠে জঙ্গলমহলের আত্মা।


জঙ্গলমহল মানেই শাল, সেগুন, পলাশ, সোনাঝুরি আর মহুয়া গাছের রাজত্ব। শীতের সকালে এসব গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু সূর্যের আলোয় ঝলমল করে ওঠে। এখানে হাতি, হরিণ, শিয়াল, খরগোশ, বুনো শূকর, এমনকি পাখিদের অগণিত প্রজাতি দেখা যায়—রূপসা নদীর ধারে বসে থাকা মাছরাঙা, কিংবা বনের ভিতরে শালিকের ডাক, সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ জীবনের চক্র চলছে নিজের ছন্দে। শীতকালে এখানে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে। কংসাবতীর জলাধার, মুকুটমনিপুর বাঁধ, কিংবা করমদা নদীর ধারে দেখা যায় রাজহাঁস, বক, গাঙ্গচিলের দল। সকালের কুয়াশায় যখন তারা উড়ে যায়, তখন মনে হয় যেন আকাশের বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সাদা ডানার symphony।


জঙ্গলমহলের আত্মা আসলে এখানকার মানুষ। সাঁওতাল, মুন্ডা, ভিল, শবর, কোল, ভূমিজ—এই সব উপজাতির মানুষ মিলেমিশে গড়ে তুলেছে এই অঞ্চলের বিশেষ সংস্কৃতি। শীতকাল তাদের জন্য উৎসবের সময়—মাহারাম, মাগে পরব, তুসু-পারব, ভিজা-পরব ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান হয় এই সময়ে।গ্রামগুলো তখন রঙে-গানে ভরে ওঠে। মাঠে-বনে শোনা যায় তুসু গানের তান.. এই গানের তালে মেয়েরা ঘুঙুর পরে নাচে, ছেলেরা মাদল বাজায়, আর আগুন জ্বেলে সারারাত জেগে থাকে গ্রাম। এ যেন এক আত্মিক মিলন—মানুষ, প্রকৃতি আর উৎসবের। সূর্য ঢলে পড়লেই জঙ্গলমহলে নামে এক অন্য রূপ। আকাশ তখন মেঘহীন, তারায় ভরা। মাটির বাড়ির উঠোনে জ্বলে ওঠে আগুনের আলোকবৃত্ত। তার চারপাশে বসে বয়স্করা গল্প বলেন—বনের আত্মা, শিকারি, বা মল্লরাজাদের কাহিনি। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পাহাড়ের কোলে এই আগুনের আলো যেন জীবনের উষ্ণতা। শিশুরা মাটিতে শুয়ে আকাশের তারা গোনে, নারীরা মহুয়া ফুল শুকিয়ে রাখেন, পুরুষরা আগুনের ধারে হাত সেঁকেন। এটাই জঙ্গলমহলের শীত—নির্লিপ্ত অথচ গভীর, শান্ত অথচ প্রাণবন্ত।


আজকের দিনে জঙ্গলমহল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। মুকুটমনিপুর, বিষ্ণুপুর, আযোধ্যা পাহাড়, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি, গরপঞ্চকোট, বেলপাহাড়ি, লালজল পাহাড়—প্রতিটি স্থানেই মেলে প্রকৃতির অন্যরকম রূপ। শীতকালে পর্যটকরা আসেন এই অঞ্চল দেখতে, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এখানকার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সকালবেলার কুয়াশায় আর সন্ধ্যার ধোঁয়ায়। গ্রামের পথ ধরে হাঁটলে দেখা যায়, সাইকেল চেপে স্কুলে যাচ্ছে বাচ্চারা, ক্ষেতের ধার দিয়ে চলছে বলদগাড়ি, আর গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে উঠছে—এক অদ্ভুত প্রশান্তি মিশে থাকে এই দৃশ্যে. শীত মানেই ভোজনরসিকদের উৎসব। জঙ্গলমহলের খাবারেও আছে বিশেষ স্বাদ। এখানকার লোকেরা খায়—মহুয়া ফুল দিয়ে পিঠে, নাড়ু, ধানভাজা, কচি বাঁশের ঝোল, বুনো আলু, মহুয়া মদ, ও ভাজা মাছ। শীতের রাতে আগুনের পাশে বসে গরম গরম নবান্নের পিঠে আর মদে চুমুক—এ এক অদ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। এই খাবার শুধু রসনাতৃপ্তি নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতিফলন—যা তারা নিজের পরিশ্রম, ফসল ও ঋতুর দান থেকে তৈরি করে


আজকের দিনে জঙ্গলমহলের বনভূমি ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে—বনচ্ছেদন, খনন, ও অবৈধ কাঠ কাটা এর প্রধান কারণ। অনেক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, প্রাণীরা হারাচ্ছে তাদের বাসস্থান। কিন্তু এখানকার মানুষ ও সরকার একত্রে এগিয়ে আসছে এই পরিবেশ রক্ষায়। Joint Forest Management প্রকল্প, বনবন্ধু কর্মসূচি—সবই বনকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। প্রকৃতি ও মানুষ এখানে একে অপরের নির্ভরশীল। তাই কুয়াশা যখন নামে শীতের সকালে, তখন সেই কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে থাকে এক অমোঘ বার্তা—প্রকৃতি আমাদের মা, তাকে বাঁচানোই বেঁচে থাকার শর্ত।


জঙ্গলমহলের শীতের দুপুরে সূর্যের আলো নরম। গ্রামের উঠোনে শুকোতে থাকে ধান, পিঠের মিশ্রণ, বা মহুয়া ফুল। বৃদ্ধরা গামছা মুড়িয়ে রোদ পোহান। দুপুরের এই নরম আলোতে পাহাড়ের গায়ে ধুলো মিশে এক অদ্ভুত সোনালি ঝলক দেয়। বিকেলে কুয়াশা আবার নামতে শুরু করে। সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখন গাছের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদ আর কুয়াশার মিশ্র আলোয় জঙ্গলমহল হয়ে ওঠে রূপকথার রাজ্য। এই সৌন্দর্য শব্দে নয়—চোখে, মনে, আর নিঃশ্বাসে অনুভব করতে হয়। শীতের রাতে চাঁদের আলোয় যখন পুরো বন ঝলমল করে, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেছে। দূরে কোথাও পেঁচার ডাক, কখনও শিয়ালের সুর, আর মাঝে মাঝে বাতাসে দুলে ওঠা পাতার মৃদু আওয়াজ—এই নিস্তব্ধতাই জঙ্গলমহলের রাত্রির সঙ্গীত। যে কেউ একবার এই রাত্রি উপভোগ করলে ভুলতে পারবেন না। এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক গভীর অভিজ্ঞতা—শান্ত, পবিত্র, অথচ গভীরভাবে জীবন্ত। জঙ্গলমহল বহু সাহিত্যিক ও শিল্পীর অনুপ্রেরণার উৎস। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জলসাঘর, বিভূতিভূষণের আরণ্যক, বা মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার—সবখানেই দেখা যায় এই অরণ্যের মানুষ, তাদের লড়াই, এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। শীতের কুয়াশার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেদনা, নিস্তব্ধতা, আর অজানা সৌন্দর্য—সবই এই সাহিত্যধারার গভীরে প্রবাহিত। আজকের চিত্রশিল্পী ও আলোকচিত্রীদের কাছেও জঙ্গলমহল এক অপরিসীম প্রেরণার উৎস—সবুজের বুকের ওপর সাদা কুয়াশার ক্যানভাসে তারা খুঁজে পান প্রকৃত জীবনের রঙ। সবুজের মাঝে কুয়াশায় ঘেরা শীতের জঙ্গলমহল আসলে এক অনন্ত কবিতা—যেখানে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি পাখি, প্রতিটি গ্রাম তার নিজস্ব সুরে কথা বলে। এখানকার কুয়াশা শুধু প্রকৃতির সাজ নয়, এটি জীবনের রূপক—যেমন কুয়াশা সব কিছু আড়াল করেও সৌন্দর্যকে আরও রহস্যময় করে তোলে, তেমনি জঙ্গলমহলের জীবনও কষ্টের ভিতরে লুকিয়ে রাখে আনন্দ, সংগ্রাম ও আশা।

যে কেউ একবার এই ভূমির শীতের সকাল দেখেছেন, তিনি জানেন

প্রকৃতির এই নীরবতা কখনও নিস্তব্ধ নয়, বরং সেটিই জীবনের আসল সুর।

সবুজের বুকের উপর কুয়াশার এই চাদর, আগুনের উষ্ণতা, মানুষ আর প্রকৃতির সহাবস্থান সব মিলিয়ে জঙ্গলমহল শীতের ঋতুতে হয়ে ওঠে এক জীবন্ত কবিতা, এক অবিনাশী সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি।

Archive

Most Popular