19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ত্বক ও চুলের ডিটক্স ড্রিঙ্ক!

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


আমাদের শরীর প্রতিদিন নানা ধরনের টক্সিন, দূষণ, রাসায়নিক পদার্থ, ফাস্ট ফুড, স্ট্রেস এবং ঘুমের অভাবের কারণে ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারাতে থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ত্বক ও চুলে চেহারার উজ্জ্বলতা কমে যায়, ব্রণ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়, চুল ভাঙে, ঝরে পড়ে, উজ্জ্বলতা হারায়। এই সমস্ত সমস্যার মূল কারণ হলো শরীরের ভিতরে জমে থাকা টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ। এই টক্সিন দূর করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো ডিটক্স ড্রিঙ্ক বা শরীর পরিশোধক পানীয়। ত্বক ও চুলের ডিটক্স ড্রিঙ্ক শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং শরীরের ভেতরের কার্যপ্রণালিকেও পুনরুজ্জীবিত করে। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কীভাবে এই ডিটক্স ড্রিঙ্ক কাজ করে, কোন উপাদানগুলো সবচেয়ে কার্যকর, এবং কীভাবে ঘরোয়া উপায়ে এই পানীয় তৈরি করা যায়।


ডিটক্স ড্রিঙ্ক কী এবং কেন প্রয়োজন?

ডিটক্স ড্রিঙ্ক মূলত প্রাকৃতিক উপাদান (যেমন ফল, সবজি, ভেষজ, মশলা ইত্যাদি) দিয়ে তৈরি এমন পানীয় যা শরীরের ভিতরে জমে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়। এগুলো লিভার, কিডনি, স্কিন সেল এবং হেয়ার ফোলিকলকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।

ত্বক ও চুলের সৌন্দর্যের জন্য ডিটক্স ড্রিঙ্ক কেন প্রয়োজন, তার কয়েকটি কারণ নিচে দেওয়া হলোঃ

  1. রক্ত পরিশোধন: ডিটক্স ড্রিঙ্ক রক্তের অশুদ্ধি দূর করে, ফলে ত্বক উজ্জ্বল হয় এবং ব্রণ কমে।

  2. লিভার ও কিডনি সাপোর্ট: এই অঙ্গ দুটি শরীর থেকে টক্সিন ছেঁকে বের করে দেয়। ডিটক্স ড্রিঙ্ক তাদের কাজকে আরও সহজ করে।

  3. হাইড্রেশন: পর্যাপ্ত জল সরবরাহ করে, যা ত্বকের আর্দ্রতা ও চুলের উজ্জ্বলতা বজায় রাখে।

  4. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ: ফ্রি র‍্যাডিক্যালের ক্ষতি রোধ করে, বার্ধক্য কমায়।

  5. হরমোন ব্যালান্স: বিশেষ কিছু ডিটক্স উপাদান হরমোন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যার ফলে চুল পড়া ও অ্যাকনে কমে।


ত্বক ও চুলের জন্য কার্যকর ডিটক্স উপাদান

১. লেবু (Lemon)

লেবুর রস ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে শরীর থেকে টক্সিন দূর করে এবং কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বক টানটান রাখে।

২. শসা (Cucumber)

শসার ৯৬% জল, যা ত্বক ও চুলকে হাইড্রেট রাখে। এটি ঠান্ডা প্রভাব ফেলে ও ডার্ক সার্কেল বা ইনফ্ল্যামেশন কমায়।

৩. আদা (Ginger)

আদা রক্ত চলাচল বাড়ায়, হজম উন্নত করে এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা জিঞ্জারল চুলের গোঁড়া মজবুত করে।

৪. পুদিনা (Mint)

পুদিনা শরীর ঠান্ডা রাখে, হজমে সাহায্য করে এবং স্কিনের প্রদাহ কমায়। তাছাড়া এর ঘ্রাণ মানসিক সতেজতাও আনে।

৫. গ্রিন টি (Green Tea)

গ্রিন টিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল ও ক্যাটেচিন থাকে যা ফ্রি র‍্যাডিক্যাল ধ্বংস করে এবং ত্বককে বার্ধক্য থেকে রক্ষা করে।

৬. বীটরুট (Beetroot)

বীটরুট লিভার ক্লিনজিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। এতে থাকা বিটালেইন রক্ত পরিষ্কার করে ও ত্বকে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আনে।

৭. অ্যালোভেরা (Aloe Vera)

অ্যালোভেরা জুস ভেতর থেকে হাইড্রেট করে, চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং ত্বক নরম রাখে। এতে থাকা এনজাইম চুলের খুশকি কমায়।

৮. তুলসি (Holy Basil)

তুলসি শরীরের টক্সিন দূর করে, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাল সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। এটি স্ক্যাল্পে রক্তসঞ্চালন বাড়ায়।


ঘরোয়া ত্বক ও চুলের ডিটক্স ড্রিঙ্ক রেসিপি

লেবু-আদা-পুদিনা ডিটক্স ড্রিঙ্ক

উপকরণ:

  • ১টি লেবুর রস

  • ১ ইঞ্চি আদা (গ্রেট করা)

  • কয়েকটি পুদিনা পাতা

  • ১ লিটার জল

পদ্ধতি:
সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে রাতে ফ্রিজে রেখে দিন। সকালে খালি পেটে এক গ্লাস করে খান। এটি লিভারকে সক্রিয় করে, চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং মুখে প্রাকৃতিক গ্লো আনে।


শসা-লেবু-অ্যালোভেরা ড্রিঙ্ক

উপকরণ:

  • ১/২ শসা টুকরো করা

  • ১ চা চামচ অ্যালোভেরা জেল

  • ১ চা চামচ লেবুর রস

  • ঠান্ডা জল ১ গ্লাস

পদ্ধতি:
সব একসঙ্গে ব্লেন্ড করে ছেঁকে নিন। প্রতিদিন সকালে খেলে শরীর ঠান্ডা থাকে, ত্বক হাইড্রেট হয় এবং চুলে স্বাভাবিক জেল্লা ফিরে আসে।


বীটরুট-আপেল ডিটক্স জুস

উপকরণ:

  • ১টি মাঝারি বীটরুট

  • ১টি আপেল

  • আধা গাজর

  • সামান্য লেবুর রস

পদ্ধতি:
সব উপকরণ ব্লেন্ড করে ছেঁকে নিন। এই জুসটি রক্ত পরিষ্কার করে, ত্বকে রঙ আনে এবং চুলের গোড়া মজবুত করে।


গ্রিন টি-লেবু-তুলসি ড্রিঙ্ক

উপকরণ:

  • ১ কাপ গ্রিন টি

  • কয়েকটি তুলসি পাতা

  • ১ চা চামচ মধু

  • লেবুর রস সামান্য

পদ্ধতি:
চা তৈরি করে সামান্য ঠান্ডা হলে লেবুর রস ও মধু মেশান। এটি ত্বকের ফ্রি র‍্যাডিক্যাল কমায় এবং চুলে পুষ্টি জোগায়।


ডাবের জল ও পুদিনা মিক্স

উপকরণ:

  • ১ গ্লাস ডাবের জল

  • কয়েকটি পুদিনা পাতা

  • সামান্য লেবুর রস

পদ্ধতি:
সব উপকরণ একত্রে মিশিয়ে ঠান্ডা করে পান করুন। এতে শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য থাকে এবং স্কিনে ইনস্ট্যান্ট হাইড্রেশন আসে।


ডিটক্স ড্রিঙ্কের উপকারিতা

প্রভাবত্বকেচুলে
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টফ্রি র‍্যাডিক্যাল ধ্বংস করে, বার্ধক্য কমায়চুলের ফলিকল রক্ষা করে
ভিটামিন ও মিনারেলকোলাজেন বৃদ্ধি, উজ্জ্বলতা আনেচুল পড়া রোধ করে
হাইড্রেশনড্রাই স্কিন কমায়চুলে উজ্জ্বলতা আনে
লিভার ক্লিনজিংঅ্যাকনে ও পিগমেন্টেশন কমায়রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে
হরমোন ব্যালান্সিংহরমোনজনিত ব্রণ হ্রাসচুল ঝরা কমে

কখন ও কীভাবে পান করবেন?

  • সকালে খালি পেটে বা খাবারের ৩০ মিনিট আগে।

  • দিনে ১–২ গ্লাস যথেষ্ট।

  • চিনি না দেওয়াই ভালো, প্রয়োজনে অল্প মধু ব্যবহার করতে পারেন।

  • গরম বা উষ্ণ দিনে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পান করলে রিফ্রেশিং লাগে।


সতর্কতা

  • যাদের গ্যাস্ট্রিক বা আলসার আছে, তারা অতিরিক্ত লেবু বা আদা ব্যবহার করবেন না।

  • গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন ডিটক্স ড্রিঙ্ক শুরু করবেন না।

  • প্রতিদিন নতুন করে বানানো ড্রিঙ্কই পান করুন, একদিনের বেশি সংরক্ষণ করবেন না।


অতিরিক্ত টিপস

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত জল পান করুন (কমপক্ষে ২–৩ লিটার)।

  • চিনি ও কোল্ড ড্রিঙ্ক পরিহার করুন।

  • পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম নিশ্চিত করুন।

  • ডিটক্স ড্রিঙ্কের পাশাপাশি ভেতর থেকে পুষ্টির জন্য ফলমূল ও সবজি খান।

ত্বক ও চুলের যত্ন শুধুমাত্র বাহ্যিক ক্রিম, তেল বা সিরাম দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। ভিতর থেকে শরীরকে পরিষ্কার ও পুষ্ট রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিটক্স ড্রিঙ্ক সেই প্রাকৃতিক উপায় যা শরীরের ভিতর থেকে বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে এনে ত্বক ও চুলে পুনরুজ্জীবন ঘটায়। নিয়মিত যদি এই পানীয়গুলো অভ্যাসে পরিণত করেন, তাহলে খুব শিগগিরই লক্ষ্য করবেন—চেহারায় এক নতুন দীপ্তি, চুলে এক প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা, আর মনেও এক হালকা প্রশান্তি। প্রকৃতির এই সহজ উপহারগুলোই হতে পারে আপনার সৌন্দর্যের নতুন রহস্য।

Archive

Most Popular