19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের মিশেলে ইতালির ভিয়েস্তা..

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


ইতালির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, নীলাভ আদ্রিয়াটিক সাগরের তীরে গড়ে উঠেছে এক অপূর্ব শহর ভিয়েস্তা (Vieste)। প্রাচীন রোমান সভ্যতার ছোঁয়া, সমুদ্রের অনন্ত বিস্তার, সাদা চুনাপাথরের ক্লিফ, আর পুরনো শহরের গলিঘুঁজির স্নিগ্ধ ঐতিহ্য সব মিলিয়ে ভিয়েস্তা যেন প্রকৃতি ও ইতিহাসের পরিপূর্ণ এক সিম্ফনি। এই শহরকে এক কথায় বলা যায় ‘যেখানে ভূমধ্যসাগরের সৌন্দর্য ও মানব ঐতিহ্য একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করেছে।’

ভিয়েস্তা অবস্থিত ইতালির পুলিয়া (Puglia) অঞ্চলের গারগানো উপদ্বীপে (Gargano Peninsula)। একদিকে ঘন সবুজ বনভূমি ফোরেস্টা উমব্রা (Foresta Umbra), অন্যদিকে সাদা পাথরের উপকূল আর নীল সমুদ্র প্রকৃতি যেন এখানে তার রঙের প্যালেট খুলে বসেছে। সাগর ও পাহাড়ের এই দ্বৈত চরিত্রই ভিয়েস্তাকে আলাদা করে তোলে অন্য সব উপকূলীয় শহর থেকে। সকালবেলায় যখন সূর্যের আলো চুনাপাথরের গায়ে পড়ে, তখন শহরটা সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে যেন স্বয়ং সূর্য নিজের ক্যানভাসে আঁকছে এক শিল্পকর্ম। ভিয়েস্তার ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, প্যালিওলিথিক যুগ থেকেই এখানে মানুষের বসতি ছিল। পরবর্তীকালে রোমান, বাইজানটাইন, নরম্যান নানা রাজশক্তি এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে। শহরের প্রাচীন অংশ, বোরগো অ্যান্টিকো (Borgo Antico), আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী। সংকীর্ণ, পাথর বাঁধানো রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় যেন সময় পেছনের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে দেয়ালের গায়ে পুরনো লণ্ঠন, সাদা ঘরের দরজায় ফুলের টব, আর উপরের দিক থেকে সমুদ্রের নীল আভা এসে পড়ছে মুখে। একসময় ভিয়েস্তা ছিল দস্যু আক্রমণের শিকার। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ১৫৫৪ সালে তুর্কি জলদস্যুরা শহরে হামলা চালিয়ে প্রায় সাত হাজার মানুষকে দাস করে নিয়ে যায়। সেই শোকের স্মৃতি আজও স্থানীয়দের মনে গেঁথে আছে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষতই পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যে এক দৃঢ়তার প্রতীকে।

ভিয়েস্তার পুরনো শহরে দেখা যায় রোমানেস্ক ও নরম্যান স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ মিশেল।

  • সান্তা মারিয়া আসুন্তা ক্যাথেড্রাল (Cathedral of Santa Maria Assunta), ১১শ শতকে নির্মিত, শহরের ধর্মীয় হৃদয়স্থান। এর ঘণ্টাধ্বনি এখনো প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা শহরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

  • কাস্তেলো দি ভিয়েস্তা (Castello di Vieste) — এক মধ্যযুগীয় দুর্গ, পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। এখান থেকে নিচের সৈকতের দৃশ্য এতটাই মুগ্ধকর যে পর্যটকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন দুর্গের প্রাচীরে বসে।

  • আর আছে সেই বিখ্যাত পিৎসোমুন্নো (Pizzomunno) — সৈকতের মাঝখানে দাঁড়ানো ২৫ মিটার উঁচু একক শিলা। স্থানীয় লোককথা বলে, এক তরুণ নাবিক তার প্রেয়সীকে হারিয়ে দুঃখে শিলা হয়ে গিয়েছিল — সেই প্রেমের প্রতীকই আজকের পিৎসোমুন্নো।

ভিয়েস্তার প্রকৃতি যেন রঙ, গন্ধ আর সুরের এক অবিরাম মেলবন্ধন। একদিকে আছে অসীম সমুদ্র নীল জলরাশির মধ্যে সাদা পালতোলা নৌকা, ঢেউয়ের ফেনায় আলোছায়ার খেলা। অন্যদিকে পাহাড়ের ঢালে উমব্রা বন যেখানে শীতল বাতাসে ভরে থাকে পাইনের গন্ধ, আর সূর্যের আলো ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে ঝিকমিক করে। ফোরেস্টা উমব্রা (Foresta Umbra) নামের এই বনাঞ্চল UNESCO Biosphere Reserve-এর অন্তর্ভুক্ত। এটি ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন বন, যেখানে শতবর্ষী ওকের পাশাপাশি দেখা মেলে হরিণ, বন্য শূকর, এবং অগণিত পাখির। শহরের রোদমাখা সৈকত থেকে অল্প দূরত্বেই এই সবুজ নীরবতার আশ্রয়।

ভিয়েস্তার উপকূল বরাবর অসংখ্য সামুদ্রিক গুহা (Sea Caves) রয়েছে, যেগুলিতে ছোট নৌকায় প্রবেশ করা যায়। প্রতিটি গুহার রূপ আলাদা কোথাও পানির নিচে সবুজ আলো, কোথাও শিলার গায়ে সূক্ষ্ম খোদাই। সবচেয়ে বিখ্যাত গুহাগুলির মধ্যে আছে Grotta dei Contrabbandieri (Smuggler’s Cave)Grotta Campana। নৌকা যখন সংকীর্ণ গুহার মুখে ঢোকে, জলের ঠান্ডা ফোঁটা মুখে এসে পড়ে প্রকৃতি যেন এক রহস্যময় অন্ধকারে ডেকে নিচ্ছে। সৈকতের মধ্যে Spiaggia del Castello এবং Baia di San Felice পর্যটকদের কাছে স্বর্গের সমান প্রিয়। নরম সাদা বালি, নীল আকাশ, আর সমুদ্রের কলতান দিনের পর দিন এখানে কাটিয়ে দেওয়া যায় চোখ ফেরাতে না পেরে।

ভিয়েস্তা শুধুই পর্যটনের শহর নয় এখানে এক জীবন্ত সমাজ রয়েছে, যেখানে ঐতিহ্য প্রতিদিনের জীবনের অংশ। স্থানীয় মানুষরা এখনো ধরে রেখেছেন তাদের প্রাচীন পেশা মাছ ধরা, অলিভ তেল উৎপাদন ও কৃষিকাজ। এখানকার অলিভ অয়েল সমগ্র পুলিয়া অঞ্চলে বিখ্যাত, কারণ এর ঘ্রাণে মিশে থাকে সমুদ্রের লবণ ও সূর্যের উষ্ণতা। প্রতি বছর মে মাসে পালিত হয় Feast of Santa Maria di Merino, শহরের রক্ষাকর্ত্রী দেবীর উৎসব। তিন দিনের এই উত্সবে সাগরে নৌকা মিছিল, মোমবাতির আলোকসজ্জা, আর ঐতিহ্যবাহী সংগীতের আসর বসে। সেই সঙ্গে চলে স্থানীয় বাজারে তাজা মাছ, চিজ, পাস্তা ও ওয়াইনের বিক্রি একেবারে ইতালিয়ান উৎসবের রঙিন আনন্দ। ভিয়েস্তার রান্নায় সমুদ্রের ছোঁয়া স্পষ্ট। এখানে জনপ্রিয় Spaghetti alle Vongole (শামুক দিয়ে পাস্তা), Grilled Octopus, Fritto Misto di Mare (ভাজা সামুদ্রিক খাবার) ইত্যাদি। প্রতিটি পদেই থাকে স্থানীয় অলিভ তেলের ব্যবহার, আর সাথে ঘরোয়া রুটি বা Focaccia। ডেজার্টে আসে Cartellate মধুতে ভেজানো মিষ্টি প্যাস্ট্রি, যা ক্রিসমাসে অপরিহার্য। আর খাবারের সঙ্গী হিসেবে এক গ্লাস স্থানীয় Puglian white wine যেন জিভে এনে দেয় প্রকৃতির মাদকতা।

আজকের ভিয়েস্তা আধুনিক পর্যটনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিলাসবহুল হোটেল, সমুদ্রপাড়ের রিসোর্ট, ক্যাম্পিং ভিলেজ সবই আছে এখানে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শহর তার প্রাচীন রূপ হারায়নি। পুরনো শহরের গলি, গির্জা ও দুর্গগুলো সংরক্ষিত আছে যথেষ্ট যত্নে। স্থানীয় প্রশাসন পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ মনোযোগী সমুদ্রের “Blue Flag” মর্যাদা ধরে রাখাই তার প্রমাণ। এখানে প্রতিটি রিসোর্টেই পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা, যেমন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, প্লাস্টিকবিরোধী নীতি, ও স্থানীয় উৎপাদিত খাদ্যের প্রাধান্য। প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানই এই শহরের আসল পরিচয়।

গারগানো উপদ্বীপের পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক অল্প অবহেলায়ও ক্ষতি হতে পারে প্রকৃতির ভারসাম্যে। তাই স্থানীয়রা এখন “sustainable tourism”-এর উপর জোর দিচ্ছে। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট রুটে হাঁটা, গুহা বা বনাঞ্চলে সীমিত প্রবেশ, বর্জ্য পৃথকীকরণ সবই সচেতন উদ্যোগের অংশ।
এই প্রচেষ্টা শুধু প্রকৃতি রক্ষা নয়, বরং শহরের ঐতিহ্য, মানুষের জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক দায়বদ্ধ প্রতিশ্রুতি।


ভিয়েস্তা ভ্রমণের পরামর্শ

  • ভ্রমণের সময়: এপ্রিল থেকে অক্টোবর সেরা, তবে মে বা সেপ্টেম্বর সবচেয়ে মনোরম।

  • কীভাবে যাবেন: বারি (Bari) বা ফগিয়া (Foggia) থেকে গাড়িতে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ। বাস ও ফেরি সার্ভিসও নিয়মিত চলে।

  • কী করবেন:

    • পুরনো শহরের গলি ঘুরে দেখা

    • নৌকায় চেপে গুহা দর্শন

    • সৈকতে সূর্যাস্ত দেখা

    • উমব্রা বনে ট্রেকিং

    • স্থানীয় খাবার চেখে দেখা

  • কী আনবেন: অলিভ অয়েল, স্থানীয় ওয়াইন, হাতে তৈরি সিরামিকস ভিয়েস্তার সুভেনির হিসেবে উপযুক্ত।

সন্ধ্যায় যখন শহরের বাতিগুলো জ্বলে ওঠে, সমুদ্রের ঢেউয়ে প্রতিফলিত হয় তাদের আলো তখন ভিয়েস্তা যেন এক নিঃশব্দ কবিতা। পুরনো দুর্গের প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে দূরে দেখা যায় নৌকার আলো, আর হালকা বাতাসে ভেসে আসে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এই শহরে সময় যেন ধীরে বয়ে যায় আধুনিক জীবনের তাড়াহুড়ো এখানে এসে থেমে যায় এক মুহূর্তের প্রশান্তিতে। ভিয়েস্তা কেবল একটি ভ্রমণগন্তব্য নয়; এটি এক অনুভব। এখানে প্রকৃতি ও ঐতিহ্য একে অপরের পরিপূরক। ক্লিফের গায়ে লেগে থাকা সমুদ্রের লোনা জল, পুরনো গলির সিঁড়িতে বসে কফির কাপ হাতে সূর্যাস্ত দেখা এগুলোই ভিয়েস্তার আসল সম্পদ। আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে ভিয়েস্তা মনে করিয়ে দেয়, ‘সৌন্দর্য মানে স্থিরতা, আর ঐতিহ্য মানে স্মৃতির উষ্ণতা।’ যে কেউ একবার এই শহরে গেলে বুঝবে প্রকৃতি যখন মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে, তখনই তৈরি হয় সত্যিকারের শিল্প। ভিয়েস্তা হলো সেই শিল্প, যেখানে নীল আকাশ, সাদা ক্লিফ, আর মানুষের হৃদয় একত্রে সৃষ্টি করেছে অনন্ত ইতালিয়ান সুরেলা মায়া।

Archive

Most Popular