19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

চলুন ঘুরে আসি পাহাড়, অরণ্যে ঘেরা দেওঘর থেকে।

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


ঝাড়খণ্ডের হৃদয়ে লুকিয়ে আছে এক অনন্য শহর, দেওঘর। সাধারণত আমরা এই শহরকে চিনে থাকি তার ধর্মীয় আভা, মন্দির সমাহার আর শ্রাবণ মেলার জনারণ্যের জন্য। কিন্তু দেওঘরের প্রকৃত সৌন্দর্য অনেকেরই অজানা। শহরটিকে চারদিকে ঘিরে রয়েছে ঘন অরণ্য, মৃদু পাহাড়ি ঢাল, শিলাস্তর, জঙ্গলের পথ, শান্ত জলধারা, পাখির ডাক আর প্রকৃতির নিভৃত মায়াবী ছোঁয়া। ধর্মীয় পর্যটনের গণ্ডি পেরিয়ে দেওঘর আজ হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমীর স্বর্গ। যে শহরে একদিকে রয়েছে ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও ইতিহাস; অন্যদিকে আছে মহুয়া গাছের সুবাসে মোড়া জঙ্গল, নরম পাহাড়ি ট্রেকিং রুট, রহস্যময় শিলা, পতিত জল, আর নীরবতার সংগীতে ভরা প্রকৃতি। ব্যস্ততার শহুরে দিনযাপনে ক্লান্ত মানুষদের কাছে দেওঘর আজ এক অন্যরকম প্রশান্তির গন্তব্য। পাহাড়, জঙ্গল, পুরাণ আর স্নিগ্ধ পরিবেশ সবকিছু মিলেমিশে এক অনন্য অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। এই প্রতিবেদনে দেওঘরের সেই অজানা, অপরূপ, মনশীতল রূপের খোঁজ পাওয়া যাবে।

দেওঘরে পৌঁছোনোর পথ এখন অনেক সহজ। নিকটবর্তী বিমানবন্দর দেবী অহল্যা বিমানবন্দর, যা শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। কলকাতা, দিল্লি, পাটনা, রাঁচি এমন বহু শহর থেকে সরাসরি বিমান পাওয়া যায়। রেলপথেও দেওঘর গুরুত্বপূর্ণ জংশন। হাওড়া, শিয়ালদহ, পাটনা, আসানসোল, দুর্গাপুর সব জায়গা থেকেই নিয়মিত ট্রেন রয়েছে। সড়কপথেও ঝাড়খণ্ড ও বিহারের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাস পাওয়া যায়। শহরের দিকে এগিয়ে আসতেই চোখে পড়ে পাহাড়ি কাটিং, বনভূমির ছায়া, আর প্রকৃতির বিস্তৃত নীরবতা। কে বলবে, এত বিখ্যাত তীর্থনগরীর আড়ালে এমন প্রকৃতি লুকিয়ে রয়েছে!

কখন গেলে দেওঘর সবচেয়ে সুন্দর লাগে, এ প্রশ্ন অনেকেরই। বর্ষায় ঘন মেঘ পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকে, অরণ্য সবুজে চকচক করে। জলের ধরণি প্রাণ পায়। কিন্তু বর্ষায় ট্রেকিং সবসময় নিরাপদ নয়। তাই প্রকৃতির পাশাপাশি ঘোরাঘুরি, ট্রেকিং, দর্শন সব মিলিয়ে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টিই সেরা। শীতের সকালে পাহাড়ি হাওয়া শীতল হয়, দুপুরে কোমল রোদ পড়ে, আর সন্ধ্যায় শহরের আলো পাহাড়ে প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করে অদ্ভুত শান্ত অনুভূতি। গরমের সময়ও দেওয়া যায়, শহরটি খুব গরম হয় না, কিন্তু পাহাড়ি হাঁটা একটু ক্লান্তিকর হয়ে উঠে।

দেওঘরকে অরণ্য ও পাহাড়ের শহর বলা হয়। এখানে রয়েছে নরম ঢালু পাহাড়, যেগুলিতে খুব জটিল ট্রেক রুট নেই তাই পরিবার নিয়ে ট্রেকিং উপভোগ করা যায় সহজেই। অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেক রুট হলো তাপোবন। শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তাপোবন একদিকে যেমন ধর্মীয় আভায় ভরপুর, অন্যদিকে তেমনই প্রকৃতির আবাহনে সমৃদ্ধ। পাহাড়ের গায়ে ওঠার পথটিতে বুনো গাছ, লতাগুল্ম, শিলাস্তর আর মহুয়া ফুলের গন্ধ মন মাতিয়ে দেয়। ওপরে উঠে চোখে পড়ে পুরনো গুহা, যেখানে বলা হয় ঋষিরা ধ্যান করতেন। তাপোবনের উপরের দিক থেকে নিচের পুরো শহরটি দেখা যায়—এ দৃশ্য দেওঘরের অন্যতম সেরা উপহার। পাহাড়ের নীরবতা, নীল আকাশ আর শীতল বাতাস মিলিয়ে এই জায়গাটি যেন মনকে ধুয়ে দেয়।

আরও একটি অপরূপ জায়গা হলো নন্দন পাহাড়। শহর থেকে খুব কাছেই অবস্থিত এটি, এবং পরিবার বা বাচ্চাদের সঙ্গে ঘোরার জন্য দারুণ উপযোগী। নন্দন পাহাড়ে আছে সবুজ ঘাসে মোড়া সমতল, খেলাধুলোর জায়গা, এবং একটি ছোট কৃত্রিম লেক। তবে সবচেয়ে সুন্দর হলো পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে শহরের দৃশ্য দেখা। শীতের সন্ধ্যায় এখানে দাঁড়িয়ে দেয়া যায় লাল-কমলা সূর্যাস্তের অপূর্ব সৌন্দর্য। পাহাড়ের ওপরের বাতাসে এক অদ্ভুত শান্তি যেন কোলাহল থেকে পৃথক এক জগৎ।

দেওঘরের অরণ্যের মধ্যেও রয়েছে কিছু রহস্যময় জায়গা। অনেক স্থানীয় মানুষ বলেন শহরের উপকণ্ঠে কিছু শিলাস্তর ও গভীর জঙ্গল রয়েছে, যেগুলিকে তারা "ভূতের জায়গা" বলে ডাকেন। আসলে এগুলি মূলত গভীর অরণ্যের ভেতর, যেখানে আলো কম পৌঁছয় এবং প্রতিধ্বনি বেশি শোনা যায়। সন্ধ্যা নামে দ্রুত, আর বুনো পশুপাখির ডাক সেই পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তোলে। অবশ্য বাস্তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই তবে স্থানীয়দের পরামর্শ নিয়ে তবেই এমন জায়গায় যাওয়া উচিত। এই অরণ্যের মাঝে হাঁটলেই বোঝা যায় প্রকৃতির নিঃশব্দ রূপ কেমন।

দেওঘর শুধু পাহাড়-জঙ্গল নয় এ শহর ইতিহাসের ঝাঁপি। বিখ্যাত বৈদ্যনাথ ধাম মন্দির এখানকার প্রাণ। ২০০০ বছরের পুরোনো এই মন্দির ভারতের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের একটি, যেখানে সারা বছর ভিড় লেগে থাকে। শিবভক্তদের কাছে এটি অমূল্য তীর্থ। শ্রাবণে কানওয়াড়িয়া যাত্রার সময় এখানে লাখো ভক্তের সমাগম হয়। মন্দির চত্বরের পাশেই লুকিয়ে আছে পুরনো গলি, বাজার ও প্রাচীন স্থাপত্যের ঝলক। মন্দিরের পুরোনো পাথুরে দেওয়াল, বেলপাতা, ধূপের গন্ধ আর শিবলিঙ্গে জল ঢালার শব্দ সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

দেওঘরে আরও আছে সন্দেশ্বর মন্দির, হার্লিক মান্দার, নরসিংহ তলা, রামকৃষ্ণ মঠ যেগুলি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে সমৃদ্ধ এবং দর্শনার্থীদের মন গভীর শান্তিতে ভরে দেয়। বিশেষ করে হার্লিক মান্দারের পাহাড়ঘেরা পরিবেশ আপনাকে মুহূর্তেই ছুঁয়ে যাবে। সেখানে বসে মনে হয় যেন সময় ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেছে।

শহরের প্রকৃতি ঘুরে দেখার পর অবশ্যই চেখে দেখা উচিত এখানকার স্থানীয় খাবার। ঝাড়খণ্ডের রান্নায় আছে সাদাসিধে উপাদান, কিন্তু স্বাদ অপূর্ব। পিঠা, ধুসকা, পুয়া, মালপোয়া প্রতিটি খাবারই গ্রাম্য ঐতিহ্যের ছাপ বহন করে। মহুয়ার শুকনো ফুল দিয়ে বানানো রান্না এখানকার বিশেষত্ব। দেওঘর শহরের রাস্তার ধারের দোকানে নানান স্থানীয় স্ন্যাকস পাওয়া যায় লিট্টি-চোখা, ধুসকা-আলুর তরকা, চাতু সূপ, বিভিন্ন ডাল-ভাজা। খাবারের এই সরলতা শহরের প্রকৃতির স্নিগ্ধতার সঙ্গে মিলে যায় একেবারে অদ্ভুতভাবে।

যারা বাজেট ট্যুর প্ল্যান করেন, দেওঘর তাদের জন্য খুবই উপযোগী। এখানে থাকার খরচ খুব বেশি নয়। বাজেট লজ, মাঝারি মানের হোটেল, এবং কিছু ভালো রিসর্ট সবই পাওয়া যায় সুলভ দামে। শহরটি ছোট হওয়ায় পরিবহণে বেশি খরচ পড়ে না। অটো বা টোটোতে বেশিরভাগ জায়গায় ঘোরা যায়। দুই দিন হলে মন্দির দর্শন ও কিছু পাহাড়ি জায়গা দেখা সম্ভব। তিন দিনের প্ল্যানে ট্রেকিং, অরণ্য হাঁটা, এবং কিছু দূরের দর্শনীয় স্থান ঘোরা যায় খুব আরামে। তাই পরিবার, দম্পতি, বন্ধুরা মিলেও দেওঘর দারুণ ভ্রমণস্থল।

সেফটি টিপস হিসেবে বলা যায় বর্ষায় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে, তাই ট্রেকিংয়ে সতর্ক থাকুন। অরণ্যের গভীরে একা বা সন্ধ্যার পর না যাওয়া ভালো। স্থানীয়দের নির্দেশ মানুন। তাপমাত্রা শীতে কমে যায়, তাই গরম কাপড় সঙ্গে রাখুন। আর মন্দিরে ভিড়ের সময়ে নিজের জিনিসপত্র সাবধানে রাখুন।

সবশেষে বলা যায়, দেওঘর এমন একটি শহর যেখানে ধর্ম, ইতিহাস ও প্রকৃতি এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। পাহাড়, অরণ্য, পুরাণ, মন্দির, স্থানীয় খাবার, শান্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে এই শহর ভ্রমণকারীর হৃদয়ে এক স্থায়ী ছাপ ফেলে। শুধু তীর্থস্থান হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতির কোলে নিভৃত সৌন্দর্যের স্পর্শ খুঁজতে চাইলে দেওঘর আপনাকে কখনোই হতাশ করবে না। গন্তব্যের সৌন্দর্য যে শুধু চোখে দেখা যায় না অনুভবেও থাকে, তা প্রমাণ করে এই শহর। তাই পরের ছুটিতে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ি শহর দেওঘর আপনার অপেক্ষায়।

Archive

Most Popular