প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ফ্যাশনের দুনিয়ায় একটাই চিরন্তন সত্য পুরোনো কখনও পুরোনো হয় না। সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলায়, কিন্তু আসল সৌন্দর্য থেকে যায় অপরিবর্তিত। আজকের প্রজন্ম যখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, ইনস্টাগ্রাম ফিল্টার ও গ্লোবাল ট্রেন্ডে মেতে আছে, তখনও সাবেকি সাজের জাদু যেন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কারণ, সাবেকি সাজ মানে শুধু পোশাক নয় এ এক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, এবং পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ।
‘সাবেকি’ শব্দের অর্থই হলো প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী। সাবেকি সাজ মানে সেই সাজ, যা একসময় আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা পরতেন হাতে চুড়ি, কপালে বড় টিপ, কানে ঝুমকো, খোঁপায় গাঁদা ফুল, আর পাড়ওয়ালা শাড়ি। আজকের মেকআপ, জিন্স বা গাউন-এর ভিড়েও এই সাজ যেন এক টুকরো স্মৃতি, একটুকরো ঘরে ফেরার অনুভূতি। এই সাজের মূলে আছে ভারতীয় সংস্কৃতি বিশেষ করে বাঙালি নারীর অনন্য গরিমা। যেখানে লাল-পাড় সাদা শাড়ি শুধু পোশাক নয়, পূজার আবেগ। যেখানে সোনার চুড়ি মানে সম্পর্কের বন্ধন। যেখানে আলতার রঙে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা আর শুদ্ধতার গল্প।
আজকের যুগে ফ্যাশন মানে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং নিজস্ব পরিচয়ের প্রকাশ। সেই কারণে মানুষ ফিরে আসছে ঐতিহ্যের কাছে। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে
বর্তমান প্রজন্ম অতীতের গল্পে ভরপুর ঠাকুমার ট্রাঙ্কের শাড়ি, পুরোনো অ্যালবামের টিপ-চুড়ির ছবি এইসবেই লুকিয়ে আছে আবেগ। তাই সাবেকি সাজ আজ হয়ে উঠেছে স্মৃতির প্রতীক।
ফাস্ট ফ্যাশনের দৌড়ে যখন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি, দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যবাহী পোশাকই টেকসই বিকল্প। জামদানি, তসর, বালুচরি বা মসলিন সবই ইকো-ফ্রেন্ডলি এবং হ্যান্ডক্রাফটেড, যা ট্রেন্ডেও টিকে থাকে।
আজকের সিনেমা বা সিরিজেও সাবেকি সাজের ছোঁয়া প্রবল। ‘রাজকাহিনী’-র রাণী, ‘গর্মেন্টস গার্ল’ বা ‘বিসর্জন’-এর নায়িকাদের ঐতিহ্যবাহী সাজ দর্শকদের মনে প্রভাব ফেলেছে। এমনকি ইনস্টাগ্রামে সেলিব্রেটিরাও এখন ‘রেড অ্যান্ড হোয়াইট লুক’, ‘নো মেকআপ ট্র্যাডিশনাল গ্লো’ নিয়ে পোস্ট করছেন।
দুর্গাপূজা, বিয়ে, পায়লা বৈশাখ প্রতিটি অনুষ্ঠানে সাবেকি সাজের কদর চিরকালীন। এমনকি আধুনিক ডিজাইনাররাও এখন ‘ফিউশন’ কনসেপ্টে এই সাজকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন।
শাড়ি মানেই বাঙালির গর্ব। কিন্তু সাবেকি সাজে শাড়ির বিশেষ স্থান
লাল পাড় সাদা শাড়ি: দুর্গাপূজা বা বিজয়া দশমীর সময় এই সাজই চিরন্তন।
গরদ, কাতান ও তসর: এই শাড়িগুলিতে ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প।
জামদানি ও বালুচরি: প্রতিটি নকশা যেন একেকটি গল্প, একেকটি ইতিহাস।
আজকের ডিজাইনাররা এই শাড়িগুলিতে আধুনিক ড্রেপিং ও ব্লাউজ স্টাইল যোগ করে নতুনত্ব এনেছেন।
সাবেকি সাজ কখনোই গহনা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।
সোনার ঝুমকো, কাঁকন, নথ, পায়েল, সিঁদুরদান: এগুলো শুধু অলঙ্কার নয়, সংস্কৃতির প্রতীক।
অক্সিডাইজড বা টেরাকোটা গহনা: আজকের তরুণীরা ঐতিহ্যের ছোঁয়া রাখতে এই উপকরণও পছন্দ করছেন।
পোলকি ও কুন্দন জুয়েলারি: ঐতিহ্যবাহী নকশার সঙ্গে আধুনিক ফিনিশিং এই সাজকে দেয় রাজকীয় আবেদন।
চুল: ক্লাসিক খোঁপা, মেসি বান, বা জুঁই ফুলের মালা সবই সাবেকি সাজের অঙ্গ।
কপালে টিপ: বড় লাল টিপ বা বিন্দি আজও এক অনন্য স্টেটমেন্ট।
মেকআপ: সাবেকি সাজে মেকআপ হয় ন্যাচারাল। সামান্য কোলাজল, গোলাপি লিপস্টিক, ও সিঁদুরের ঝলকই যথেষ্ট।
বর্তমান ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে “ফিউশন” শব্দটি খুব জনপ্রিয়। সাবেকি সাজকে আজকের প্রেক্ষাপটে আধুনিক রূপে উপস্থাপনই এর উদ্দেশ্য।
শাড়ির সঙ্গে ক্রপ টপ বা বেল্ট।
ধুতি প্যান্টের সঙ্গে কুর্তা বা কাথা জ্যাকেট।
ঐতিহ্যবাহী গয়নার সঙ্গে ওয়েস্টার্ন হেয়ারস্টাইল।
এই মেলবন্ধন তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সৌন্দর্য শেখাচ্ছে, কিন্তু একঘেয়েমি ছাড়াই।
লালপাড় সাদা শাড়ি, বড় টিপ, সিঁদুর, শঙ্খ-বালা এই সাজই বাঙালির গর্ব। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিনের সাজে থাকে সামান্য পরিবর্তন, কিন্তু আবেগ থাকে একটাই—ভক্তি ও গৌরব।
বিয়ের সাজে সাবেকি ছোঁয়া মানেই লাল কাতান, সোনার গয়না, আলতা-পরা পা, আর মাথায় শাঁখা-পলা। বর-পক্ষেও এখন সাবেকি ধুতি-পাঞ্জাবির রমরমা ফিরে এসেছে।
সাদা-লাল কম্বিনেশনে কটন শাড়ি, অক্সিডাইজড গয়না, হাতে লাল চুড়ি এই সাজেই মিশে থাকে নববর্ষের উচ্ছ্বাস।
তরুণীরা এখন সিঁদুর-টিপ, কাঁসার কানের দুল ও কাথা শাড়ি পরে “হেরিটেজ লুক” দিচ্ছেন। এমনকি ছেলেদেরও দেখা যায় হ্যান্ডলুম কুর্তা বা ধুতি পরতে।
রঙেরও ভাষা আছে। সাবেকি সাজে রঙ মানেই আবেগের প্রকাশ।
লাল: শক্তি, প্রেম ও ঐশ্বর্যের প্রতীক।
সাদা: শুদ্ধতা ও শান্তির প্রতীক।
হলুদ: শুভ সূচনার রঙ, পুজো ও বিবাহের অপরিহার্য অংশ।
সবুজ: প্রকৃতি, পুনর্জন্ম ও ভারসাম্যের প্রতীক।
সোনালি: ঐশ্বর্য ও রাজকীয়তার প্রতীক।
এই রঙগুলোর ব্যবহার শুধু ফ্যাশনে নয়, উৎসবের আবহেও অনন্য বার্তা বহন করে।
সাবেকি সাজের পেছনে আছে শতাব্দীর ঐতিহ্য, কারিগরের ঘাম, ও শিল্পীর মনন। মুর্শিদাবাদের তাঁত, শান্তিনিকেতনের কাথা, কেশবপুরের সিল্ক, আর বোলপুরের হ্যান্ডলুম এই সবই বাঙালির গর্ব। আজকের দিনে যখন যান্ত্রিক উৎপাদন বেড়েছে, তখন হাতে বোনা জামদানি বা হ্যান্ডপেইন্টেড শাড়ি পরা যেন এক সামাজিক বার্তা আমরা এখনো ঐতিহ্যকে ভালোবাসি।
সাবেকি সাজ শুধু বাহ্যিক নয়, এটি মানসিক প্রশান্তিরও উৎস। যখন আমরা ঐতিহ্যের পোশাক পরি, তখন একধরনের আত্মতৃপ্তি ও আত্মপরিচয় বোধ জাগে। নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে পুনর্মিলন আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। অন্যদিকে, এই সাজ সমাজে নারীর শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক। শাড়ি ও সিঁদুরে যেন লুকিয়ে আছে দেবী-শক্তির উপস্থিতি, যা আজও নারীর আত্মসম্মানের প্রতীক।
আজকের ডিজাইনাররা পুরোনো মোটিফ, ব্লকপ্রিন্ট, কাথা স্টিচ, ও হ্যান্ডলুম কাপড়কে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করছেন। সাবেকি সাজ এখন কেবল ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি এখন ramp walk, ফ্যাশন শো ও wedding couture collection-এর অপরিহার্য অংশ। বিখ্যাত ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জি, অনামিকা খন্না, রিমঝিম দত্ত প্রমুখ তাঁদের কালেকশনে বারবার সাবেকি স্টাইলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলেছেন। ফলে “ইন্ডিয়ান রিগ্যাল লুক” এখন গ্লোবাল ফ্যাশনের অংশ।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাবেকি সাজের জনপ্রিয়তা বহুগুণে বেড়েছে। ইনস্টাগ্রামে #TraditionalLook, #SareeLove, #EthnicElegance বা #BengaliBeauty হ্যাশট্যাগগুলোতে লাখ লাখ পোস্ট। ইনফ্লুয়েন্সাররা শাড়ি ড্রেপিং টিউটোরিয়াল, জুয়েলারি স্টাইলিং টিপস ও সাবেকি মেকআপ গাইড শেয়ার করছেন। এইভাবে ঐতিহ্য আজ ডিজিটাল রূপে নবজন্ম নিচ্ছে।
১. পুরোনো শাড়ি রিসাইকেল করে নতুন ব্লাউজ ডিজাইন করুন।
২. সাবেকি গয়নার সঙ্গে আধুনিক হেয়ারস্টাইল মেলান।
৩. হালকা মেকআপের সঙ্গে বড় টিপ দিন minimal yet elegant।
৪. হাতে কলাপাতা বা ফুলের ব্যাগ ব্যবহার করুন ইকো-ফ্রেন্ডলি ও দৃষ্টিনন্দন।
৫. পুরুষদের জন্য ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে লেদার ঘড়ি বা ক্যানভাস জুতো নতুন কনট্রাস্ট তৈরি করে।
আজকের ট্রেন্ড কালকের অতীত, কিন্তু সাবেকি সাজ এটি কখনও মরে না। কারণ, এর ভেতর লুকিয়ে আছে আবেগ, ইতিহাস, ও সংস্কৃতির গর্ব। যখন আমরা সাবেকি সাজে সেজে উঠি, তখন আমরা শুধু সুন্দর হই না, বরং নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হই। এই শিকড়ই আমাদের শক্তি, যা আমাদের আলাদা করে তোলে গ্লোবাল ট্রেন্ডের ভিড়ে। সুতরাং, সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকুক ফ্যাশনের রূপ, কিন্তু মনে রাখুন ট্রেন্ডে যাই থাকুক, সাবেকি সাজের জাদু চিরকালই অমলিন।