19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

চুলের কোন সমস্যায় কোন ট্রিটমেন্ট?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


চুল শুধু সৌন্দর্যেরই প্রতীক নয়, এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক অবস্থারও এক নিঃশব্দ প্রতিফলন। একসময় যেখানে চুলের যত্ন বলতে ছিল শুধু তেল দেওয়া বা ধোয়া, আজ সেখানে এসেছে নানা ধরণের বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক ট্রিটমেন্ট। কিন্তু কোন সমস্যায় কোন ট্রিটমেন্ট আসলেই উপযোগী—এই প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে অনেক সময় বিপরীত ফল দেখা দেয়। তাই আজ জানব, চুলের প্রধান সমস্যাগুলি এবং তাদের উপযুক্ত যত্ন বা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে।



১. চুল পড়া (Hair Fall)


সমস্যা:

চুল পড়া আজ সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা। মানসিক চাপ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েড সমস্যা, দূষণ, রঙ বা হিট টুলের অতিরিক্ত ব্যবহার সবই এর কারণ হতে পারে।


ট্রিটমেন্ট:

১. PRP থেরাপি (Platelet Rich Plasma Therapy):

রোগীর নিজের রক্ত থেকে প্লাজমা বের করে স্কাল্পে ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে গ্রোথ ফ্যাক্টর থাকে, যা চুলের গোড়াকে পুনরুজ্জীবিত করে। ৩-৪ সেশনের পর ফল পাওয়া যায়।


২. Mesotherapy:

ভিটামিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড ও মিনারেল মিশ্রিত ইনজেকশন স্কাল্পে প্রয়োগ করা হয়। এতে রক্ত চলাচল বাড়ে ও চুলের ফলিকল শক্ত হয়।


৩. ন্যাচারাল হোম ট্রিটমেন্ট:

আঁশযুক্ত খাবার, ভিটামিন বি, সি ও ই সমৃদ্ধ ফলমূল, প্রোটিনসমৃদ্ধ ডায়েট এবং সপ্তাহে অন্তত দুইবার নারকেল বা ভৃঙ্গরাজ তেল মালিশ উপকারী।

ডিআইওয়াই টিপস: মেথি বীজ ভিজিয়ে বেটে স্কাল্পে লাগিয়ে রাখুন ৩০ মিনিট চুল পড়া কমবে।



২. খুশকি (Dandruff)


সমস্যা:

শুকনো স্কাল্প, ত্বকের ছত্রাক (Malassezia), অতিরিক্ত তেল, বা সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা—সব মিলিয়ে মাথায় সাদা খোসার মতো খুশকি দেখা দেয়।


ট্রিটমেন্ট:

১. Anti-dandruff Shampoo:

Ketoconazole, Zinc Pyrithione বা Selenium Sulfide যুক্ত শ্যাম্পু সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করুন।


২. স্কাল্প ক্লিনজিং থেরাপি:

সালন বা ডার্মাটোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে ডিপ ক্লিনজিং ট্রিটমেন্টে স্কাল্প পরিষ্কার করে নেওয়া যেতে পারে। এতে ছত্রাক ও মৃত কোষ দূর হয়।


৩. গৃহ-উপায়:

টক দই, লেবুর রস ও নিমপাতা বেটে লাগালে খুশকি কমে যায়।

সতর্কতা: অতিরিক্ত শ্যাম্পু বা হট ওয়াটার ব্যবহার খুশকি বাড়াতে পারে।


৩. শুষ্ক ও নিস্তেজ চুল (Dry & Frizzy Hair)


সমস্যা:

অতিরিক্ত রোদ, ক্লোরিনযুক্ত জল, হিট স্টাইলিং বা রাসায়নিক রঙের ব্যবহারে চুলের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে যায়।


ট্রিটমেন্ট:

১. Keratin Treatment:

চুলের ভেতরে প্রোটিন কেরাটিন প্রবেশ করিয়ে তাকে মসৃণ ও চকচকে করে তোলে। যারা বারবার স্ট্রেইটনার বা হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি কার্যকর।


২. Hair Botox:

চুলে ব্যবহৃত একপ্রকার ডীপ কন্ডিশনিং ট্রিটমেন্ট যা ক্ষতিগ্রস্ত স্তর ভরাট করে ও প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে।


৩. গৃহ-উপায়:

ডিম, দই ও অলিভ অয়েলের প্যাক সপ্তাহে একবার চুলে লাগিয়ে রাখলে চুলে নরমভাব ও পুষ্টি ফিরে আসে।

অতিরিক্ত টিপস: সালফেট-ফ্রি শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।


৪. অয়েলি স্কাল্প ও চুল দ্রুত নোংরা হওয়া


সমস্যা:

স্কাল্পে Sebaceous gland বেশি তেল উৎপাদন করলে চুল সবসময় তৈলাক্ত ও ভারী লাগে।


ট্রিটমেন্ট:

১. Scalp Detox Therapy:

অতিরিক্ত সিবাম, ধুলো ও মৃত কোষ দূর করে স্কাল্পকে শ্বাস নিতে দেয়।

২. অয়েল কন্ট্রোল শ্যাম্পু:

গ্রীন টি, টি ট্রি বা চারকোল এক্সট্র্যাক্ট যুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায়।

৩. প্রাকৃতিক উপায়:

লেবুর রস ও অ্যালোভেরা মিশিয়ে লাগালে তেল কমে যায়।

খেয়াল রাখুন: বারবার শ্যাম্পু করলে স্কাল্পে রিবাউন্ড ইফেক্টে তেল আরও বেড়ে যায়।


৫. দু’মুখো চুল (Split Ends)


সমস্যা:

চুলের শেষ প্রান্ত ফেটে যাওয়া মানে প্রোটিন ক্ষয় ও আর্দ্রতার অভাব।


ট্রিটমেন্ট:

১. Hair Spa বা Deep Conditioning:

নিয়মিত মাসে একবার হেয়ার স্পা চুলে আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনে।

২. Trimming:

প্রতি ৬–৮ সপ্তাহে চুল ছাঁটা জরুরি।

৩. গৃহ-উপায়:

অ্যাভোকাডো ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে লাগালে চুলের প্রান্ত মজবুত হয়।


৬. অকাল পাকা চুল (Premature Greying)


সমস্যা:

বংশগত কারণ, মানসিক চাপ, জিঙ্ক বা কপার ঘাটতি, অতিরিক্ত হিট ট্রিটমেন্ট—সব মিলিয়ে চুল দ্রুত সাদা হতে শুরু করে।


ট্রিটমেন্ট:

১. Ammonia-free Hair Colour:

রাসায়নিক রঙের বদলে হারবাল বা হেনা-ভিত্তিক ডাই ব্যবহার করুন।

২. Hair Pigmentation Therapy:

নতুন প্রযুক্তি, যেখানে বিশেষ সিরাম স্কাল্পে লাগানো হয় যা মেলানিন উৎপাদন বাড়ায়।

৩. প্রাকৃতিক উপায়:

আমলকি, কারিপাতা, ব্রাহ্মি ও নারকেল তেল একসঙ্গে ফুটিয়ে লাগান।

খাবারে যোগ করুন: ডিম, বাদাম, পনির, পালং শাক—যাতে কপার ও ভিটামিন বি১২ বেশি।


৭. চুল পাতলা হয়ে যাওয়া (Thinning Hair)


সমস্যা:

Hormonal imbalance, PCOS, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা crash diet করলে চুল পাতলা হয়।


ট্রিটমেন্ট:

১. Stem Cell Therapy:

নতুন কোষ উৎপাদনের মাধ্যমে চুলের ফলিকলকে সক্রিয় করা হয়।

২. Laser Hair Therapy:

লো লেভেল লেজার লাইট স্কাল্পে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে ফলিকল পুনরুজ্জীবিত করে।

৩. ডায়েটারি পরিবর্তন:

প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ জরুরি।



৮. চুল ভাঙা (Breakage)


সমস্যা:

চুলের শ্যাফট দুর্বল হয়ে গেলে ব্রাশ বা স্টাইলিংয়ে চুল মাঝপথে ভেঙে যায়।


ট্রিটমেন্ট:

১. Olaplex Treatment:

চুলের ভিতরের রাসায়নিক বন্ধন পুনর্গঠন করে।

২. Protein Pack:

ডিম, দই, নারকেল দুধ মিশিয়ে লাগালে প্রোটিন ঘাটতি পূরণ হয়।

সতর্কতা: ভেজা চুলে ব্রাশ করবেন না।


৯. Alopecia বা টাক পড়া সমস্যা


সমস্যা:

পুরুষ বা নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে। অটোইমিউন সমস্যা, হরমোনের পরিবর্তন বা জেনেটিক কারণ প্রধান।


ট্রিটমেন্ট:

১. Minoxidil (টপিক্যাল সলিউশন):

নিয়মিত ব্যবহার চুলের ফলিকলকে উদ্দীপিত করে।

২. Hair Transplant:

যেখানে স্থায়ীভাবে চুল উঠে আসে না, সেখানে সার্জিক্যালভাবে ফলিকল বসানো হয়।

৩. সাইকোলজিকাল কাউন্সেলিং:

কারণ মানসিক চাপ থেকেও Alopecia বাড়ে।


১০. রাসায়নিক ক্ষতি (Chemical Damage)


সমস্যা: রঙ করা, স্ট্রেইটেনিং, পার্মিং; এইসব ট্রিটমেন্টে চুলের প্রাকৃতিক কাঠামো নষ্ট হয়।


ট্রিটমেন্ট:

১. Bond Rebuilding Therapy (যেমন Olaplex, K18):

চুলের ভাঙা বন্ধন পুনর্গঠন করে শক্তি ফিরিয়ে দেয়।

২. Hydration Treatment:

গ্লিসারিন বা অ্যালোভেরা যুক্ত হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করুন।

৩. প্রতিরোধ:

স্টাইলিংয়ের আগে সবসময় হিট প্রোটেকশন সিরাম লাগান।


কিছু সাধারণ নিয়ম:


১.সুষম খাদ্যগ্রহণ:

চুলের মূল শক্তি আসে ভেতর থেকে। ডায়েটে প্রোটিন, আয়রন, বায়োটিন, ওমেগা-৩ রাখুন।

২.পর্যাপ্ত জল পান করুন।

৩.স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট:

যোগ, ধ্যান, পর্যাপ্ত ঘুম চুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক।

৪.হেয়ার কেয়ার রুটিন মেনে চলুন: শ্যাম্পু – কন্ডিশনার – সিরাম – মাস্ক – তেল, এই সাইকেল বজায় রাখুন।

৫.নিজের চুলের ধরন বুঝে প্রোডাক্ট বাছাই করুন।


চুলের যত্ন মানে কেবল বাহ্যিক সাজ নয় এ এক পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যচর্চা। নিজের স্কাল্প ও চুলের ধরন বুঝে সঠিক ট্রিটমেন্ট বেছে নেওয়াই আসল কৌশল। অতিরিক্ত রাসায়নিক নয়, বরং প্রকৃতি ও বিজ্ঞানকে মিলিয়ে চললে চুল থাকবে ঘন, সুস্থ ও দীপ্তিময়।

কারণ, চুল শুধু “দেখার” নয় এ আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীকও বটে।

Archive

Most Popular