স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
টাইপ-টু ডায়াবেটিস আজ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত-বর্ধনশীল স্বাস্থ্য সমস্যা। আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, স্ট্রেস, জিনগত ঝুঁকি এই সব মিলেই দিন দিন বাড়ছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। শরীর যখন ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা টাইপ–টু ডায়াবেটিসে পরিণত হয়। তবে সুখবর হল এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রধান হাতিয়ার হল সঠিক ও সচেতন খাদ্য নির্বাচন। ওষুধ বা ইনসুলিন অনেক সময় প্রয়োজন হয় বটে, কিন্তু প্রতিদিনের প্লেট–সংস্কৃতি যদি বিজ্ঞানসম্মত না হয়, তাহলে রক্তে গ্লুকোজ স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ডায়াবেটিস রোগীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল রক্তে শর্করার আকস্মিক ওঠানামা রোধ করা। উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা GI–যুক্ত খাবার শরীরে খুব দ্রুত শর্করা ছাড়ে, ফলে ইনসুলিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সাদা চাল, পাঁউরুটি, আলু, লুচি–পরোটা, মিষ্টি, প্যাকেট জুস, কোল্ড ড্রিংক—এসবই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই প্রথমেই প্রয়োজন তালিকার অপ্রয়োজনীয় অংশগুলি ছেঁটে ফেলা। একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার—চিপস, বিস্কুট, কেক, ইনস্ট্যান্ট নুডলস—এসব রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়ায় এবং শরীরে চর্বি জমায়। অনেকে মনে করেন ফল বেশি খেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু বাস্তবে পাকা কলা, আনারস, আম—এসবও দ্রুত শর্করা বাড়ায়, তাই পরিমিতি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে গ্লুকোজ স্থিতিশীল রাখার জন্য ডায়াবেটিস–ফ্রেন্ডলি খাবারের তালিকায় থাকা উচিত কম GI–যুক্ত শস্য, প্রচুর ফাইবার, লিন প্রোটিন এবং ভালো ফ্যাট। ব্রাউন রাইস, রেড রাইস, মিক্সড গ্রেইন রুটি, ওটস, ডাল, ছোলা, মুগ–মুসুর—এসব ধীরে শর্করা ছাড়ে। শাকসবজি ডায়াবেটিস রোগীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। লাউ, ঝিঙে, বরবটি, ধনেপাতার মতো জলীয় শাকসবজি গ্লুকোজ কমায়, আবার বাঁধাকপি–ফুলকপি–বেগুন প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ফাইবার রক্তে শর্করা শোষণের গতি কমায়, ফলে খাবারের পর গ্লুকোজ তেমন বাড়ে না। তাই ওটস, আপেল, নাশপাতি, গাজর, পালং, পুঁই, ছোলা, মুসুর ডাল—এসব প্রতিদিনের মেনুতে থাকা অপরিহার্য।
শুধু কার্বোহাইড্রেট নয়, ডায়াবেটিস রোগীর প্রোটিন প্রয়োজন আরও বেশি। প্রোটিন রক্তে শর্করা বাড়ায় না বরং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে। ডিম, মাছ, মুরগি, টোফু, ডাল ও লো–ফ্যাট দই—এসব প্রোটিনের অসাধারণ উৎস। তবে লাল মাংস বা অতিরিক্ত ফ্যাটযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। অনেকেই ভাবেন ফ্যাট মানেই ক্ষতি, কিন্তু বাস্তবে কিছু ফ্যাট ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। বাদাম, আখরোট, চিয়া ও ফ্ল্যাক্সসিড, অ্যাভোকাডো, অলিভ অয়েল এবং সরষের তেল শরীরে ভালো চর্বি যোগ করে, যা ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায়।
খাবারের প্লেট কীভাবে সাজানো হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক ডায়াবেটিস কেয়ারের অন্যতম সহজ নিয়ম হল প্লেট মেথড। এতে প্লেটের অর্ধেক থাকে শাকসবজি, এক–চতুর্থাংশ প্রোটিন, আর বাকি এক–চতুর্থাংশ কম GI–যুক্ত কার্বোহাইড্রেট। প্রতিটি খাবারের সঙ্গে স্যালাড রাখলে হজম ভালো হয় এবং গ্লুকোজের ওঠানামা কমে। একই সঙ্গে খাবারের সময় নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ—একই দিনে দীর্ঘ ব্যবধান রেখে বেশি খেলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে। বরং কম কম করে বারবার খাওয়া উত্তম।
সকালের জলখাবার কে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অনেকেই নাশতা বাদ দেন, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বিপজ্জনক। খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজ ওঠানামা করে, অ্যাসিডিটি বাড়ে এবং পরের খাবারের ওপর চাপ পড়ে। সকালের নাশতায় ওটস–দই–চিয়া বীজ, সবজি–ডিম, বা দুইটি রুটি–ডাল–সবজি ভালো বিকল্প। দুপুরে ব্রাউন রাইস বা দুই রুটি সঙ্গে প্রচুর সবজি ও লিন প্রোটিন থাকা উচিত। বিকেলে একটি ফল, সঙ্গে বাদাম বা গ্রিন টি ভালো। রাতে অতিরিক্ত কার্ব না নিয়ে হালকা স্যুপ, সবজি এবং ১–২ রুটি যথেষ্ট।
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যতালিকায় কিছু নিষিদ্ধ অংশ থাকে—চিনি, মিষ্টি, মিষ্টির চা–কফি, লুচি–পরোটা, কোল্ড ড্রিংক, প্যাকেট জুস, ভাজাভুজি, পাঁউরুটি, এবং অতিরিক্ত আলুভিত্তিক খাবার অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত। কারও কারও ক্ষেত্রে ফল খাওয়ার সময়ও নিয়ন্ত্রণ জরুরি—ভালোলাগার কারণে যদি একসঙ্গে দুটি–তিনটি ফল খাওয়া হয়, গ্লুকোজ বাড়বেই।
জলপানের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। প্রতিদিন পর্যাপ্ত জল না খেলে রক্ত ঘন হয় এবং গ্লুকোজের ওঠানামা বাড়ে। তাই দিনে কমপক্ষে ৮–১০ গ্লাস জল প্রয়োজন। অনেকেই খাবারের সঙ্গে জল পান করেন—এটি খাবারের পর গ্লুকোজের গতি বাড়ায়। বরং খাবারের ৩০ মিনিট আগে এবং ৩০ মিনিট পরে জলপান করা ভালো।
ওজন যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়তে থাকে। তাই খাদ্যের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪০ মিনিট হাঁটা, হালকা যোগাভ্যাস, প্রণায়াম এবং সপ্তাহে দুবার স্ট্রেন্থ ট্রেনিং রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে দুর্দান্ত কাজ করে। যারা অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন, তাদের প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৩ মিনিট দাঁড়ানো বা হাঁটার অভ্যাস করা উচিত।
টাইপ–টু ডায়াবেটিস কোনো ভয়ানক রোগ নয়—শুধু অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে এটিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিয়েও সুস্থ থাকা সম্ভব করে তুলতে। সঠিক খাদ্য, শৃঙ্খলিত জীবনযাত্রা, পরিমিত ব্যায়াম, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত চেক–আপ—এই পাঁচের মিশ্রণেই রক্তে শর্করা স্থিতিশীল থাকে। নিজের খাবারের তালিকা সচেতনভাবে সাজানোই ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রথম পদক্ষেপ এবং সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই প্রতিদিনের প্লেটটি অর্ধেক সবজি, এক–চতুর্থাংশ প্রোটিন এবং এক–চতুর্থাংশ কম GI–কার্ব দিয়ে তৈরি করার অভ্যাসই হতে পারে আপনার দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি।