প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার মাটির সঙ্গে, নদীর সঙ্গে, কৃষকের ঘামের সঙ্গে মিশে আছে এক অনন্য উৎসব নবান্ন। এই উৎসব কেবলমাত্র নতুন ধান কাটার আনন্দ নয়, এটি এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক এবং অর্থনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। মাঠ থেকে যখন প্রথম ধানের শীষ ঘরে আসে, তখনই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় নতুন ধানের ভাতের গন্ধে ভরা উৎসব নবান্ন। প্রকৃত অর্থে, এটি কৃষির উৎসব, কৃতজ্ঞতার উৎসব, মাটির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের উৎসব।
নবান্নের উৎস ও ইতিহাস:
‘নবান্ন’ শব্দটি এসেছে দুটি বাংলা শব্দ থেকে— “নব” অর্থাৎ নতুন, এবং “অন্ন” অর্থাৎ খাদ্য বা ধান। প্রাচীনকাল থেকেই কৃষিনির্ভর সমাজে ফসল ঘরে তোলার পর দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হত। বৈদিক যুগে ‘অন্নপূর্ণা’, ‘ক্ষেত্রেশ্বরী’, ‘ইন্দ্র’ এবং ‘অন্নদাতা দেবতা’র উদ্দেশে যজ্ঞ হত নতুন ফসলের প্রথম দান দিয়ে। সেই ধারা থেকেই আজকের নবান্নের রীতি।
বাংলার রাজবাড়ি থেকে সাধারণ কৃষকের কুঁড়েঘর সর্বত্রই এক সময় নবান্নের দিন পালন করা হত। ইতিহাসবিদদের মতে, পাল যুগে নবান্ন ছিল রাজোৎসবের অন্যতম অঙ্গ। কৃষকরা নতুন ধানের প্রথম দানা রাজাকে উৎসর্গ করত। আবার বৌদ্ধ সাহিত্যে ও মঙ্গলকাব্যে নবান্নের উল্লেখ পাওয়া যায় দেবী লক্ষ্মী ও মা অন্নপূর্ণার পুজোয় নতুন ধান অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হত।
নবান্নের সময়কাল ও তাৎপর্য:
বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, কার্তিক মাসের শেষ বা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিকেই নবান্ন উৎসব পালিত হয়। অগ্রহায়ণ মাসকেই বাংলায় বলা হয় ‘নব ধানের মাস’। কৃষকের ঘরে তখন ফসল ঘরে তোলার আনন্দ, ঘরে ঘরে রান্না হচ্ছে নতুন ধানের পিঠে-পায়েস, বউ-ঝিরা সাজছে নতুন কাপড়ে। বাংলার ছেলেমেয়েরা জানে, অগ্রহায়ণের হিমেল সকালে বাতাসে মিশে থাকে নতুন ধানের গন্ধ এই সুবাসই নবান্নের আসল মাদকতা।
নবান্ন কেবলমাত্র কৃষকদের উৎসব নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ। নতুন ধান মানেই নতুন আশা, নতুন বছর, নতুন প্রেরণা। তাই বলা যায়, নবান্ন হল জীবনের নবায়নের উৎসব।
গ্রামীণ বাংলায় নবান্ন উদ্যাপন:
গ্রামের মাঠে যখন ধান কাটার ধুম পড়ে, তখন থেকেই শুরু হয় নবান্নের প্রস্তুতি। নতুন ধান শুকিয়ে, মাড়াই করে, কলায় চিড়া-পিঠে তৈরির আয়োজন চলে।
নবান্নের সকালে প্রথমেই কৃষক পরিবার মায়ের পায়ে ধান ছুঁইয়ে আশীর্বাদ নেয়। তারপর ঘরে ঘরে রান্না হয় ‘নতুন ভাত’, ‘পায়েস’, ‘পিঠে’— বিশেষ করে ‘চিতই’, ‘পাতিসাপটা’, ‘পুলি’, ‘দুধপুলি’ বা ‘গোকুল পিঠে’। অনেক জায়গায় নতুন ধান দিয়ে তৈরি চিড়া-মুড়ির সঙ্গে গুড় ও দুধ মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।
দিনভর গ্রামে চলে গান, নাচ, যাত্রা, আলপনা প্রতিযোগিতা যেন এক উৎসবমুখর মেলা। কোথাও বা দেবী লক্ষ্মীর পুজো হয়, কারণ নবান্ন মানেই মা লক্ষ্মীর আগমন। গ্রামীণ সমাজে নবান্ন তাই শুধু পেটভরার আনন্দ নয়, এটি মাটির দেবীর প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ।
নবান্নের সঙ্গে জড়িত লোকগাথা ও সংস্কৃতি:
বাংলা লোকগান, পালাগান, কবিগান সবেতেই নবান্নের ছোঁয়া রয়েছে। কৃষক যখন মাঠে ধান কাটে, তখন সে গেয়ে ওঠে
> “ধান কাটো রে ভাই, অন্নদাতা মা হাসে,
নতুন অন্নে ভরে উঠবে আমাদের আস্তে।”
বাংলার লোককথায় বলা হয়, নবান্নের সময় মা অন্নপূর্ণা ধানের শীষে আশীর্বাদ দেন— যেন পরের বছর আরও বেশি ফসল হয়। গ্রামীণ বাউল, ফকির, কবিরাও নবান্নের মাহাত্ম্য গানে গানে প্রকাশ করেছেন। এই উৎসবের মাধ্যমে মানুষের মনেও জন্ম নেয় সহযোগিতা, মিলন, এবং আনন্দের অনুভূতি।
শহুরে বাংলায় নবান্ন : ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ
শহরের কংক্রিটের ভিড়ে আজও হারিয়ে যায়নি নবান্ন। অনেক পরিবারেই আজও অগ্রহায়ণ মাসে নতুন চাল দিয়ে ‘নতুন ভাত’ রান্না হয়। পিঠে-পায়েসের সঙ্গে চলে পারিবারিক মিলনমেলা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ২০০৬ সাল থেকে রাজ্যজুড়ে “নবান্ন উৎসব” পালন শুরু করেছে। জেলার কৃষি দপ্তর, পঞ্চায়েত, এবং সংস্কৃতি দপ্তর মিলিয়ে চলে উৎসবের আয়োজন যেখানে স্থানীয় শিল্পীরা গান, নাচ, নাটক পরিবেশন করেন, কৃষিপণ্য বিক্রি হয়, এবং কৃষকরা তাদের ফসল প্রদর্শন করেন। এটি একদিকে কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরে, অন্যদিকে লোকসংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবেও কাজ করে।
নবান্ন ও খাদ্যসংস্কৃতি:
নবান্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার খাদ্য ঐতিহ্য। নতুন ধান দিয়ে তৈরি চিড়া, মুড়ি, পিঠে, পায়েস সবই এই সময়ের বিশেষ পদ। কিছু জনপ্রিয় নবান্ন পদ হলো:
নতুন চালের ভাত ও আলু-পোস্ত
খেজুর গুড়ের পায়েস
দুধপুলি ও গোকুল পিঠে
চিড়া ও গুড়ের মিশ্রণ (নাড়ু)
চালকুমড়োর পিঠে, পাটিসাপটা, সন্দেশ
এইসব রান্নার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির দানকে শ্রদ্ধা জানায়। মাটির গন্ধ, ধানের সুবাস, গুড়ের মিষ্টতা সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য রসনাত্মক উৎসব।
নবান্ন ও দেবী অন্নপূর্ণার আরাধনা:
নবান্নের দিন অনেক বাড়িতেই মা লক্ষ্মী বা মা অন্নপূর্ণার পুজো হয়। দেবীর উদ্দেশে নতুন ধান, গুড়, দুধ, কলা, ফলাদি নিবেদন করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই পুজোয় দেবী অন্নপূর্ণা সন্তুষ্ট হলে বছরভর ঘরে অন্নের অভাব হয় না।অন্নপূর্ণা মানেই জীবনধারণের মূল প্রতীক। তাই নবান্নে এই দেবীর আরাধনা মানুষের অন্তরের এক কৃতজ্ঞতার প্রকাশ প্রকৃতির প্রতি, মাটির প্রতি, এবং সেই অন্নদাতা শক্তির প্রতি।
আধুনিক প্রেক্ষিতে নবান্নের প্রাসঙ্গিকতা:
আজকের দিনে, যখন মানুষ কৃষির সঙ্গে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন নবান্ন উৎসবের তাৎপর্য আরও বেড়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মাটি ছাড়া, কৃষি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা বা অতিবৃষ্টির কারণে যখন কৃষক সংকটে পড়ে, তখন নবান্ন উৎসব সমাজকে একত্রে আসার বার্তা দেয় কৃষকের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। শহরাঞ্চলে এই উৎসবকে পুনরুজ্জীবিত করা মানে শিশুদের শেখানো, কীভাবে একটি দানার পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত শ্রম ও প্রকৃতির দান।
সংস্কৃতির ধারক হিসেবে নবান্ন:
নবান্ন শুধু কৃষি বা খাদ্য নয়, এটি বাংলার সমষ্টিগত সংস্কৃতির প্রতীক। এই উৎসবের মধ্যে আছে
সাহিত্য ও গান (লোকগীতি, কবিতা, বাউলসঙ্গীত)
নৃত্য ও নাট্য (গ্রামীণ যাত্রা, পালাগান)
হস্তশিল্প ও রান্না (ধানের মোড়া, মাটির হাঁড়ি, নতুন চালের পদ)
আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মবিশ্বাস এইসব মিলিয়ে নবান্ন হল এক পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিক আয়োজন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে চলে।
নবান্নের উৎসব আমাদের শেখায় জীবন মানেই নবায়ন। পুরনো ফসল কাটার পর যেমন মাটিতে নতুন বীজ বোনা হয়, তেমনি মনেও জাগে নতুন আশার বীজ। নতুন ধানের সুবাসে বাংলার বাতাস ভরে ওঠে, মানুষের মুখে ফুটে ওঠে হাসি, মাটির সঙ্গে গড়ে ওঠে অনন্ত বন্ধন। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজেও নবান্ন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা সকলেই মাটির সন্তান। তাই নবান্নের এই গন্ধ, এই স্বাদ, এই আনন্দ শুধু গ্রামবাংলার নয়, এটি সমগ্র বাংলার উৎসব, মাটির সঙ্গে জীবনের উৎসব।
নবান্নের সুবাসে বাংলার প্রতিটি প্রান্তে জেগে ওঠে নতুন প্রাণ, নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশা। মাটির এই উৎসব শুধু খাদ্যের নয় এটি জীবনের, ঐতিহ্যের, আর আত্মার মিলনের প্রতীক।
> “নব অন্নে নব প্রাণে, বাংলার উৎসব গান
মাটির গন্ধে মেশে সুখ, নবান্নে জাগে প্রাণ।”