19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

অ্যাজমার উপশমে!

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


অ্যাজমা একটি দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, যা শ্বাসনালীতে প্রদাহ এবং সংকোচনের কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষত শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে। অ্যাজমার প্রকোপে শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুক জ্বালা এবং হুঁশফাঁসের সমস্যা দেখা দেয়। যদিও এটি সম্পূর্ণরূপে নিরাময়যোগ্য নয়, তবে সঠিক জীবনধারা, চিকিৎসা এবং প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বন করে অ্যাজমার উপশম সম্ভব।


অ্যাজমার কারণ ও লক্ষণ


অ্যাজমার প্রকৃত কারণ সম্পূর্ণরূপে জানা যায়নি, তবে এটি মূলত জিনগত প্রবণতা ও পরিবেশগত উদ্দীপকের সংমিশ্রণে হয়। প্রধান কারণগুলো হলো:


পরিবেশগত কারণ: ধুলো, ধোঁয়া, ধুলোবালি, ধূমপান বা শিল্পধোঁয়া।


আবহাওয়া পরিবর্তন: ঠান্ডা, গরম বা আর্দ্রতার পরিবর্তনে শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়।


এলার্জি: যেমন পরাগকণিকা, ঘরোয়া ধুলো, পশুর লোম বা দুধ।


জীবনধারা: ধূমপান, অপ্রতিষ্ঠিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ।



অ্যাজমার প্রধান লক্ষণগুলো হলো:


শ্বাসকষ্ট বা হুঁশফাঁস


বারবার কাশি বিশেষত রাতে বা সকালের সময়


বুকে চাপ বা জ্বালা অনুভব


শারীরিক পরিশ্রমে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট



অ্যাজমার চিকিৎসা ও ওষুধ


অ্যাজমার চিকিৎসা মূলত দুই প্রকারের ওষুধের মাধ্যমে হয়:


1. রিলিভার (Reliever) ওষুধ: এগুলো অ্যাজমার অ্যাটাকের সময় দ্রুত শ্বাসনালী খোলার কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন: স্যালবিউটামল ইনহেলার।



2. কন্ট্রোলার (Controller) ওষুধ: দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: ইনহেলড কর্টিকোস্টেরয়েড, লিউকোট্রিয়েন রিসেপ্টর অ্যান্টাগোনিস্ট।


চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই ওষুধের সঠিক ব্যবহার ও নিয়মিত মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় রোগীর জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক উপায়ও সহায়ক হয়।


জীবনধারার পরিবর্তন ও অ্যাজমার নিয়ন্ত্রণ


অ্যাজমার উপশমে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অপরিহার্য। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:


1. পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ:


ঘর পরিষ্কার ও ধূলোমুক্ত রাখা


ধূমপান ও ধোঁয়া এড়ানো


পরাগকণিকা ও এলার্জেন কমানো


2. নিয়মিত ব্যায়াম ও যোগব্যায়াম:


ধীর শ্বাসনালী প্রশিক্ষণ


হালকা ব্যায়াম যেমন হেঁটে চলা, সাঁতার


যোগব্যায়াম ও প্রানায়াম শ্বাসপ্রশ্বাসকে শক্তিশালী করে


3. সুষম খাদ্যাভ্যাস:


ভিটামিন C ও E সমৃদ্ধ ফলমূল


ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ


প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চর্বি কমানো



4. মানসিক চাপ কমানো:


ধ্যান, প্রার্থনা বা মাইন্ডফুলনেস


পর্যাপ্ত নিদ্রা ও বিশ্রাম



প্রাকৃতিক উপায়ে অ্যাজমার উপশম


ঐতিহ্যগত ও প্রাকৃতিক চিকিৎসাও অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু কার্যকর প্রাকৃতিক উপায় হলো:


1. গরম জল ও আদা চা:


আদা, হলুদ এবং লেবুর সংমিশ্রণে তৈরি গরম জল বা চা শ্বাসনালী প্রশমিত করে।




2. মধু ও দারুচিনি:


প্রতিদিন এক চামচ মধু এবং সামান্য দারুচিনি কাশি ও শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।




3. প্রাণায়াম ও শ্বাসনালী ব্যায়াম:


ধীর ও গভীর শ্বাস নেয়া, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া এবং মুখ দিয়ে ছাড়ার ব্যায়াম।


‘ব্রেইথিং ব্যায়াম’ বা পুরাতন হিন্দু যোগব্যায়াম পদ্ধতি প্রমাণিতভাবে অ্যাজমার উপশমে কার্যকর।




4. হোমিওপ্যাথিক ও আয়ুর্বেদিক সমাধান:


আয়ুর্বেদে ধূপ, তেঁতুল, হলুদ, তুলসী পাতা প্রয়োগ করা হয় শ্বাসনালী প্রশমনে।


হোমিওপ্যাথিক ডোজ ও চিকিৎসকের পরামর্শে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর।




5. নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন:


পর্যাপ্ত জলপান, ঘুম, শ্বাস-ব্যায়াম এবং মানসিক স্থিরতা অ্যাজমার প্রকোপ কমায়।





শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন


শিশু এবং বৃদ্ধরা অ্যাজমার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণী।


শিশুদের ক্ষেত্রে ধূলা, ধোঁয়া এবং এলার্জেন থেকে দূরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।


শিশুদের খেলাধুলা ও ব্যায়াম নিয়মিত করা প্রয়োজন, তবে অতিরিক্ত exertion এড়ানো।


বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে শ্বাসনালীকে সুস্থ রাখার জন্য ধীর, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত জলপান এবং ওষুধ নিয়মিত নেওয়া জরুরি।



অ্যাজমা ও আধুনিক গবেষণা


গত কয়েক দশকে গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যাজমা শ্বাসনালীর প্রদাহজনিত রোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে


ফুসফুসের কার্যকারিতা বৃদ্ধি


প্রদাহ কমানো


জীবনধারার নিয়ন্ত্রণ



এর মাধ্যমে রোগীর দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। নতুন ইনহেলার ও দীর্ঘমেয়াদী কন্ট্রোলার ওষুধ রোগীর শ্বাসনালীকে প্রশমিত রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, প্রাকৃতিক ও জীবনধারাগত সমাধান সংমিশ্রণে রোগীর দৈনন্দিন জীবনের মানোন্নয়ন সম্ভব।


অ্যাজমা সম্পূর্ণরূপে নিরাময়যোগ্য না হলেও, সঠিক চিকিৎসা, জীবনধারার পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সমাধানের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। রোগী এবং পরিবারের সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক প্রশান্তি এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ—এগুলো মিলিত হলে অ্যাজমার উপশম সম্ভব।


বাংলায় বলা যায়, “প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নই বড় সুস্থতা নিশ্চিত করে।” অ্যাজমার ক্ষেত্রে এটি সত্যি। স্বাস্থ্য সচেতনতা, ওষুধের সঠিক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতির সংমিশ্রণই রোগীর জীবনকে স্বাভাবিক, আরামদায়ক ও আনন্দময় করে।


অ্যাজমার উপশম শুধুমাত্র শারীরিক নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। সঠিক যত্ন ও সচেতনতার মাধ্যমে রোগী পূর্ণ সম্ভাব্য জীবন উপভোগ করতে পারে, শ্বাসকষ্টের ভয় ছাড়াই।

Archive

Most Popular