স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
আজকের যুগে আমরা যতই “বডি পজিটিভিটি” বা “নিজেকে ভালোবাসা” নিয়ে কথা বলি না কেন, বাস্তবে সমাজ এখনো শিশুর শরীরকে বিচার করতে ভালোবাসে। কারো গাল গোল, কেউ একটু মোটা, কেউ আবার খুপরি মতো রোগা এইসব মন্তব্য আমাদের চারপাশে খুবই সাধারণ। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই মন্তব্যগুলো একটি ছোট্ট শিশুর মনের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে? “তুই তো মোটা হয়ে যাচ্ছিস”, “এই পোশাকটা তোর গায়ে মানায় না”, “খুব চিকন, তুই কিছু খাস না?” এই কথাগুলো আমরা অনেক সময় অজান্তে বলি। কিন্তু শিশুর কানে এগুলো গিয়ে তার আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত একসময় তাকে ভেতরে ভেতরে অসুখী করে তোলে, তৈরি করে আত্মবিশ্বাসহীন এক প্রজন্ম।
বডি শেমিং বলতে বোঝায় কারও শরীর নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, উপহাস করা, তুলনা করা বা শরীরের আকার, গঠন, রঙ ইত্যাদি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা। এটি শুধুমাত্র শব্দের মাধ্যমে নয়, আচরণের মাধ্যমেও হতে পারে যেমন শিশুর সামনে অন্য কারও শরীরের সঙ্গে তার তুলনা করা, বা তাকে নির্দিষ্ট পোশাক পরতে নিরুৎসাহিত করা ইত্যাদি। শিশুর ক্ষেত্রে এটি আরও মারাত্মক, কারণ তার মন তখনো গঠনের পর্যায়ে থাকে। বড়দের মতো আত্মবিশ্বাস বা আত্মবিশ্লেষণ ক্ষমতা তার মধ্যে থাকে না। ফলে, সে নিজেকে “অপর্যাপ্ত” বা “অগ্রহণযোগ্য” মনে করতে শুরু করে।
বডি শেমিং মূলত সমাজের তৈরি করা “আদর্শ সৌন্দর্যের ধারণা” থেকে আসে। ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখে আসি
ফর্সা মানেই সুন্দর
পাতলা মানেই স্বাস্থ্যকর
উঁচু লম্বা গড়ন মানেই আকর্ষণীয়
মেয়ে হলে কোমর চিকন হতে হবে
ছেলে হলে পেশিবহুল শরীর হতে হবে
এই সামাজিক চাপে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, এমনকি শিক্ষক-বন্ধুরাও অজান্তে সন্তানের শরীর নিয়ে মন্তব্য করতে শুরু করেন। কখনো “ভালো চাওয়ার” অজুহাতে, কখনো বা নিছক রসিকতা করতে গিয়ে। কিন্তু এই “মজার ছলে” বলা কথাগুলোই একেকটা বিষবীজের মতো শিশুর মনে গেঁথে যায়।
সবচেয়ে প্রথম যে জায়গায় একটি শিশু নিজেকে নিয়ে সচেতন হতে শেখে, সেটি তার পরিবার। তাই যদি বাবা-মা বা দাদা-দিদি, মামা-খুড়োরা তার শরীর নিয়ে হাসাহাসি করেন, তবে সেটিই তার আত্মবিশ্বাস ভাঙার সূচনা।
যেমন
“তুই তো এখনো বাচ্চা, একটু খাস না? এত চিকন দেখাচ্ছে!”
“তুই তো মেয়েদের মতো মোটা হচ্ছিস, ছেলে হয়ে লজ্জা কর না?”
“এই পোশাকটা পরিস না, তোকে আরও মোটা দেখাবে।”
এ ধরনের মন্তব্যে শিশু ধীরে ধীরে নিজের শরীরকে ঘৃণা করতে শেখে। সে মনে করে, তার শরীর মানহীন বা অগ্রহণযোগ্য। আর এই চিন্তাধারা কৈশোরে গিয়ে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
বিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে শিশুরা নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেতে শুরু করে। কিন্তু এখানেই অনেক সময় শুরু হয় ‘বুলিং’। স্কুলের সহপাঠীরা অনেক সময় রসিকতার ছলে, আবার অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও শরীর নিয়ে ঠাট্টা করে
“এই, তুই তো হাতি!”
“চিকন কাঠি!”
“কালো মেয়ে, ফর্সা লোশন ব্যবহার কর না?”
এই ধরণের কথা প্রতিদিন শুনতে শুনতে শিশু নিজেকে সমাজের বাইরে অনুভব করে। সে নিজের শরীর ঢেকে রাখতে চায়, মেলামেশা এড়িয়ে চলে, এমনকি স্কুলে যেতে অনীহা বোধ করে। অনেক সময় এ ধরনের বডি শেমিং-ই পরবর্তীতে ডিপ্রেশন, অ্যানজাইটি, বা খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কিত অসুস্থ অভ্যাস (Eating Disorder) তৈরি করে।আজকের দিনে টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন শিশুর মানসিক গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখে। টেলিভিশনে বা ইউটিউবে দেখা যায় হিরো-হিরোইনদের শরীরের নিখুঁত গঠন, উজ্জ্বল ত্বক, লম্বা চুল, ছিপছিপে কোমর। শিশুরা সেই আদর্শকেই নিজের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে। তারা ভাবে, “আমি যদি এরকম না হই, তাহলে আমি সুন্দর নই।” এর ফলে তারা অপ্রয়োজনীয় ডায়েটিং শুরু করে, অযথা কসমেটিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আত্মঘৃণায় ভোগে।
বারবার নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য শুনলে শিশু বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে যথেষ্ট নয়। এই ‘ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স’ তার আত্মসম্মানবোধকে ভেঙে দেয়।
নিজেকে ঘৃণা করার প্রবণতা তৈরি হয়। সে নিজের শরীর ঢেকে রাখতে চায়, আয়নায় তাকাতে ভয় পায়, কিংবা ছবি তুলতে চায় না।
বডি শেমিং-এর শিকার শিশুরা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে চায় না। তারা মনে করে, সবাই তাদের নিয়ে হাসবে। ফলে তারা একা হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে মানসিক রোগের রূপ নিতে পারে।
বডি শেমিং প্রায়ই “ইটিং ডিসঅর্ডার”-এর কারণ হয়। কেউ কেউ অতিরিক্ত খাওয়া বন্ধ করে দেয় (Anorexia), আবার কেউ মানসিক চাপের কারণে অতিরিক্ত খাওয়া শুরু করে (Binge Eating)।
বডি শেমিং দীর্ঘদিন চললে তা ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, এমনকি আত্মহত্যার চিন্তারও জন্ম দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হলো “বডি ইমেজ ডিসস্যাটিসফ্যাকশন”।
“তুই খুব মোটা”, “তোর ওজন বেড়েছে” এরকম কথা না বলে বলা যেতে পারে, “চল আমরা একসাথে একটু এক্সারসাইজ করি”, বা “চল হেলদি খাবার খাই”। ভাষা বদলালে মানসিকতা বদলায়।
শিশু শোনে ও শেখে। তাই বাবা-মা নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলে, সন্তানও সেই মানসিকতা গ্রহণ করে। “আমি মোটা হয়ে গেছি” বলার বদলে বলুন “আমি একটু ফিট হতে চাই”।
“ওর মতো চিকন হলে ভালো লাগতো” এ ধরনের তুলনা শিশুর মধ্যে অযথা চাপ তৈরি করে। প্রতিটি শরীরই আলাদা এবং সুন্দর এই ধারণা ছোটবেলা থেকেই বোঝানো জরুরি।
শরীর নিয়ে লজ্জা নয়, বরং নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া শেখাতে হবে। হেলদি খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা এগুলোকেই “বিউটি স্ট্যান্ডার্ড” হিসেবে শেখাতে হবে।
শিশুরা আত্মবিশ্বাস পায় যখন তারা পরিবারের ভালোবাসা অনুভব করে। তার চেহারা নয়, তার গুণাবলি ও পরিশ্রমের প্রশংসা করুন।
শিক্ষকরা ক্লাসে বা অ্যাসেম্বলিতে বডি শেমিং নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন। “সব শরীরই সুন্দর” এই ধারণা শিশুদের মনে গেঁথে দিতে হবে।
স্কুলে কঠোরভাবে বুলিং বিরোধী নীতি থাকা দরকার। কেউ যদি অন্যের শরীর নিয়ে হাসাহাসি করে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিজ্ঞাপনে বা টেলিভিশনে “পারফেক্ট বডি”-র ধারণা ছড়ানো বন্ধ করা উচিত। বিভিন্ন ধরনের শরীর, রঙ, গঠন সবকিছুকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা দরকার।
কৈশোর এমন এক বয়স যখন শরীরে দ্রুত পরিবর্তন আসে। এই সময়ে বডি শেমিং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। কৈশোরে শিশুরা নিজেদের চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়।
তাই অভিভাবক ও শিক্ষক উভয়কেই তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে হবে।
“তোর শরীর বদলাচ্ছে, এটা স্বাভাবিক।”
“প্রত্যেকের শরীর আলাদা তুলনা করার কিছু নেই।”
এই কথাগুলো তাদের মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন তার গুণের প্রশংসা করুন যেমন, “তুই আজ খুব সুন্দর আঁকছিস”, “তুই খুব যত্নশীল বন্ধু”।
তাকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন পোশাক বেছে নেওয়া, খেলাধুলা বেছে নেওয়া এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
নিয়মিত কথোপকথন করুন সে স্কুলে কেমন বোধ করছে, কেউ কিছু বলছে কিনা তা জানতে চেষ্টা করুন।
পজিটিভ বডি রোল মডেল দেখান এমন মানুষদের গল্প বলুন যারা তাদের শরীর নিয়ে গর্বিত।
স্ক্রিন টাইম সীমিত করুন যেন সোশ্যাল মিডিয়ার “অবাস্তব সৌন্দর্যের চাপ” থেকে দূরে থাকে।
শরীরকে সম্মান করতে শেখান: “তোর শরীর তোর নিজের, সেটাকে ভালোবাসা মানে নিজেকে ভালোবাসা।”
রূপ নয়, গুণের প্রশংসা করুন: “তুই সাহসী”, “তুই পরিশ্রমী” এই প্রশংসা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য বোঝান: সব মানুষের গায়ের রঙ, চুল, গঠন আলাদা সেটাই মানবতার সৌন্দর্য।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করুন: “সব ছবি ফিল্টার করা হয়”, “বাস্তব জীবনে কেউ নিখুঁত নয়।”
এই সমস্যার সমাধান একা অভিভাবক বা শিক্ষকরা করতে পারবেন না। পুরো সমাজকে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলো যেন বিভিন্ন গঠনের মানুষদের উপস্থাপন করে।
মিডিয়া ও বিনোদন জগৎ যেন রঙ ও গঠনের বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিকভাবে দেখায়।
কমিউনিটি প্রোগ্রাম বা স্কুলে “বডি পজিটিভিটি ওয়ার্কশপ” আয়োজন করা উচিত।
সন্তানের বডি শেমিং কোনো সাধারণ “মজা” নয় এটি এক গভীর মানসিক সহিংসতা। একটি নেতিবাচক মন্তব্য শিশুর মনের ভেতর এমন ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। আমরা যদি চাই এক সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, ও মানসিকভাবে শক্ত প্রজন্ম গড়ে উঠুক, তবে এখনই আমাদের ভাষা ও মনোভাব বদলাতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে “তুই যেমন, তুই তেমনই সুন্দর।” কারণ সৌন্দর্য কোনো শরীরের মাপ নয় সৌন্দর্য হলো নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাসের আলো। সন্তান আমাদের ভবিষ্যৎ। তাকে যদি আমরা শেখাই নিজের শরীরকে ভালোবাসতে, তবে সে একদিন পৃথিবীকে ভালোবাসবে মানুষকে তাদের বাহ্যিক গঠন নয়, অন্তরের সৌন্দর্যে বিচার করবে। সেই দিনই প্রকৃত অর্থে আমরা “বডি পজিটিভ” সমাজ গড়ে তুলতে পারব।