প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
শীত মানেই ফ্যাশনের উৎসব। গরমের ক্লান্তি ও বর্ষার আর্দ্রতা পেরিয়ে যখন বাতাসে ঠান্ডা ছোঁয়া আসে, তখনই পোশাকের খেলায় নতুন ঋতুর সূচনা। এই সময়েই ফ্যাশনপ্রেমীদের চোখ চলে যায় বলিউড বা হলিউডের তারকাদের দিকে। তাদের পোশাক, সাজগোজ, এবং চলাফেরার ধরন যেন নতুন ট্রেন্ডের ইঙ্গিত দেয়। তাই এখনকার প্রজন্মের কাছে সেলিব্রিটি ফ্যাশন কেবল পোশাক নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও স্বকীয়তার পরিচয়।
সেলিব্রিটি স্টাইলের জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো তার ব্যক্তিত্ব। দীপিকা পাড়ুকোনের সৌন্দর্যে আছে প্রশান্ত সৌজন্য, আলিয়া ভাটের লুকে মিষ্টি চপলতা, করিনা কাপুর খান সবসময় গ্ল্যামার ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, আর বিদ্যা বালন প্রমাণ করেছেন যে ঐতিহ্যও হতে পারে আধুনিক ফ্যাশনের মুখ। এই তারকারা শুধু পোশাক পরেন না, বরং তাদের পোশাকের মাধ্যমেই নিজেদের গল্প বলেন। তাই আজকের দিনে “সেলিব্রিটি স্টাইল ইন্সপায়ার্ড উইন্টার ফ্যাশন” মানে কেবল অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব রুচিকে নতুনভাবে প্রকাশ করা।
দীপিকা পাড়ুকোনের শীতকালীন লুকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মিনিমাল এলিগ্যান্স। তিনি সাধারণত বেইজ, আইভরি বা ক্রিম রঙের কোটের সঙ্গে টার্টল নেক সোয়েটার ও লেদার প্যান্ট বেছে নেন। তাঁর স্টাইলে কখনও বাড়তি আড়ম্বর নেই, বরং আছে প্রশান্ত সৌন্দর্য। আপনি যদি দীপিকার মতো লুক পেতে চান, তবে পোশাকের রঙের সমন্বয় সরল রাখুন এবং চোখে বড় সানগ্লাস, হাতে ব্রাউন লেদার ব্যাগ নিন। এই লুক অফিস থেকে কফি ডেট—সব জায়গায় মানাবে দারুণভাবে।
অন্যদিকে আলিয়া ভাটের শীতকালীন স্টাইল পুরোপুরি ভিন্ন। তাঁর ফ্যাশনের মূলমন্ত্র “কমফোর্ট ইজ দ্য কিউটেস্ট।” আলিয়াকে প্রায়ই দেখা যায় প্যাস্টেল রঙের সোয়েটার, ডেনিম স্কার্ট ও থাই-হাই বুটে। এই লুকে রয়েছে একধরনের কিশোরী মেজাজ, যা তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। আলিয়ার মতো লুক পেতে হালকা রঙের সোয়েটার, বিউটি বিনি ক্যাপ এবং ক্রস-বডি ব্যাগ ব্যবহার করুন। মেকআপে রাখুন হালকা বেস, চোখে অল্প কাজল ও ঠোঁটে গোলাপি রঙের ছোঁয়া।
করিনা কাপুর খান সবসময়ই ছিলেন উইন্টার গ্ল্যামারের প্রতীক। তাঁর পোশাকে থাকে আভিজাত্য ও সাহসের মিশেল। কালো হাই নেক সোয়েটার, ওভারসাইজ ব্লেজার ও হাই বুটে তিনি একদিকে যেমন রুচিশীল, অন্যদিকে একইসঙ্গে আধুনিক। করিনার মতো লুক পেতে চাইলে পোশাকে রাখুন মনোক্রোম টোন, সঙ্গে গ্লসি লিপস্টিক ও স্মোকি আই মেকআপ। শহুরে সন্ধ্যা বা পার্টির জন্য এই গ্ল্যামারাস স্টাইল একেবারে উপযুক্ত।
অন্যদিকে বিদ্যা বালন সবসময় এথনিক ফ্যাশনের দূত। তিনি প্রমাণ করেছেন শীতেও শাড়ি হতে পারে অসাধারণ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। সিল্ক বা তসর শাড়ির সঙ্গে ফুলহাতা ব্লাউজ, উষ্ণ শাল ও অক্সিডাইজড গয়না তাঁর সাজের অপরিহার্য অংশ। এই এথনিক লুক অফিস পার্টি, পারিবারিক অনুষ্ঠানে বা পুজোর সময় দারুণ মানিয়ে যায়। বিদ্যার মতো লুক পেতে হলে উজ্জ্বল শাড়ির সঙ্গে সাধারণ ব্লাউজ ও রঙিন শাল জুড়ুন।
বিদেশে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তাঁর গ্লোবাল গ্ল্যামার দিয়ে শীতের রাস্তায় ফ্যাশনকে নতুন মানে দিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের রাস্তায় তাঁকে দেখা যায় বেল্টেড কোট, হাই বুট ও ট্রেন্ডি গ্লাভসে। তাঁর পোশাকে থাকে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রকাশ। প্রিয়াঙ্কার মতো গ্লোবাল লুক পেতে উজ্জ্বল রঙ বেছে নিন—রেড, বারগান্ডি বা রয়্যাল ব্লু। সঙ্গে থাকুক হ্যাট ও মেটালিক ব্যাগ।
এই সময়ের আরেক জনপ্রিয় মুখ মৃণাল ঠাকুর। তাঁর ফ্যাশনে স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায় সাস্টেইনেবল বা ইকো-ফ্রেন্ডলি চিন্তা। তিনি প্রায়ই হ্যান্ডক্রাফটেড উলের সোয়েটার বা খadi শাল পরেন। তাঁর পোশাক শুধু ফ্যাশনের নয়, পরিবেশ সচেতনতার প্রতীকও বটে। তাই এই শীতে আপনি যদি ট্রেন্ডি অথচ সাস্টেইনেবল লুক চান, মৃণালের মতো প্রাকৃতিক রঙ ও স্থানীয় কাপড় বেছে নিন।
রানী মুখার্জির ফ্যাশন আবার অন্য ধারার। তাঁর পোশাকে থাকে একধরনের কালজয়ী সরলতা। উলের শাড়ি বা নিটেড কুর্তার সঙ্গে মুক্তোর দুল ও লেদার বুট—এই সহজ সাজে তিনি একদিকে ঐতিহ্যবাহী, অন্যদিকে অত্যন্ত আভিজাত্যপূর্ণ। রানীর মতো লুক পেতে আপনি চুল খোলা রাখতে পারেন এবং চোখে হালকা কোল লাগিয়ে নিতে পারেন—স্নিগ্ধতা বাড়বে অনেকগুণ।
শীতের ফ্যাশনে শুধু নারীরা নয়, পুরুষ তারকারাও সমান অনুপ্রেরণাদায়ক। রণবীর সিংয়ের রঙিন কোট, ভিকি কৌশলের মনোক্রোম টার্টল নেক, কিংবা আয়ুষ্মান খুরানার ক্লাসিক ব্লেজার—সবই এই শীতের ট্রেন্ডে জায়গা করে নিয়েছে। যারা অফিসে বা আড্ডায় ফ্যাশনেবল অথচ সিম্পল থাকতে চান, তারা নিট সোয়েটারের সঙ্গে ডেনিম ও লেদার জ্যাকেট পরে নিতে পারেন।
বাংলার শীতেও সেলিব্রিটি ফ্যাশনের ছোঁয়া আনতে পারেন স্থানীয় ভাবনায়। একটি উলের দোপাট্টা, হ্যান্ডলুম শাড়ি বা হাতে বোনা সোয়েটার—এগুলোকেই নতুনভাবে মেলাতে পারেন তারকাদের স্টাইলের সঙ্গে। উদাহরণস্বরূপ, দীপিকার বেইজ কোটের সঙ্গে আপনি ব্যবহার করতে পারেন স্থানীয় হ্যান্ডক্রাফটেড শাল, অথবা বিদ্যার এথনিক লুককে আরও ঘরোয়া করতে পারেন বালুচরী বা কাঁথা শাড়িতে। এতে আপনি যেমন স্টাইলিশ দেখাবেন, তেমনি স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতিও থাকবে ভালোবাসা।
শীতের ফ্যাশন সম্পূর্ণ হয় সঠিক মেকআপ ও অ্যাকসেসরিজে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় গাঢ় রঙের লিপস্টিক যেমন বারগান্ডি বা প্লাম ট্রেন্ডে রয়েছে। চোখে হালকা স্মোকি আই, গালে অল্প ব্লাশ আর চুলে ঢেউ খেলানো ছোঁয়া—সব মিলিয়ে তৈরি হবে তারকাদের মতো উজ্জ্বল শীতকালীন সাজ। সঙ্গে নিতে পারেন উলের গ্লাভস, স্কার্ফ এবং হাঁটু-লম্বা বুট।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজেটের ভিতরেই এই সেলিব্রিটি স্টাইলকে নিজের মতো করে তৈরি করা। ফ্যাশন মানে দামি পোশাক নয়, বরং সৃজনশীলতা। স্থানীয় ডিজাইনারদের তৈরি পোশাক বেছে নিন, পুরনো কোটে নতুন বেল্ট দিন, কিংবা শাড়ির দোপাট্টা দিয়ে বানিয়ে ফেলুন স্কার্ফ—এভাবেই তৈরি হবে আপনার নিজস্ব “উইন্টার গ্ল্যাম।”
তবে মনে রাখতে হবে, সেলিব্রিটি ফ্যাশন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া মানে অন্ধ অনুকরণ নয়। নিজের শরীরের গঠন, ত্বকের রঙ এবং ব্যক্তিত্ব বুঝে পোশাক বেছে নেওয়া দরকার। দীপিকার লুকে আপনার এলিগ্যান্স থাকুক, কিন্তু রঙ হোক আপনার পছন্দের। করিনার গ্ল্যামার অনুসরণ করুন, তবে মেকআপে রাখুন নিজের স্বাচ্ছন্দ্য।
সবশেষে বলা যায়, সেলিব্রিটি স্টাইল ইন্সপায়ার্ড ফ্যাশন মানে শুধু পোশাক নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। এই শীতে তারকাদের স্টাইল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের মতো করে সাজে ভরিয়ে তুলুন প্রতিদিনকে। আপনার পোশাকই বলুক—আপনি যেমন অনুভব করছেন, তেমনি উজ্জ্বল। কারণ সত্যিকারের স্টাইল কখনও কেবল ট্রেন্ড নয়, বরং নিজেকে ভালোবাসার এক সুন্দর উপায়।
এই শীতে তাই দীপিকার স্নিগ্ধতা, করিনার গ্ল্যামার, বিদ্যার ঐতিহ্য আর আলিয়ার রঙিন মেজাজ মিলিয়ে গড়ে তুলুন নিজের গল্প। আত্মবিশ্বাসই হোক আপনার সবচেয়ে বড় অ্যাকসেসরিজ। কারণ যে নারী নিজের রূপে বিশ্বাস রাখেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে ফ্যাশন আইকন।