19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

শখ করে পায়ে কালো সুতো বেঁধেছেন? এতে ভালো না হয়ে খারাপও হতে পারে!

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, লোকাচার আর আধ্যাত্মিকতার মাঝখানে ‘কালো সুতো’ এক অদ্ভুত স্থান দখল করে আছে। অনেকেই মনে করেন, হাতে-পায়ে কালো সুতো বেঁধে রাখলে নেগেটিভ এনার্জি দূরে থাকে, অশুভ শক্তি বাধা দিতে পারে না, দৃষ্টি বিশেষত বদনজর থেকে মুক্তি মেলে। এই বিশ্বাস নতুন নয়; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকসংস্কৃতির গভীরে এ ধারণা বোনা আছে। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ও চিকিৎসাবিদ্যার পরামর্শে প্রশ্ন তুলছে এই অভ্যাস কি সত্যিই নিরাপদ? শখ করে পায়ে কালো সুতো বাঁধা কি কখনও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে?

প্রথমত, আমরা বুঝে নিতে পারি মানুষ কেন কালো সুতো বেঁধে রাখে। লোকবিশ্বাসে কালো রংকে সাধারণত আলোকের বিপরীত শক্তি শোষণকারী রং হিসেবে দেখা হয়। এই রং নাকি খারাপ শক্তিকে শোষণ করে, পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখে, এমনকি শিশুরাও এর দ্বারা নাকি সুরক্ষিত থাকে। গ্রামবাংলার আঙিনায় ছোটদের হাতে-পায়ে কালো দড়ি, কালো কালি বা টিপ দেওয়া ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। ধীরে ধীরে তা শহুরে সমাজেও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আজও অনেকেই নতুন গাড়ি বা নতুন বাড়ির দরজায় কালো সুতো বা কালো নজর কাঠি ঝোলান। অর্থাৎ, এটা শুধুই ফ্যাশন বা শখ নয় অভ্যাসটি সংস্কৃতিগতভাবে গেঁথে আছে।

তবে এই সংস্কার বা বিশ্বাসের পিছনে ব্যক্তিগত মানসিকতার ভারও কম নয়। দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা, অসুখ-বিসুখ, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা পারিবারিক দুশ্চিন্তায় মানুষ যখন নিরাপত্তাহীন বোধ করে, তখন সহজ তাবিজ বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো ছোট্ট প্রতীকে নির্ভরতা গড়ে ওঠে। কালো সুতো তাই মানসিক সান্ত্বনার প্রতীক হয়ে ওঠে। কেউ কেউ আবার এটিকে আধুনিক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবেও ব্যবহার করেন। সুতোয় ছোট্ট পুঁতি বা লৌকিক চার্ম জুড়ে হাত-পায়ে পরে থাকেন। বাইরে থেকে সবকিছু দেখতে নিস্পাপ মনে হলেও, এর আড়ালে কিছু বিপদ লুকিয়ে থাকে, যেগুলি অনেকেই খেয়াল করেন না।

চিকিৎসাবিদ্যার দৃষ্টিতে পায়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা সুতো শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পায়ের ত্বকের রক্তসঞ্চালন খুব সূক্ষ্ম; অনেক স্নায়ু এবং রক্তনালী সেখানে জমাটবদ্ধ। পায়ে আঁটসাঁট কিছু বেঁধে রাখলে সেগুলোর উপর চাপ পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় যাঁরা টাইট কালো সুতো পরে থাকেন, তাঁদের পায়ে লালচে ভাব, ফোলাভাব বা চুলকানি দেখা দেয়। বিশেষত ডায়াবেটিস, থাইরয়েড কিংবা রক্তসঞ্চালনের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এই অভ্যাস আরও বিপজ্জনক। কারণ সামান্য ক্ষত বা ঘষা থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

এই ধরনের সংক্রমণ শুরুতে সামান্য লাল দাগ বা জ্বালা দিয়ে শুরু হলেও, সময়মতো চিকিৎসা না নিলে তা সেলুলাইটিস বা ত্বকের গভীর সংক্রমণে রূপ নিতে পারে। অনেকে অবহেলা করে সুতো খুলে ফেলেন না, ফলে জায়গাটি ভিজে থাকে, ঘাম জমে, ব্যাকটেরিয়া বেড়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের পায়েও শক্ত করে সুতো বাঁধা একদম উচিত নয়। তাঁদের ত্বক আরও নরম, সংবেদনশীল এবং রক্তসঞ্চালন নিয়ন্ত্রিত। সুতো আঁট হয়ে গেলে শিশুর পায়ের গঠনেও প্রভাব পড়তে পারে, এমনকি ব্যথা বা অসাড়তার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পায়ে কালো সুতো বেঁধে রাখাকে অনেকেই সুরক্ষার প্রতীক মনে করলেও, আসলে এটি এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে সুতোই তাকে রক্ষা করছে, তখন নিজের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস বা বাস্তবিক পদক্ষেপ কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিশেষত যারা আত্মবিশ্বাস কম বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন, তাঁরা এই ধরনের ছোট বিশ্বাসে আশ্রয় নিতে চায়। এর ফলেই কখনও কখনও অবাস্তব ভরসা তৈরি হয়। ফলে সমস্যা এড়ানোর বদলে, মানুষ সমাধান খোঁজার পরিবর্তে ‘তাবিজ-কবচ’ নির্ভর হয়ে পড়ে।

কালো সুতো বাঁধার আরেকটি সমস্যা হলো অন্ধবিশ্বাস বৃদ্ধি। কেউ যদি বলে পায়ে সুতো বেঁধে রাখলে আর্থিক সমস্যা কমে, সম্পর্ক ভালো হয় বা রোগ দূর হয় এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু এই কথাগুলি প্রচলিত থাকায় মানুষ কখনও কখনও বাস্তব চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দেরি করে। ধরুন, কোনো ব্যক্তির পায়ে ব্যথা হচ্ছে। তিনি প্রথমেই সুতো, তেল, মন্ত্র বা ‘নজর লেগেছে’ এসব ভেবে সময় নষ্ট করেন। অথচ সমস্যাটি হতে পারে রক্তসঞ্চালনের জটিলতা, স্নায়ুর চাপ বা পুষ্টির ঘাটতি। সুতো পরে আত্মবিশ্বাসী থাকার চেয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত।

এখানে উল্লেখ করা জরুরি মানুষের বিশ্বাস বা রীতিনীতিকে অস্বীকার করা নয়; বরং সেই বিশ্বাসকে নিরাপত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি মনে করেন কালো সুতো বাঁধলে মন শান্ত থাকে, তাতে সমস্যা নেই; কিন্তু সেটি যেন কখনও শরীরের ক্ষতির কারণ না হয়। সুতো কখনওই খুব শক্ত করে বাঁধা উচিত নয়। নরম সুতো, আলগা বাঁধন এবং সময়ে সময়ে খুলে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আর পায়ে কোনো জ্বালা, ব্যথা, চুলকানি বা ত্বকের রঙ বদলানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা যাবে না।

আরও একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি যে কালো সুতো কিনছেন, তা অনেক সময় নিম্নমানের রঙে রঞ্জিত থাকে। সেই রং ত্বকে অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। সস্তা রাসায়নিক রং বা সিন্থেটিক সুতো ঘাম পেয়ে নরম হয়ে ত্বকে লেগে থাকে, যা সংক্রমণের পথ খুলে দেয়। তাই সুতো ব্যবহার করতেই হলে তুলোর সুতো ব্যবহার করা নিরাপদ। অনেক পুরোহিত বা আধ্যাত্মিক গুরুও এখন পরামর্শ দেন, শরীরের স্বাস্থ্য আগে; বিশ্বাস তার পরে।

এমনও দেখা গেছে কিছু মানুষ পায়ে কালো সুতো বেঁধে কর্মস্থলে জুতো বা মোজা টাইট পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকেন। এতে পায়ের রক্তসঞ্চালন আরও বাধাপ্রাপ্ত হয়। পায়ের আঙুলে অসাড়তা, পেশিতে খিঁচুনি বা তীব্র ব্যথা তৈরি হতে পারে। যারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে তো ঝুঁকি দ্বিগুণ। তাছাড়া সুতো-ঘর্ষণে ত্বকের ক্ষত হলে জুতোর চাপ এবং ঘামের কারণে তা আরও খারাপ অবস্থায় পৌঁছায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন এই ধরনের রীতি আমরা প্রায়ই পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে শিখি। মা, দিদা বা ঠাকুমা যখন বলেন“পায়ে সুতো বেঁধে রাখ, নজর কাটবে” তখন ছোটদের মনে প্রশ্ন তোলার মতো অভ্যাস তৈরি হয় না। কিন্তু আজকের দিনে যখন বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ছে, তখন যুক্তি দিয়ে লোকাচারকে বিচার করা প্রয়োজন। অশুভ শক্তি বা নজরকাটা এসবের প্রভাব প্রমাণ করার কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তবে মনস্তত্ত্ব বলে যে জিনিসে আমরা বিশ্বাস রাখি, তা মনের উপর প্রভাব ফেলে। সেই প্রভাব কখনও ভালো, কখনও ক্ষতিকর। তাই বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে “Circulation Restriction Injury” নামে একটি শর্ত রয়েছে, যেখানে শরীরের কোনো অংশ দীর্ঘক্ষণ চাপের মধ্যে থাকলে রক্তসঞ্চালন কমে গিয়ে নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালো সুতো যদি পায়ের গঠন অনুযায়ী বেশি আঁট হয়ে পড়ে, তবে সেই ঝুঁকি থেকেই যায়। এ ছাড়া সুতো ঘর্ষণে “Contact Dermatitis” বা ত্বকের অ্যালার্জিও সাধারণ। খুসখুসে চুলকানি থেকে শুরু করে জ্বালা, ক্ষত, এমনকি ছত্রাক সংক্রমণ পর্যন্ত দেখা যায়।

তাই প্রশ্ন হলো শখ করে পায়ে কালো সুতো বাঁধা কি সত্যিই বুদ্ধিমানের কাজ? উত্তর একেবারে নিষেধ নয়, আবার নিঃশর্তও নয়। আপনি যদি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস বা মানসিক শান্তির জন্য সুতো পরতে চান, পরুন তাতে দোষ নেই। কিন্তু তা যেন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করে। নরম সুতো, আলগা বাঁধন, শুষ্ক ত্বক, নিয়মিত পরিষ্কার এই কয়েকটি নিয়ম মানলে বিপদ কমে আসে। তবুও কোনো রকম অস্বস্তি হলে যত দ্রুত সম্ভব সুতো খুলে ফেলাই উচিত।

সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বাস থাকুক, অন্ধবিশ্বাস নয়। সুতো আমাদের জীবনের কোনো সমস্যার সমাধান করে না বরং সমাধানের পথে মানসিক সাহস জোগালে তবেই তার মূল্য থাকে। ঠাকুমার মতো প্রিয়জনদের বলা রীতিনীতি সম্মান রাখতেই পারে, কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা উচিত নয়। জীবন বদলায়, সমাজ বদলায়—তাই উপকারী রীতিকে গ্রহণ করা এবং ক্ষতিকর রীতিকে প্রশ্ন করা আমাদেরই দায়িত্ব।

অতএব, পায়ে কালো সুতো বেঁধে রাখার আগে দু’বার ভাবা জরুরি। এর পেছনে যদি কুসংস্কার থাকে, তবে তা ভাঙার চেষ্টা করুন। যদি মন শান্ত রাখে—তবে নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম মানুন। আর যদি কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তাহলে অবিলম্বে সুতো খুলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অশুভ শক্তির ভয় নয়, নিজের শরীর ও সুস্থতাই সর্বাগ্রে। কালো সুতোতে বিশ্বাস থাকতেই পারে, তবে তার থেকেও বেশি বিশ্বাস থাকা উচিত নিজের যুক্তিবোধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতার উপর।

Archive

Most Popular