19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সন্তান ঘনঘন বিরক্ত হচ্ছে, কোনও মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত নয় তো ?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



বাচ্চাদের আচরণ পরিবর্তনশীল। কখনো তারা খুশি, কখনো দুঃখ বা বিরক্তিমূলক আচরণ দেখায়। কিন্তু অনেক বাবা-মা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন যখন লক্ষ্য করেন যে সন্তান প্রতিদিন বা ঘনঘন বিরক্তি প্রকাশ করছে। তারা ভেবে থাকেন, এটি কি কোনো মানসিক সমস্যার লক্ষণ, না কি শুধুই মেজাজ বা সাময়িক অবস্থা? এই প্রতিবেদনে আমরা ঘনঘন বিরক্তির কারণ, মানসিক স্বাস্থ্যসহ আচরণগত দিক, শিশুর বিকাশ এবং প্রয়োজনীয় সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বাচ্চাদের আচরণ ও বিরক্তি : শিশুদের আচরণ প্রাথমিকভাবে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছোট বাচ্চারা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে কেবল রাগ, কান্না বা বিরক্তি দেখিয়ে। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে, বিরক্তি প্রকাশ করার পদ্ধতি জটিল হতে পারে—যেমন চিৎকার করা, কথা না শোনা, খেলনা বা স্কুলের কাজে আগ্রহ হারানো।

ঘনঘন বিরক্তির সাধারণ কারণ :

১. শারীরিক কারণ : শিশুর শারীরিক অস্বস্তি যেমন ক্লান্তি, খিদে, ঘুমের অভাব বা অসুস্থতা।

২. পরিবেশগত চাপ : স্কুলের চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের সমস্যা, বাড়ির পরিবেশ।

৩. মানসিক চাপ : অভিভাবকদের উত্তেজনা, পারিবারিক সমস্যা বা স্থানান্তর।

৪. বিকাশের পর্যায় : শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের সঙ্গে আচরণের পরিবর্তন।

৫. অ্যাসিডিটি বা হরমোন পরিবর্তন : কখনো খিদে, ব্লাড সুগার ফ্লাকচুয়েশন বা হরমোনের প্রভাব।

মানসিক সমস্যা ও লক্ষণ : যদি বিরক্তি শুধু সাময়িক না হয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে থাকে এবং অন্যান্য লক্ষণ দেখা দেয়, তখন এটি মানসিক সমস্যা নির্দেশ করতে পারে।

ADHD : অতিরিক্ত সক্রিয়তা, মনোযোগের অভাব, দ্রুত রেগে যাওয়া।

অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ : রাতের ঘুম কম হওয়া, অতিরিক্ত চিন্তা, সামাজিক অবস্থায় ভয়।

ডিপ্রেশন : আগ্রহ হারানো, খারাপ মেজাজ, ক্লান্তি, সামাজিকভাবে নিঃসঙ্গ থাকা।

স্ক্রিন টাইম এবং বিরক্তি : আজকাল শিশুদের মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের মেজাজে বিরক্তি বাড়াতে পারে। স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুর ঘুম, হরমোন এবং সামাজিক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। শিশু যখন কাজ বা খেলায় মন দিতে পারে না, তখন তা দ্রুত বিরক্তিতে প্রকাশ পায়।

আচরণগত থেরাপি ও সমাধান :

1. রুটিন তৈরি করা: প্রতিদিনের ঘুম, খেলাধুলা ও খাবারের সময় নির্দিষ্ট রাখুন।

2. শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া: শিশুর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন, তার রাগ বা বিরক্তি অবমূল্যায়ন করবেন না।

3. পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট: ভাল আচরণকে প্রশংসা করুন।

4. স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: সীমিত সময়ের জন্য ডিজিটাল গ্যাজেট ব্যবহার।

5. শারীরিক কার্যক্রম: খেলাধুলা ও ব্যায়াম শিশুকে মানসিকভাবে শান্ত রাখে।

6. স্ট্রেস রিলিফ : গল্প বলা, গান, আর্ট বা হবি কার্যক্রম।

কবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার : বিরক্তি দীর্ঘ সময় ধরে চলছে।আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন হয়েছে।স্কুলে সমস্যা হচ্ছে, বন্ধু বা শিক্ষকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব।ঘুম, খাওয়া বা স্বাস্থ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।আত্মহত্যা বা ক্ষতিকর আচরণের ভাবনা প্রকাশ।

বাবা-মায়ের ভূমিকা : শিশুর সাথে নিয়মিত সময় কাটানো, কথা বলা ও খেলা করা।ধৈর্য ধরে আচরণ বোঝা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা।পজিটিভ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

শিশুর বিকাশের ধাপ অনুযায়ী বিরক্তি : ছোট বাচ্চা (২–৫ বছর): রাগ, কান্না এবং অপ্রত্যাশিত আচরণ স্বাভাবিক।প্রাথমিক স্কুল (৬–১০ বছর): মনোযোগ কমে, ছোট দুশ্চিন্তা, বন্ধুর সঙ্গে দ্বন্দ্ব।মধ্যপ্রাথমিক/মধ্যবয়সী (১১–১৪ বছর): আত্মপরিচয়, মানসিক চাপ, আবেগের উথাল-পাথাল।কিশোর (১৫–১৮ বছর): সামাজিক চাপ, আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ।

ঘনঘন বিরক্তি কমানোর কার্যকর পদ্ধতি :

1. প্র্যাকটিক্যাল কৌশল: নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম।

2. সঙ্গী বা পরিবারে বোঝাপড়া: ছোট সমস্যার জন্য বাড়িতে শান্তিপূর্ণ আলোচনা।

3. হেলদি ডায়েট: চিনি ও প্রসেসড খাবার কমানো, প্রোটিন ও ভিটামিন যুক্ত খাবার।

4. মেডিটেশন বা রিলাক্সেশন : শিশুদের জন্য হালকা যোগ বা শ্বাসপ্রশ্বাস অনুশীলন।

শিশু ঘনঘন বিরক্ত হচ্ছে মানেই মানসিক সমস্যা নয়। প্রাথমিকভাবে শারীরিক অসুবিধা, খাদ্য, ঘুম, স্কুল বা পারিবারিক চাপই প্রধান কারণ। বাবা-মায়েরা শিশুর আচরণ বোঝার চেষ্টা করলে এবং সঠিক রুটিন, পজিটিভ সমর্থন, শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তৈরি করলে শিশুর বিরক্তি কমে যায়। তবে যদি আচরণ দীর্ঘমেয়াদী, হঠাৎ পরিবর্তনশীল এবং অন্যান্য মানসিক বা শারীরিক সমস্যা যুক্ত হয়, তখন শিশুকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শের জন্য নেওয়া জরুরি। সঠিক মনোযোগ, বোঝাপড়া এবং সহানুভূতিশীল পরিবেশ শিশুর স্বাস্থ্যকর বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

Archive

Most Popular