ভ্রমণ
নিজস্ব প্রতিনিধি
উদয়পুরের ভ্রমণ মানেই রাজপরিবারের ইতিহাস, শাহী কেল্লা আর লেকের সৌন্দর্য। তবে শহরের হৃদয়ে অবস্থিত জগদীশ মন্দির এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা দেয়। এই মন্দিরটি ১৭শ শতাব্দীতে নির্মিত, মেহরানগড়ের রাজাদের আদেশে। মন্দিরটি ভক্তদের জন্য যেমন আধ্যাত্মিক স্থান, তেমনি স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্যও আকর্ষণের কেন্দ্র।
মন্দিরের প্রবেশদ্বারেই চোখে পড়ে উঁচু ধ্বজ ও শ্রীকৃষ্ণের নিখুঁত ভাস্কর্য। প্রাচীর জুড়ে খোদাই করা হস্তী, ফুল ও দেবতার মূর্তি একটি রাজকীয় স্পর্শ দেয়। ধীর, শান্ত পদধ্বনি মন্দিরের প্রাঙ্গণে প্রবেশের সাথে সাথে ভক্তদের মনকে তপস্বী শান্তি দেয়। ভেতরের প্রাঙ্গণটি প্রশস্ত, যেখানে সরল কাচের বাতাস এবং সূর্যের আলো মিশে এক অদ্ভুত উষ্ণতা তৈরি করে।
মন্দিরের গর্ভগৃহ বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এখানে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ভক্তরা ফুল, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে পূজা করতে আসেন। মন্দিরে পুজো করার সময় বাজে ধুনুচি আর বংশী, যা শোনা যায় দূর পর্যন্ত। প্রত্যেক ভক্ত এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে। প্রাঙ্গণের চারপাশে ছোট ছোট ধাপ বা রেলিং রয়েছে, যেখানে ভক্তরা বসে আরাম করতে পারে। প্রাঙ্গণের পাশে ছায়াযুক্ত খোলা বারান্দা আছে, যেখানে মন্দিরের স্থাপত্য ও খোদাই করা প্রাচীরের নকশা পরিষ্কার দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যোদয়ের সময় মন্দিরের চূড়াগুলি সোনার আভা নেয় এবং পুরো স্থান যেন আলোকিত হয়।
মন্দিরে ভ্রমণ করার সময়, কাছাকাছি ছোট দোকান থেকে প্রসাদ ও ফুল কেনা যায়। সাধারণত হলুদ, চিনি বা লাড্ডু দেওয়া হয়, যা ভক্তরা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ভাগাভাগি করে।
এছাড়া মন্দিরের কাছাকাছি কিছু স্থানীয় হস্তশিল্পের দোকান আছে, যেখানে রাজস্থানী পোষাক, পোশাক ও ছোটো মূর্তি পাওয়া যায়। জগদীশ মন্দিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শুধু দর্শনীয় নয়, এটি আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ। প্রতিটি ভক্ত এখানে এসে শ্রীজগন্নাথের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং উদয়পুরের ঐতিহ্যকে কাছ থেকে অনুভব করে। মন্দিরটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক বিশ্রাম এবং স্থাপত্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন ?
১. বিমানে (সর্বোচ্চ দ্রুত ও সুবিধাজনক) :
কোলকাতা থেকে উদয়পুরের উদয়পুর মহারানা প্রতাপ বিমানবন্দর (Maharana Pratap Airport, UDR) পর্যন্ত অনেক বিমান সেবা রয়েছে। যাত্রা সাধারণত প্রায় ২–৩ ঘণ্টা সময় নেয়। বিমান থেকে উদয়পুর শহরের কেন্দ্র বা জগদীশ মন্দির পৌঁছাতে ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড (Ola/Uber) ব্যবহার করা যায়। বিমানপথ সবচেয়ে দ্রুত, তবে খরচ তুলনামূলক বেশি।
২. ট্রেনে (আরামদায়ক ও দৃষ্টিনন্দন) :
কোলকাতা থেকে উদয়পুর পর্যন্ত ট্রেন যাত্রাও একটি ভালো বিকল্প। উদয়পুরে পৌঁছাতে চেন্নাই/কলকাতা-উদয়পুর এক্সপ্রেস বা অন্যান্য ডিরেক্ট ট্রেন ব্যবহার করা যায়।
সময় লাগবে প্রায় ২৮–৩২ ঘণ্টা।
ট্রেন ভ্রমণে রেল স্টেশনের কাছাকাছি থেকে অটো বা ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি মন্দিরে পৌঁছানো যায়।
রেলপথের সুবিধা হলো খরচ কম এবং রাজস্থানের গ্রামীণ দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ।
৩. বাস বা সড়কপথ (অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করলে) :
কোলকাতা থেকে উদয়পুর সরাসরি সরকারি বা প্রাইভেট লাক্সারি বাস নেই, তবে রাস্তা হয়ে ভিন্ন শহর যেমন জয়পুর বা ভিভান থেকে সংযোগ নেওয়া সম্ভব।
মোট দূরত্ব প্রায় ১২০০–১৩০০ কিমি।
সময় লাগবে প্রায় ২৫–৩০ ঘণ্টা।
রাস্তার দৃশ্য, স্থানীয় বাজার, ছোটো শহর–গ্রামের ভ্রমণ এবং বেসরকারি গাড়ির সুবিধা ব্যবহার করে সহজে যাত্রা করা যায়।
৪. উদয়পুরে পৌঁছানোর পর :
উদয়পুর শহরের কেন্দ্র থেকে জগদীশ মন্দির খুব কাছাকাছি, প্রায় ১–২ কিমি।
শহরের রিকশা, অটো বা ট্যাক্সি ব্যবহার করে মন্দিরে সহজে পৌঁছানো যায়।
যদি হোটেল থেকে যাত্রা করেন, হোটেল রিসেপশন সাধারণত মন্দিরের বিস্তারিত রুট ও গাইড দেবে।
পরামর্শ :
১. সময় কম হলে বিমান, আর বাজেট সীমিত হলে ট্রেন ব্যবহার করুন।
২. উদয়পুরে পৌঁছে সকালে বা সন্ধ্যায় মন্দিরের সৌন্দর্য উপভোগ করা সবচেয়ে ভালো।
৩. জগদীশ মন্দিরের কাছাকাছি ছোটো হোটেল বা গেস্ট হাউসে রাত্রি যাপন করলে একদিনে শহর এবং লেকের দর্শনও সম্ভব।