প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
অগ্রহায়ণ মাস পড়তেই বাঙালি হিন্দু সমাজে বিয়ের মরসুম শুরু হয়ে যায়। কেউ এই সময়ে বিয়ে সম্পন্ন করেন, কেউ আবার মাঘ বা ফাল্গুন মাসে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে কেবলমাত্র উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রী খুঁজে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বাঙালি হিন্দুর বিয়ে অনেক প্রথা ও নিয়মের সমন্বয়। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে নানা ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়, যার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল বিয়ের কার্ড বা নিমন্ত্রণপত্র তৈরি করা। বর্তমানে বাজারে বিবাহের জন্য নানা ধরনের আধুনিক এবং রঙিন কার্ড পাওয়া যায়। আগে যেখানে সাদামাঠা কলাপাতার আকারের কার্ড বা লাল রঙের কার্ডই প্রধান ছিল, এখন সেখানে এসেছে বৈচিত্র্যময় নকশা, উজ্জ্বল রঙ এবং আধুনিক ডিজাইন। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী, শুধুই আকার ও রঙ নয়, বরং কার্ডের নকশা, রঙ, শব্দ এবং ব্যবহৃত প্রতীকগুলোরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিবাহিত জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্ডের উপর নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিয়ের কার্ড বানানোর আগে শাস্ত্র অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি
বিয়ের কার্ড তৈরি করার সময় কিছু শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে চললে তা দাম্পত্য জীবনে শুভ প্রভাব ফেলে।
এই নিয়মগুলি হল:
১. বর ও কনের ছবি কার্ডে লাগাবেন না:
আজকাল অনেকেই বর ও কনের ছবি কার্ডে ব্যবহার করেন। তবে শাস্ত্র অনুযায়ী এটি মোটেও শুভ কাজ নয়। এতে পাত্র-পাত্রীর উপর অশুভ দৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কার্ডে বর-কনের ছবি ব্যবহার না করাই ভালো। কার্ডের সৌন্দর্য এবং আধুনিকতার জন্য বিভিন্ন নকশা ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বর-কনের ছবি লাগানো শাস্ত্রসম্মত নয়।
২. রঙের গুরুত্ব:
বিয়ের কার্ডের রঙ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাস্ত্র মতে, লাল, হলুদ, জাফরান বা ক্রিম রঙের কার্ড সবচেয়ে শুভ। লাল রঙ প্রেম, শক্তি এবং বৈবাহিক বন্ধনের প্রতীক। হলুদ ও জাফরান শুভ সূচনা এবং সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। সাদা রঙ শান্তি এবং পবিত্রতার প্রতীক। অন্যদিকে, গাঢ় রঙ যেমন কালো, নীল, গাঢ় সবুজ বা বাদামী এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। এই রঙগুলো নেতিবাচক শক্তি এবং দুঃখের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তাই বিয়ের কার্ডের রঙ নির্বাচন করতে গেলে অবশ্যই শুভ রঙের দিকে নজর দিতে হবে।
৩. শুভ প্রতীক ব্যবহার:
বিয়ের কার্ডে দেব-দেবীর ছবি বা শুভ প্রতীক থাকাটা খুবই শুভ। বিশেষ করে, গণেশের ছবি বা প্রতীক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণেশ বিঘ্নহর্তা, এবং কোনও শুভ অনুষ্ঠান তার আশীর্বাদ ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। স্বস্তিক ও কলস ব্যবহার করলে ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। কার্ডে খুব অদ্ভুত বা বিভ্রান্তিকর নকশা ব্যবহার করা এড়ানো উচিত।
৪. শুভ শব্দ ও মন্ত্র:
কার্ডে ব্যবহৃত শব্দও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা শুদ্ধ এবং কোমল হওয়া আবশ্যক। কঠোর বা নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার না করাই ভালো। কার্ডে যুদ্ধ, শোক বা হতাশার ইঙ্গিত দেয় এমন কোনো শব্দ বা ছবি থাকা উচিত নয়। শুভতা ও সুখের জন্য কার্ডে গণেশমন্ত্র বা বিষ্ণুমন্ত্র লেখা বা মুদ্রণ করা অত্যন্ত উপকারী। এই মন্ত্রগুলি কার্ডে থাকলে বিবাহিত জীবন সুখে এবং সমৃদ্ধিতে কাটে।
৫. কার্ড বিতরণের আগে গণেশ পূজা:
যেমন যে কোনও শুভ কাজের আগে গণেশ পূজার প্রথা রয়েছে, তেমনই বিয়ের কার্ড ছাপানোর পরে তা বিতরণের আগে গণেশ পূজা করা উচিত। প্রথমে কার্ডটি ইষ্টদেবতার কাছে বা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া উচিত। তারপর আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়।
৬. কার্ড রাখার স্থান:
বিয়ের কার্ড বাড়িতে আনার পর সেগুলো যত্রতত্র ফেলে রাখা উচিত নয়। শাস্ত্র অনুযায়ী, কার্ডগুলো বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে দাম্পত্য জীবন আনন্দের সঙ্গে কাটে এবং বাড়িতে শুভ শক্তির প্রবাহ থাকে।
বিয়ের কার্ড ডিজাইনের আধুনিক দিক:
আজকাল বিয়ের কার্ড ডিজাইন অনেক আধুনিক হয়েছে। পূর্বে যেখানে কলাপাতা বা লাল রঙের সরল কার্ড থাকত, এখন সেখানে এসেছে, বিভিন্ন রঙের ফয়েল ও প্রিন্টিং প্রযুক্তি, সূক্ষ্ম নকশা ও লেস কাজ, থিমভিত্তিক ডিজাইন (যেমন রাজকীয়, প্রাকৃতিক, বা আধুনিক শৈলী), ব্যতিক্রমী ফন্ট এবং লেআউট ইত্যাদি। তবে আধুনিকতা থাকলেও শাস্ত্র অনুযায়ী কিছু নিয়ম মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন:, কার্ডে বর-কনের ছবি ব্যবহার না করা, শুভ রঙ নির্বাচন, গণেশ ও স্বস্তিকের মতো শুভ প্রতীক ব্যবহার।
শব্দের নির্বাচনের গুরুত্ব:
বিয়ের কার্ডে ব্যবহৃত শব্দগুলোর মাধ্যমে অতিথির মনে প্রভাব পড়ে। তাই কার্ডে ব্যবহৃত শব্দ অবশ্যই কোমল এবং শ্রদ্ধাশীল, শুভ সূচক, স্পষ্ট এবং ত্রুটিমুক্ত, শুভ সময়, তারিখ এবং বিবাহের স্থান স্পষ্টভাবে মুদ্রিত থাকা আবশ্যক। এছাড়া কার্ডে কুলদেবতা এবং গণেশকে উৎসর্গ করা খুবই শুভ।
কার্ড বিতরণের সময় শাস্ত্র অনুযায়ী কিছু নিয়ম পালন করা উচিত:
১.প্রথমে কার্ডটি গণেশ পূজা করে মন্দিরে দেওয়া।
২.মন্দির থেকে কার্ড ফিরে আসার পর আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ।
৩.কার্ড বাড়িতে আনার পর উত্তর-পূর্ব কোণে রাখা।
বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী এই নিয়মগুলো মেনে চললে বিয়ের অনুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবন উভয়ই শুভ ও আনন্দময় হয়।
বাঙালি হিন্দু বিয়েতে কার্ড বা নিমন্ত্রণপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু অতিথি আমন্ত্রণের মাধ্যম নয়, বরং দাম্পত্য জীবনের শুভ সূচনার প্রতীক। শাস্ত্র অনুযায়ী কার্ডের রঙ, নকশা, শব্দ এবং বিতরণের প্রথা যত্ন সহকারে মেনে চললে বিবাহিত জীবন সুখী, সমৃদ্ধ এবং মসৃণ হয়। আধুনিক ডিজাইন থাকলেও শাস্ত্রীয় নিয়মগুলো মানা অপরিহার্য। সঠিক রঙের কার্ড, শুভ প্রতীক, কোমল শব্দ এবং গণেশ পূজা এই সবই দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক শক্তি এবং আনন্দ নিয়ে আসে।
বিয়ের কার্ডের প্রতি এই সচেতন মনোভাব বাঙালি হিন্দু সমাজের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে এবং বিয়েকে জীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সুতরাং, বিয়ের মরসুমে কার্ড বানানোর সময় শুধু আকার ও নকশা নয়, বরং শাস্ত্র অনুযায়ী শুভ রঙ, প্রতীক এবং শব্দের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি।