প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ডিজিটাল যুগে সন্তানের নিরাপত্তা এখন আর শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা বিস্তৃত হয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন, ল্যাপটপ, গেমিং কনসোল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে। অনলাইন শিক্ষা, বিনোদন ও যোগাযোগ সবই আজ ইন্টারনেটনির্ভর। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং UNICEF শিশুদের ডিজিটাল ব্যবহারের অভূতপূর্ব বৃদ্ধির কথা জানায়, তখন থেকেই ‘অনলাইন সুরক্ষা’ বিষয়টি অভিভাবকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতে National Crime Records Bureau–র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সাইবার অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির যে তথ্য উঠে এসেছে, তা এই উদ্বেগকে আরও বাস্তব করে তোলে। ফলে প্রশ্ন একটাই আপনার সন্তান অনলাইনে সত্যিই সুরক্ষিত তো?
প্রথমেই বুঝতে হবে, শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি কী কী হতে পারে। সাইবার বুলিং, অনলাইন গ্রুমিং, ভুয়ো পরিচয়ে প্রতারণা, গেমিং অ্যাপের মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা, অশালীন বা বয়স-অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশ এসবই বাস্তব বিপদ। National Center for Missing & Exploited Children -এর গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অপরিচিতদের সঙ্গে অযাচিত যোগাযোগের ঘটনাই শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলির একটি। ভারতে বিভিন্ন রাজ্যের সাইবার সেলও জানাচ্ছে, কিশোর-কিশোরীরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সহজেই অপরিচিত প্রোফাইলের ফাঁদে পড়ছে। তাই প্রথম সতর্কবার্তা সন্তানের অনলাইন যোগাযোগের পরিসর সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
কীভাবে বুঝবেন সন্তান অনলাইনে নিরাপদ আছে কি না? লক্ষ করুন আচরণগত পরিবর্তন। হঠাৎ করে সন্তান যদি মোবাইল লুকিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করে, রাতে দেরি পর্যন্ত অনলাইনে থাকে, অথবা অনলাইন ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে অস্বস্তি বা রাগ দেখায়—তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখুন। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে অনেক সময় শিশু চুপচাপ হয়ে যায়, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, অথবা অকারণে মানসিক চাপে ভোগে। এই পরিবর্তনগুলোকে ‘কিশোর বয়সের স্বাভাবিক রূপান্তর’ বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না; বরং সংলাপের মাধ্যমে কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সন্তানের ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখুন। সে কি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ ব্যবহার করছে? নাকি ভিডিও কনটেন্টের জন্য অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় কাটায়? আবার অনেক কিশোর-কিশোরী শর্ট ভিডিওর জন্য টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকে (যদিও ভারতে এটি নিষিদ্ধ, তবু ভিপিএন বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রবেশের নজির রয়েছে)। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব প্রাইভেসি সেটিংস ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা রয়েছে। সন্তান কি তার প্রোফাইল ‘প্রাইভেট’ করে রেখেছে? অপরিচিতদের ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ গ্রহণ করছে কি না? এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি।
তৃতীয়ত, ডিভাইস ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করুন। বাড়িতে ‘ডিজিটাল রুল’ থাকা উচিত—কতক্ষণ স্ক্রিন টাইম, কখন মোবাইল ব্যবহার করা যাবে, কোন ঘরে ডিভাইস ব্যবহার হবে ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, ছোটদের ক্ষেত্রে ডিভাইস যেন সাধারণ ঘরে ব্যবহৃত হয়, একান্তে দরজা বন্ধ করে নয়। পাশাপাশি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার ব্যবহার করা যেতে পারে, যা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট ব্লক করতে বা স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণই শেষ কথা নয়; সন্তানের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
চতুর্থত, সন্তানকে ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষিত করুন। শুধুমাত্র “ওটা করো না” বললে হবে না; কেন করবে না, সেটি বুঝিয়ে বলতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন বাড়ির ঠিকানা, স্কুলের নাম, ফোন নম্বর, পারিবারিক আর্থিক তথ্য—অনলাইনে শেয়ার করা কতটা বিপজ্জনক, তা উদাহরণসহ বোঝাতে হবে। অনলাইন গেমে অচেনা কারও সঙ্গে চ্যাট করা বা ‘গিফট’ নেওয়া যে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সে কথাও জানাতে হবে। অনেক সময় অপরাধীরা ‘বন্ধু’ সেজে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে পরে ব্ল্যাকমেল করে—এই কৌশল সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
পঞ্চমত, আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। আজকাল বহু গেম ও অ্যাপ ‘ইন-অ্যাপ পারচেস’ বা সাবস্ক্রিপশন মডেলে চলে। সন্তানের অজান্তে কার্ড ডিটেলস সংরক্ষিত থাকলে বড় অঙ্কের অর্থ কেটে যেতে পারে। তাই অনলাইন পেমেন্টের ক্ষেত্রে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড শুধুমাত্র অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। নিয়মিত ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ।
ষষ্ঠত, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি বিবেচনা করুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘পারফেক্ট লাইফ’-এর ছবি দেখে অনেক কিশোর-কিশোরী হীনমন্যতায় ভোগে। লাইক-কমেন্টের সংখ্যাই যেন আত্মসম্মানের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। এই চাপ থেকে উদ্বেগ, হতাশা এমনকি আত্মঘাতী চিন্তাও জন্ম নিতে পারে। তাই সন্তানকে বোঝাতে হবে—অনলাইন জগতের অনেকটাই সাজানো বাস্তবতা। বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, খেলাধুলা, পড়াশোনা ও পারিবারিক সময়ের মূল্য বেশি।
সপ্তমত, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে কী করবেন তা জেনে রাখুন। যদি সন্তান সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তবে প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করুন। প্ল্যাটফর্মের ‘রিপোর্ট’ অপশন ব্যবহার করুন এবং প্রয়োজনে সাইবার ক্রাইম পোর্টালে অভিযোগ জানান। ভারতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সাইবার ক্রাইম পোর্টাল (cybercrime.gov.in) এই বিষয়ে সহায়তা করে। স্কুল কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো উচিত, কারণ অনেক সময় সহপাঠীরাই বুলিংয়ে জড়িত থাকে।
অষ্টমত, অভিভাবক হিসেবে নিজেকেও আপডেট রাখুন। প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে; নতুন অ্যাপ, নতুন ট্রেন্ড, নতুন ঝুঁকি প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। সন্তান যে গেম খেলছে বা যে অ্যাপ ব্যবহার করছে, অন্তত তার মৌলিক ধারণা রাখুন। এতে সন্তান বুঝবে—আপনি কেবল নিয়ন্ত্রণ করতে নয়, বুঝতে আগ্রহী।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, নজরদারি আর বিশ্বাস এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য দরকার। অতিরিক্ত নজরদারি করলে সন্তান গোপনীয়তার অভাব বোধ করতে পারে, আবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। এমন সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যাতে কোনো অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হলে সন্তান প্রথমেই আপনাকে জানায়। ডিজিটাল পৃথিবী যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনই চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সঠিক দিকনির্দেশ, সচেতনতা ও সংলাপের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সন্তান অনলাইনে সুরক্ষিত কি না, তা বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় হলো তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের গভীরতা। প্রযুক্তি বদলাবে, প্ল্যাটফর্ম বদলাবে, কিন্তু বিশ্বাস, সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা—এই তিনটিই থাকবে সন্তানের প্রকৃত সুরক্ষার ভিত্তি।