প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশভাগ শুধু ভূখণ্ডের বিভাজন নয়, মানুষের জীবনে ছিল তা এক গভীর ক্ষত। উদ্বাস্তুদের নতুন জীবনের সংগ্রামে ঠাঁই পায়নি স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা বা শান্তি। দারিদ্র্য, আতঙ্ক ও অজানা ভয় তাঁদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল নানা লোকাচার, বিশ্বাস ও উপচারের চর্চা। তারই একটি বিশেষ রূপ হলো বার ভূতের পুজো। উদ্বাস্তু কলোনির অস্থির জীবনে এই পুজো হয়ে উঠেছিল অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার এক সামাজিক আচার এবং মানসিক আশ্রয়।
বার ভূত বলতে বোঝানো হয় বারোটি ভূতের দল বা শক্তি, যাদের লোকবিশ্বাসে একত্রে পুজো দেওয়া হয় শান্তির উদ্দেশ্যে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে ভূত, প্রেত, ব্রহ্মদৈত্য, শাঁকচুন্নি, পেত্নী ইত্যাদি চরিত্রগুলি বহুদিন ধরেই বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ঠাঁই পেয়েছে। বার ভূতের পুজো এক ধরনের লোকাচারিক অনুষ্ঠান, যা সাধারণত গ্রামাঞ্চলে কিংবা দরিদ্র মানুষদের মধ্যে প্রচলিত, বিশেষ করে যেখানে কোনো অশুভ ঘটনার প্রতিকারের জন্য দেবতা বা অতিপ্রাকৃত শক্তির সাহায্য কামনা করা হয়।
উদ্বাস্তু কলোনি বলতে বোঝানো হচ্ছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কিংবা তার পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগত শরণার্থীদের বসবাসস্থল। এই কলোনিগুলোতে নানা রকম কষ্ট, দুঃখ ও আতঙ্কের স্মৃতি গেঁথে ছিল।
সেসব জায়গায়:
পুরনো বিশ্বাস, লোকাচার, ভৌতিক কাহিনি মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি হিসেবে ধরে রেখেছিল।
অস্বাভাবিক মৃত্যু, দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, বা হঠাৎ দুর্ঘটনা এগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজতে অনেক সময় ভূতের আক্রমণ বা অশুভ শক্তিকে দায়ী করা হত।
তাই শান্তির জন্য, অসুস্থতা বা ভীতির প্রতিকার হিসেবে বার ভূতের পুজো করা হত। এতে:
ভূতেদের প্রসন্ন করা হতো, যেন তারা আর অনিষ্ট না করে।
চাল, লাড্ডু, ধূপ, পান-সুপারির মত উপকরণ দিয়ে পুজো হত।
অনেক সময় ছোট্ট নাটক বা কীর্তনের মতো লোক-উপস্থাপনাও থাকত।
এই পুজো শুধুই ভূতের ভয় বা কুসংস্কারের প্রতীক নয় এটি এক ধরনের লোকজ কল্পনার রূপায়ণ, যার মধ্যে:
উদ্বাস্তুদের মানসিক চাপ ও ভয়কে আচারিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতির ধারক হিসেবে কাজ করেছে, যখন তারা তাদের মূলভূমি হারিয়েছিল।
সমাজের প্রান্তিক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, দুর্ভোগ ও বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
উদ্বাস্তু কলোনিতে বার ভূতের পুজো এই শব্দবন্ধটি শুধু একটি লোকাচার নয়, এটি এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। এর পেছনে রয়েছে দেশভাগ, উদ্বাস্তু সংকট, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক মানসিকতার এক জটিল ও গভীর ইতিহাস। নিচে এর পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হলো:
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এদের অনেকেই এসে উঠেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে গড়ে ওঠা উদ্বাস্তু কলোনিতে যেমন কোলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, বনগাঁ, হাবরা, কাঁচড়াপাড়া, ইত্যাদি জায়গায়।
এই উদ্বাস্তু কলোনিগুলিতে জীবনের ছিল না নিরাপত্তা বা স্থিতি। ছিল চরম দারিদ্র্য, রোগ, অপুষ্টি, অনিরাপদ ঘরবাড়ি, এবং অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যু। এর ফলে মানুষের মনে জন্ম নেয় অজানা আশঙ্কা, অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস ও অশুভ শক্তির ভয়। হঠাৎ মৃত্যু বা দুর্ভাগ্যের পেছনে ভূতের কাজ এই ধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বার ভূত বলতে বোঝানো হয় বারো ধরনের বা সংখ্যায় বারোটি অশরীরী সত্তা, যাদের একত্রে পুজো দিয়ে শান্ত রাখা হয়। বাংলার লোকবিশ্বাসে ভূত-প্রেত, শাঁকচুন্নি, পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, আল, শাকিনী, ডাইনিরা বিভিন্ন ধরনের অশুভ শক্তি হিসেবে ধরা হয়।
এই পুজোর মাধ্যমে এই শক্তিগুলিকে ভালভাবে বিদায় দেওয়া হয়, যাতে তারা ক্ষতি না করে। এতে থাকত:
চাল, পান-সুপারি, লাড্ডু ইত্যাদি উৎসর্গ
মাটির ছোট কাঠামো বা প্রতীকী চিহ্ন
স্থানীয় পল্লীগীতি বা ছড়ার মাধ্যমে তাদের ডাক দেওয়া ও বিদায় জানানো
অনেক সময় গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে বা পুকুরপাড়ে আয়োজন
এই পুজো ছিল একপ্রকার সামাজিক থেরাপি, যেখানে মানুষ ভয়, অপমান, হতাশা ও অতীতের স্মৃতিকে আচারিকভাবে প্রকাশ করতে পারত।
তা ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, যাতে হারানো শিকড়, লোকবিশ্বাস, এবং পরিচয় টিকিয়ে রাখা যেত।
এই পুজোতে অংশগ্রহণ করত সকল বয়সের মানুষ একত্রে গান, ছড়া, খেলা ইত্যাদির মাধ্যমে এটি একপ্রকার উৎসবেও পরিণত হতো।
বার ভূতের পুজো কেবল লোকবিশ্বাস বা কুসংস্কার নয়, এটি উদ্বাস্তু জীবনের অসহায়তা, ব্যথা এবং সংস্কৃতির টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এক অন্ধকার সময়ে যখন ধর্ম, ভয় ও সংস্কৃতি মিলেমিশে জীবনের সহায় হয়ে উঠেছিল, তখন এই পুজো ছিল স্বস্তির খোঁজে মানুষের এক ক্ষণিক আশ্রয়। আজও এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে থাকা মানুষের মানসিক ক্ষরণ এবং লোকজ সংস্কৃতির শক্তি।