19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

রূপনারায়ণ নদীর তীরে শরৎচন্দ্রের স্মৃতিমাখা গ্রাম!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


পরিবারের সকলকে নিয়ে দু’দিন নিরিবিলিতে কোথাও প্রকৃতির মাঝে কাটাতে চান, অথচ কোথায় যাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না? তাহলে একবার ঘুরে আসতেই পারেন কলকাতার কাছেই রূপনারায়ণের তীরে ছোট্ট গ্রাম দেউলটি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে মোড়া, শান্ত এই জনপদ স্বল্প সময়ের অবকাশযাপনের জন্য আদর্শ।

হাওড়া জেলার ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে অবস্থিত দেউলটি প্রথম দর্শনে সাধারণ গ্রাম বলেই মনে হতে পারে। প্রাকৃতিক দৃশ্যে হয়তো দার্জিলিং বা ডুয়ার্সের মতো নাটকীয়তা নেই, কিন্তু এখানকার প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। আর এই গ্রামকে অনন্য করে তুলেছে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়–এর স্মৃতি।

কলকাতা থেকে প্রায় ৫০–৬০ কিলোমিটার দূরে দেউলটি। দ্বিতীয় হুগলি সেতু পেরিয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে জাতীয় সড়ক ৬–এ উঠলে বাগনানের পরই দেউলটি ক্রসিং। আবার ট্রেনে যেতে চাইলে হাওড়া স্টেশন থেকে পাঁশকুড়া লোকাল ধরে দেউলটি স্টেশনে নামা যায়। সেখান থেকে রিকশা বা ভ্যানে করে সহজেই পৌঁছে যাবেন শরৎচন্দ্রের বাড়িতে। ফলে বয়স্ক সদস্যদের নিয়েও একদিন বা দু’দিনের সফর খুব কষ্টকর হয় না।

দেউলটি লাগোয়া সামতা বা সামতাবেড় গ্রামেই রয়েছে বিখ্যাত ‘শরৎ কুঠি’। ১৯১৯ সালে এখানে জমি কেনার পর শরৎচন্দ্র নিজেই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখেন সামতাবেড়। ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় বারো বছর তিনি এখানে বসবাস করেন। পরে কলকাতায় ফিরে যান এবং সেখানেই প্রয়াত হন। তাঁর জন্ম হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে, আর শৈশবের বড় অংশ কেটেছে বিহারের ভাগলপুরে মামাবাড়িতে। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন ব্রহ্মদেশ (বর্তমান মিয়ানমার)–এ থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সামতাবেড়ের বাড়িটি নির্মাণে সে সময় প্রায় ১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে জানা যায়। বাড়ির স্থাপত্যে বার্মিজ প্রভাব স্পষ্ট। দোতলা এই বাড়ির বারান্দা থেকে একসময় আরও কাছাকাছি দেখা যেত রূপনারায়ণ নদী–র স্রোত। এখন নদী কিছুটা সরে গেলেও তার উপস্থিতি এখনও বাড়িটির আবহকে আলাদা মাত্রা দেয়।

এই বাড়িতেই বসে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বহু অমর সৃষ্টি—‘দেবদাস’, ‘দেনাপাওনা’, ‘দত্তা’, ‘নিষ্কৃতি’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’-এর মতো উপন্যাস এবং ‘মহেশ’, ‘রামের সুমতি’-র মতো বিখ্যাত ছোটগল্প। তাঁর সাহিত্য যে শুধু বাংলায় নয়, সারা ভারতে বহুল পঠিত, অনূদিত এবং অসংখ্যবার চলচ্চিত্র ও নাটকে রূপান্তরিত হয়েছে—তা সর্বজনবিদিত। সেই সৃষ্টির পেছনে সামতাবেড়ের নির্জনতা ও প্রকৃতি যে বড় ভূমিকা নিয়েছিল, তা অনুভব করা যায় বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখলেই।

বর্তমানে বাড়িটি সংরক্ষিত হেরিটেজ সাইট হিসেবে রক্ষিত। ১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ২০০৯ সালে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং আদি কাঠামো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। বাড়ির ভেতরে আজও সংরক্ষিত আছে শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত লেখার টেবিল, হুঁকো, বার্মা কাঠের আসবাব, জাপানি ঘড়ি এবং বইয়ের তাক। একটি ছোট গ্রন্থাগারও রয়েছে। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন অতীতের গল্প শোনায়।

শরৎচন্দ্র যখন এখানে বসবাস শুরু করেন, তখন গ্রামবাসীদের একাংশ প্রথমে তাঁকে সহজে গ্রহণ করেননি। নারী নির্যাতন, জাতিভেদ প্রথা–সহ সমাজের নানা কুপ্রথার বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান অনেকের অপছন্দের কারণ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মানবিকতা ও পরোপকারী মনোভাব সকলের মন জয় করে নেয়। তিনি একটি বিনামূল্যের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয়ও চালু করেছিলেন, যা আজও তাঁর মানবিকতার স্মারক হিসেবে পরিচিত।

বাড়ির বাগানে রয়েছে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবী এবং ভাই স্বামী বেদানন্দের সমাধি। শোনা যায়, নিজের হাতে লাগানো বাঁশ ও পেয়ারা গাছও এখনও দেখা যায় এখানে। ফলে এই সফর কেবল প্রকৃতি দর্শন নয়, ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চারও এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

দেউলটি মূলত একদিনের ট্রিপের জন্য আদর্শ হলেও চাইলে আশপাশে রাত কাটানো যায়। শ্যামপুর বা উলুবেড়িয়ায় ছোট হোটেল ও লজ আছে, পাশাপাশি কিছু হোমস্টেও পাওয়া যায়। আগেভাগে বুকিং করে নেওয়াই ভালো। বড় রেস্তোরাঁ না থাকলেও গ্রাম্য খাবারের স্বাদ অনন্য—ভাত, ডাল, শাক, আলু-পোস্ত, মৌসুমি মাছের ঝোল কিংবা ইলিশের পদ সহজেই মেলে। স্থানীয় মিষ্টির দোকানে রসগোল্লা বা সন্দেশের স্বাদও আলাদা।

বিকেলের দিকে রূপনারায়ণের ঘাটে বসে থাকা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শীতকালে নদীর ধারে পাখির আনাগোনা বাড়ে, পিকনিকের আমেজও থাকে। তবে বর্ষাকালে প্রকৃতি আরও সবুজ হলেও রাস্তার কিছু অসুবিধা হতে পারে। তাই শীত ও বসন্তকাল ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

দেউলটি বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নয়। এখানে নেই ঝাঁ-চকচকে রিসর্ট বা বড় বিনোদন পার্ক। কিন্তু আছে শান্ত বাতাস, নদীর স্রোত, গ্রামবাংলার সরল জীবন এবং এক মহৎ সাহিত্যিকের স্মৃতি। বয়স্ক বাবা–মাকে নিয়ে, পরিবারের সকলকে সঙ্গে করে যদি একটু অন্যরকম, নিরিবিলি, অর্থপূর্ণ ছুটি কাটাতে চান—তাহলে রূপনারায়ণের তীরে দেউলটি হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। এখানে এসে বোঝা যায়, কখনও কখনও দূরে নয়, কাছেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে শান্ত ঠিকানা।

Archive

Most Popular