10th Apr 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

বাচ্চা খেতে বসলেই মোবাইল চায়? কেন এমন অভ্যাস তৈরি হচ্ছে?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


খাবার সময় হল পরিবারে একসঙ্গে বসার, গল্প করার, ধীরে সুস্থে খাওয়ার সময়। অথচ এখন অনেক বাড়িতেই দেখা যায় বাচ্চা খেতে বসেই বলে, “মোবাইল দাও!” ভিডিও না দেখলে সে মুখেই তুলতে চায় না এক কণা ভাত ও। প্রথমে বিষয়টি সুবিধাজনক মনে হলেও, ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে উদ্বেগের কারণ। প্রশ্ন হল, কেন এমন অভ্যাস তৈরি হচ্ছে?

 প্রথমত মনোযোগ ধরে রাখার সহজ উপায় হিসেবে মোবাইলের ব্যবহার। অনেক সময় বাবা-মা ব্যস্ত থাকেন, বাচ্চা খেতে চায় না তখন ভিডিও চালিয়ে দিলে সে চুপচাপ খেয়ে নেয়। এই “সহজ সমাধান”ই ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত চলমান ছবি, রঙ ও শব্দে উত্তেজিত হয়। ফলে খাবার ও মোবাইলের মধ্যে একটি শর্তাধীন সম্পর্ক তৈরি হয় ভিডিও মানেই খাবার। মোবাইল স্ক্রিনে দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্য, কার্টুন, গান এসব শিশুর মস্তিষ্কে আনন্দ হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়। ফলে সাধারণ খাওয়া তার কাছে একঘেয়ে মনে হয়। বাস্তবের ধীর গতির অভিজ্ঞতার তুলনায় স্ক্রিন অনেক বেশি উত্তেজক। এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক মনোযোগের ক্ষমতাও কমতে পারে।

এছাড়াও পরিবারে স্ক্রিন-সংস্কৃতি ও একটি অন্যতম কারণ। বড়রা যদি সারাক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন, শিশুও সেটাকেই স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে করে। খাওয়ার টেবিলে সবাই যদি স্ক্রিনে ডুবে থাকেন, তবে শিশুর কাছে সেটাই হয়ে ওঠে নিয়ম। খাওয়াকে “বাধ্যতামূলক কাজ” বানিয়ে ফেলাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বাচ্চাকে জোর করে বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। খাওয়ার সময় চাপ, বকাঝকা বা তাড়া থাকলে সে মানসিকভাবে বিরক্ত হয়। তখন মোবাইল তার কাছে এক ধরনের পালানোর পথ। এই অভ্যাসের ফলে কী সমস্যা হতে পারে? প্রথমত, শিশুর নিজের খিদে ও পেট ভরার অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা কমে যায়। স্ক্রিনে মন দিলে সে বুঝতেই পারে না কখন পেট ভরে গেছে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়া বা কম খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, খাবার চিবোনো ও স্বাদের প্রতি মনোযোগ কমে যায়, যা হজমের উপর প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে স্ক্রিন-নির্ভরতা আচরণগত সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

তাহলে কী করবেন? হঠাৎ করে পুরোপুরি মোবাইল বন্ধ করলে শিশু প্রতিরোধ করতে পারে। ধীরে ধীরে নিয়ম তৈরি করুন। যেমন খাওয়ার সময় টেবিলে কোনও স্ক্রিন থাকবে না। প্রথমে পাঁচ মিনিট গল্প করে খাওয়া শুরু করুন, তারপর সময় বাড়ান। পরিবারের সবাইকে একই নিয়ম মানতে হবে। বাবা-মা যদি নিজে মোবাইল সরিয়ে রাখেন, শিশুও সহজে মানবে। খাবার সময়কে আনন্দময় করে তুলুন। তাকে জিজ্ঞেস করুন আজকের ডালে কীসের গন্ধ পাচ্ছ? ভাতের সঙ্গে কোন তরকারি মিশিয়ে খেতে ভালো লাগছে? প্লেটে রঙিন সবজি সাজিয়ে দিন। মাঝে মাঝে তাকে রান্নার ছোট কাজে যুক্ত করুন সালাদ ধোয়া, প্লেট সাজানো। এতে খাবারের প্রতি তার আগ্রহ বাড়বে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ধৈর্য। এই অভ্যাস একদিনে তৈরি হয়নি, একদিনে যাবে না। ভালোবাসা, নিয়ম ও ধারাবাহিকতা এই তিনটি জিনিসই পারে শিশুকে স্ক্রিন-নির্ভর খাওয়ার অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে দূরে আনতে। খাওয়ার টেবিল শুধু পেট ভরানোর জায়গা নয়; এটি সম্পর্ক গড়ার জায়গা। মোবাইলের আলো নিভিয়ে যদি পরিবারের হাসি-গল্পের আলো জ্বালানো যায়, তবেই শিশুর খাওয়ার সময় ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক আনন্দ।

Archive

Most Popular