11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ক্যান্সার থেকে বাঁচতে প্রতিষেধক নেওয়া জরুরি: খরচ কত, কতটা কার্যকর?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


ক্যান্সার আজকের পৃথিবীতে অন্যতম ভয়ঙ্কর রোগগুলির মধ্যে একটি। একসময় এই রোগের নাম শুনলেই মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আজ অনেক ক্ষেত্রেই ক্যান্সারের চিকিৎসা সম্ভব হলেও, এখনও এটি বহু মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, এবং ভারতে এই সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। তাই চিকিৎসকরা বারবার বলছেন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সব ধরনের ক্যান্সারের প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্যান্সার প্রতিরোধে বর্তমানে কার্যকর ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছে। বিশেষত সার্ভিক্যাল ক্যান্সার এবং লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে এই প্রতিষেধক কতটা কার্যকর, কারা নিতে পারেন এবং এর খরচ কত। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও আজ অত্যন্ত জরুরি। ক্যান্সার প্রতিষেধক বলতে সাধারণত এমন টিকাকে বোঝায় যা শরীরকে কিছু নির্দিষ্ট ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এই ভাইরাসগুলোই পরে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। একইভাবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই ভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, যার ফলে ভবিষ্যতে ক্যান্সারের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। ভারতে নারীদের মধ্যে সার্ভিক্যাল ক্যান্সার একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর দেশে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এই ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো HPV ভাইরাস, যা সাধারণত যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে HPV ভ্যাকসিন, যা সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের জন্য HPV ভ্যাকসিন নেওয়া সবচেয়ে উপযোগী। তবে ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়স পর্যন্তও এই টিকা নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্তও টিকা দেওয়া হয়। সাধারণভাবে দেখা যায়, বয়স কম থাকলে এই টিকার কার্যকারিতা বেশি হয়। বয়স অনুযায়ী এই ভ্যাকসিনের ডোজের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি ডোজ যথেষ্ট হয়। কিন্তু ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সে সাধারণত তিনটি ডোজ দেওয়া হয়। প্রতিটি ডোজের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান থাকে এবং সেই সময়সূচি চিকিৎসক নির্ধারণ করেন।

ভারতে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের HPV ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। ব্র্যান্ড এবং হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে এর দাম কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণভাবে একটি ডোজের দাম প্রায় ২০০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে হয়। যদি তিনটি ডোজ নেওয়া লাগে, তাহলে মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ৬০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা বা তারও বেশি। তবে অনেক সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কম খরচে বা কখনও বিনামূল্যেও এই টিকা দেওয়া হয়। সম্প্রতি ভারতীয় গবেষকদের তৈরি নতুন একটি HPV ভ্যাকসিন বাজারে এসেছে, যার দাম তুলনামূলকভাবে কম। এর ফলে আশা করা হচ্ছে যে ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ এই টিকা নিতে পারবেন এবং সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধে বড় সাফল্য আসবে। অন্যদিকে লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বহু বছর ধরেই হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এই টিকা শুধু লিভারের সংক্রমণই প্রতিরোধ করে না, ভবিষ্যতে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করে।

হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন সাধারণত নবজাতক শিশুদের দেওয়া হয়। এছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী, যারা আগে এই টিকা নেননি বা যারা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত—তাদেরও এই টিকা নেওয়া উচিত। এই ভ্যাকসিন সাধারণত তিনটি ডোজে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর এক মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ এবং ছয় মাস পরে তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়। হেপাটাইটিস বি টিকার দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। একটি ডোজের দাম সাধারণত ২০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে হয়। তিনটি ডোজ মিলিয়ে মোট খরচ হতে পারে ৬০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। অনেক সরকারি হাসপাতালে আবার এই টিকাও বিনামূল্যে দেওয়া হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অনেক সময় এর খরচ লাখ থেকে কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে প্রতিষেধক নেওয়ার খরচ অনেক কম। তাই ক্যান্সার হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

তবে শুধু ভ্যাকসিন নিলেই যে ক্যান্সার সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা যাবে, তা নয়। চিকিৎসকদের মতে, এই টিকা ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়, কিন্তু শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। তাই প্রতিষেধকের পাশাপাশি আরও কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চলা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে। ধূমপান ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ধূমপান ফুসফুস, মুখগহ্বর, গলা এবং অগ্ন্যাশয়সহ বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। খাদ্য তালিকায় সবুজ শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য এবং পর্যাপ্ত জল রাখা উচিত। প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়াই ভালো। নিয়মিত শরীরচর্চাও শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং অনেক রোগের ঝুঁকি কমে যায়। একইসঙ্গে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত ওজন অনেক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

কিছু ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সার্ভিক্যাল ক্যান্সার শনাক্ত করতে প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট, স্তন ক্যান্সারের জন্য ম্যামোগ্রাফি এবং কোলন ক্যান্সারের জন্য কোলনোস্কোপি করা হয়। ভারতের অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনও ক্যান্সার প্রতিষেধক সম্পর্কে সচেতনতা খুবই কম। অনেক মানুষ জানেনই না যে এমন টিকা রয়েছে যা ভবিষ্যতে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। অনেক সময় কুসংস্কার, ভুল ধারণা বা অর্থনৈতিক সমস্যার কারণেও মানুষ টিকা নিতে আগ্রহী হন না। তাই সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ভারত সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে। অনেক রাজ্যে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের জন্য HPV ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনেক সময় কম খরচে বা বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ক্যান্সার প্রতিরোধে আরও নতুন ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই ফুসফুসের ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার এবং মেলানোমার মতো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক তৈরির জন্য গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে যদি এই গবেষণা সফল হয়, তাহলে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই অনেক সহজ হয়ে যাবে। সবশেষে বলা যায়, ক্যান্সার আজ বিশ্বজুড়ে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন প্রতিরোধের পথও খুলে গেছে। সার্ভিক্যাল ক্যান্সার ও লিভার ক্যান্সারের মতো কিছু মারাত্মক রোগের ক্ষেত্রে প্রতিষেধক ইতিমধ্যেই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে এই টিকা নেওয়া সম্ভব এবং এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বড় বিপদ এড়ানো যায়। তাই সচেতন হওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সময়মতো প্রতিষেধক গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সতর্কতা, সচেতনতা এবং সময়মতো প্রতিরোধ।

Archive

Most Popular