11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

এবার আর উত্তরবঙ্গ কিংবা উত্তরাখণ্ড নয়, চলুন ঘুরে আসি দক্ষিণ ভারতের এভারেস্ট ‘আনামুদি’ থেকে!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


ভারতের পাহাড় মানেই অনেকের চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং কিংবা উত্তরাখণ্ডের নৈনিতাল, মুসৌরি বা আউলি। পাহাড়ি ভ্রমণের কথা উঠলেই বেশিরভাগ পর্যটক উত্তর ভারতের দিকেই ছুটে যান। কিন্তু অনেকেই জানেন না, দক্ষিণ ভারতেও রয়েছে এমন এক বিস্ময়কর পাহাড়, যাকে বলা হয় দক্ষিণ ভারতের ‘এভারেস্ট’। এই পাহাড়ের নাম আনামুদি। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই পাহাড়টি অবস্থিত কেরালার ইদুক্কি জেলায়, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্তর্গত এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যানে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আনামুদির উচ্চতা প্রায় ২৬৯৫ মিটার, যা দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। তাই স্বাভাবিকভাবেই এটিকে দক্ষিণ ভারতের ‘এভারেস্ট’ বলা হয়।আনামুদি নামটিরও একটি মজার অর্থ রয়েছে। মালয়ালম ভাষায় ‘আনা’ শব্দের অর্থ হাতি এবং ‘মুদি’ শব্দের অর্থ মাথা বা কপাল। পাহাড়টির গঠন অনেকটা হাতির কপালের মতো হওয়ায় এর নাম রাখা হয়েছে আনামুদি। দূর থেকে তাকালে পাহাড়ের ঢাল আর গোলাকার চূড়া সত্যিই হাতির মাথার মতো মনে হয়। এই অঞ্চলের প্রকৃতি এতটাই অনন্য যে এখানে গেলে মনে হয় যেন এক অন্য জগতে এসে পড়েছেন। সবুজে মোড়া পাহাড়ি ঢাল, মেঘের ভেলা, দূরে বিস্তৃত চা-বাগান আর শীতল হাওয়া সব মিলিয়ে পরিবেশটি একেবারে স্বপ্নের মতো। যারা প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই জায়গাটি এক কথায় স্বর্গ।আনামুদি ভ্রমণের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। এই অভয়ারণ্যটি মূলত বিরল প্রজাতির নীলগিরি তাহর সংরক্ষণের জন্য বিখ্যাত। নীলগিরি তাহর হলো এক ধরনের পাহাড়ি ছাগল, যা দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই প্রাণীকে কাছ থেকে দেখার জন্য সারা বছরই বহু পর্যটক এখানে ভিড় করেন। এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান শুধু প্রাণিজগতের জন্যই নয়, উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পাহাড়ি ঘাসের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, নানা ধরনের গাছপালা এবং বুনো ফুলে ভরা এই অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা এনে দেয়। বিশেষ করে বর্ষা বা বর্ষার পরবর্তী সময়ে এখানে সবুজের সমারোহ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।এই অঞ্চলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হল নীলাকুরিঞ্জি ফুল। এই বিরল ফুল প্রতি বারো বছর অন্তর একসঙ্গে ফোটে এবং তখন পুরো পাহাড়ি এলাকা নীল রঙে ঢেকে যায়। সেই দৃশ্য দেখতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন। যদিও এই ফুলের দেখা পাওয়া খুবই বিরল, তবুও আনামুদি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সারা বছরই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। আনামুদি ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয় বেস ক্যাম্প হলো মুনার। কেরালার অন্যতম বিখ্যাত পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র মুনার থেকে আনামুদি খুব কাছেই। তাই বেশিরভাগ পর্যটক মুনারেই থাকেন এবং সেখান থেকে আনামুদি ও আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখেন।মুনারের সৌন্দর্যও কম নয়। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় আর ঠান্ডা আবহাওয়া—সব মিলিয়ে এটি একটি আদর্শ হিল স্টেশন। ভোরের আলোয় চা-বাগানের সবুজ ঢেউ আর দূরে পাহাড়ের সারি দেখে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এক অসাধারণ ছবি এঁকেছে। আনামুদি অঞ্চলে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতাও অনেক পর্যটকের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। যদিও মূল শৃঙ্গে ওঠার জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়, তবুও আশেপাশের পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করা যায়। এই ট্রেকিংয়ের সময় পথের দুই পাশে ঘন সবুজ প্রকৃতি আর দূরের পাহাড়ের দৃশ্য সত্যিই মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।ভ্রমণের জন্য এই অঞ্চলে আসার সেরা সময় সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে শীতল ও আরামদায়ক থাকে। বর্ষাকালে প্রকৃতি অত্যন্ত সুন্দর হলেও ভারী বৃষ্টির কারণে ভ্রমণ কিছুটা অসুবিধাজনক হতে পারে।

কলকাতা বা পূর্ব ভারতের অন্যান্য শহর থেকে আনামুদি অঞ্চলে যেতে হলে প্রথমে কেরালার কোচি শহরে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে সড়কপথে মুনার যাওয়া যায়। কোচি থেকে মুনারের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। পাহাড়ি রাস্তা ধরে এই যাত্রাটিও বেশ মনোরম। ভ্রমণের সময় স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের স্বাদ নেওয়াও একটি বড় অভিজ্ঞতা হতে পারে। কেরালার ঐতিহ্যবাহী খাবার, নারকেল ও মশলার বিশেষ ব্যবহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় রান্নার স্বাদ পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ যখন একটু শান্তি আর প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ খোঁজেন, তখন আনামুদি সেই অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে। এখানে এসে শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্যে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়।ভারতের পাহাড় মানেই শুধু উত্তর ভারতের হিল স্টেশন নয়। দক্ষিণ ভারতেও রয়েছে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা বহু পাহাড়ি অঞ্চল। আনামুদি তার মধ্যেই অন্যতম। সবুজ পাহাড়, বন্যপ্রাণী, চা-বাগান আর শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি একটি অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দিতে পারে। তাই পরেরবার যদি পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাহলে চেনা পথ ছেড়ে একবার দক্ষিণ ভারতের এই ‘এভারেস্ট’-এর দিকেও চোখ রাখতে পারেন।

Archive

Most Popular