19th Feb 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

এবার ছুটি কাটাতে পারেন রাজপ্রাসাদে!

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি


আজকের ব্যস্ত জীবনে ছুটি মানেই আমরা ভাবি পাহাড়, সমুদ্র বা জঙ্গলে বেড়ানো। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, ছুটি কাটাতে পারেন এক রাজপ্রাসাদে? যেখানে আপনি হবেন অতিথি, আর আতিথ্য দেবেন ইতিহাস নিজে। প্রাচীন রাজবাড়ির নকশা, মার্বেল মেঝে, বিশাল বারান্দা, পুরনো ঝাড়বাতি, আর রাজকীয় ভোজন সব মিলিয়ে এমন অভিজ্ঞতা, যা একদিকে আপনাকে নিয়ে যাবে অতীতে, অন্যদিকে দেবে বিলাসিতার স্বাদ। বাংলার রাজপ্রাসাদগুলো আজ আর কেবল ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ নয়; অনেক রাজবাড়ি আজ হেরিটেজ হোটেলে পরিণত হয়েছে, যেখানে পর্যটকরা থাকতে পারেন রাজা-রানির মতো। এই প্রবন্ধে আমরা ঘুরে দেখব সেইসব রাজপ্রাসাদের কাহিনি যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে মিলেছে আতিথ্যের আনন্দ। বাংলা ও ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রাজপ্রাসাদ, যেগুলো একসময় ছিল শক্তি, সংস্কৃতি ও শৌখিনতার কেন্দ্র। এখন সেগুলো রূপান্তরিত হয়েছে “হেরিটেজ রিসর্ট” বা “বুটিক প্যালেস হোটেল”-এ। সেখানে থাকাটা মানে, যেন ইতিহাসের কোলে নিদ্রা যাওয়া।


১. রাজবাড়ি বল্লভপুর

বল্লভপুর রাজবাড়ির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। একসময় বর্ধমান রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ মিত্র বল্লভপুরের রাজারা তাঁদের রেশম বাণিজ্যের সাফল্যে নির্মাণ করেছিলেন এই ঐশ্বর্যমণ্ডিত প্রাসাদ। আজ এই রাজবাড়ি “The Rajbari Bawali Resort”-এর মতোই এক অসাধারণ হেরিটেজ স্টে হিসেবে পরিচিত। ৫০ একর জমির ওপর তৈরি এই প্রাসাদে রয়েছে সাদা-লাল পাথরের দালান, ঝাড়বাতি, মুরালস, আর পুরনো আসবাব। প্রতিটি ঘরেই আছে রাজকীয় সজ্জা ও আধুনিক সুবিধা। প্রাতঃরাশে পরিবেশিত হয় স্থানীয় বাউল সংগীতের সঙ্গে বাঙালি রান্না, আর সন্ধ্যায় ডিনারে থাকে রাজকীয় মেনু মাছ, মাংস, মিষ্টি আর শালপাতায় পরিবেশিত পানীয়। এখানে ছুটি মানে শুধু বিশ্রাম নয় গ্রামীণ বাংলার সৌন্দর্য, ইতিহাসের গন্ধ, আর রাজকীয়তার মিশ্রণ।

২. রাজবাড়ি বাওয়ালি

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাওয়ালি গ্রামের রাজবাড়িটি ছিল বারদীঘি জমিদার পরিবারের বাসস্থান। ৩০০ বছরের পুরনো এই বাড়িটি বহু বছর অবহেলায় ভেঙে পড়েছিল। পরে উদ্যোক্তা ধ্রুব মুখার্জি এই বাড়িটিকে পুনর্নির্মাণ করে এক চমৎকার Heritage Boutique Resort-এ রূপান্তর করেন। এখানে রাজকীয় স্যুইটগুলির ছাদে রয়েছে উঁচু খিলান, সোনালি আলোয় আলোকিত ঝাড়বাতি, প্রাচীন কাঠের খাট। সন্ধ্যায় রাজবাড়ির আঙিনায় বসে অতিথিরা উপভোগ করতে পারেন বাউল গান বা রবীন্দ্রসংগীত। বাওয়ালির রাজবাড়িতে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী বাঙালি থালা চিংড়ি মালাইকারি, কাতলা কষা, মটন চাপ, সঙ্গে দই ও মিষ্টি। স্থানীয় উপকরণে রান্না করা এই খাবার যেন অতীতের স্বাদ ফিরিয়ে আনে।

৩. রাজবাড়ি রায়গড়

ওড়িশার রায়গড় রাজবাড়ি ছিল কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের উত্তরসূরিদের গৃহ। ব্রিটিশ আমলে এখানকার রাজারা রাজনীতি ও শিল্প দুটোরই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এখন এই রাজবাড়িটি “Raigarh Palace Resort” নামে পরিচালিত হয়। এখানে অতিথিরা ঘুরে দেখতে পারেন রাজকীয় আর্ট গ্যালারি, প্রাচীন সিংহাসন, ও পাথরের মূর্তি। প্রতিটি ঘরে রয়েছে পুরনো রাজীয় আসবাবের প্রতিলিপি। সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় ওড়িশি নৃত্য ও লোকসঙ্গীত অনুষ্ঠান যা আপনাকে নিয়ে যাবে রাজকীয় সভার আবহে।


৪. রাজবাড়ি নাটোর 

বাংলাদেশের নাটোর রাজবাড়ি একসময় ছিল “রানি ভবানী”-র আস্তানা। তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম দানশীলা নারী। এই রাজপ্রাসাদে রয়েছে ১৬টি বৃহৎ প্রাসাদ, একাধিক জলাশয় ও শিবমন্দির। নাটোর রাজবাড়ির একটি অংশ সরকারি হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষিত, এবং দর্শনার্থীরা অনুমতি নিয়ে এখানে থাকতে পারেন। স্থানীয় সংস্কৃতি, রন্ধন, সংগীত—সব মিলিয়ে এটি আজও এক রাজকীয় ছুটির আদর্শ গন্তব্য।


৫. রাজবাড়ি বিষ্ণুপুর 

বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ি মল্লরাজাদের ঐতিহ্য বহন করে। টেরাকোটার মন্দির, রসগোল্লা, আর বালুচরী শাড়ির জন্য প্রসিদ্ধ এই শহরে রাজবাড়ির গরিমা আজও অবিচল। এখানে “Rajbari Lodge” নামের একটি হেরিটেজ স্টে গড়ে উঠেছে, যেখানে পর্যটকরা পেতে পারেন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। রাজকীয় স্যুইটে থাকতে থাকতে সকালে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি, সন্ধ্যায় বাজে বাউল গান।


৬. নদিয়ার রাজবাড়ি 

কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি গড়ে ওঠে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে (১৮শ শতক)। এই রাজবাড়ি শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। এখানেই জন্ম নেয় কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল শিল্প। আজ রাজবাড়ির একটি অংশ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। মাঝে মাঝে বিশেষ অনুমতিতে এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও হেরিটেজ স্টে আয়োজন করা হয়। রাজবাড়ির আশেপাশে আপনি দেখতে পারেন পুরনো মন্দির, নদীয়ার হস্তশিল্প বাজার ও দুধের মিষ্টির দোকান।  

৭. নটচন্দ্র রাজবাড়ি 

মুর্শিদাবাদের রাজবাড়িগুলো বাংলার নবাবি ঐতিহ্যের প্রতীক। নটচন্দ্র রাজবাড়ি ছিল নবাবদের নিকটস্থ জমিদার পরিবারের বাড়ি, যেখানে আজও সংরক্ষিত আছে সেই সময়কার সোনার আসবাব, গাড়ি ও অস্ত্র। আজ এই রাজবাড়িটি আংশিকভাবে সংস্কার করে অতিথিশালা রূপে খোলা হয়েছে। আপনি চাইলে এখানে থাকতে পারেন, খেতে পারেন নবাবি বিরিয়ানি ও মিষ্টি দই, আর বিকেলে হাঁটতে পারেন ভাগীরথীর তীরে।


৮. জয়পুর ও উদয়পুরের রাজপ্রাসাদ 

যদি আপনি বাংলার বাইরে রাজকীয়তার প্রকৃত স্বাদ নিতে চান, তবে রাজস্থানই শ্রেষ্ঠ গন্তব্য। জয়পুরের “Rambagh Palace”, উদয়পুরের “City Palace”, ও যোধপুরের “Umaid Bhawan Palace”—এই তিনটি রাজপ্রাসাদেই আজ পাঁচতারা হেরিটেজ হোটেল পরিচালিত হয়। এখানে আপনি ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রাসাদ পরিদর্শন করতে পারেন, রাজকীয় ভোজসভায় অংশ নিতে পারেন, এমনকি প্রাচীন রাজপুত বংশের কাহিনি শুনতে পারেন স্থানীয় গাইডের মুখে। মার্বেল-পাথরে মোড়া প্রাসাদে রাত কাটানো মানে ইতিহাসের সঙ্গে মিলন।


৯. রাজবাড়ি শীতলখুচি 

কোচবিহারের শীতলখুচি রাজবাড়ি ইউরোপীয় স্থাপত্যে নির্মিত, যেখানে রয়েছে কলাম, গম্বুজ, ও বিশাল বাগান। এটি মূলত ব্রিটিশ আমলের “ডাচ বাঙলা স্টাইল”-এর অন্যতম সেরা নিদর্শন। বর্তমানে এই রাজবাড়িটি আংশিকভাবে হেরিটেজ রিসর্টে পরিণত হয়েছে। এখানে অতিথিরা পেতে পারেন ঘোড়ার গাড়ি ভ্রমণ, মিউজিয়াম ট্যুর, আর কুঁড়েঘরে রাজকীয় খাবার—যা একেবারেই ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা।


১০. রাজবাড়ি পলাশবাড়ি

মালদার পলাশবাড়ির রাজবাড়ি ১৯শ শতকের শেষের দিকে তৈরি। এই বাড়ির স্থাপত্যে দেখা যায় মুঘল ও ব্রিটিশ শৈলীর সংমিশ্রণ। এখন এটি একটি “Eco Heritage Stay”, যেখানে জৈব চাষের মাঠ, জলাশয়, এবং স্থানীয় কারিগরদের তৈরি আসবাবপত্র ব্যবহার করা হয়। এখানে রাত কাটানো মানে প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও রাজকীয়তার মিশ্র অনুভূতি।


কেন রাজপ্রাসাদে ছুটি কাটাবেন?

  1. ইতিহাসের সংস্পর্শে আসা: প্রতিটি প্রাসাদে লুকিয়ে আছে শত বছরের কাহিনি।

  2. সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা: স্থানীয় সংগীত, নৃত্য, খাবার ও পোশাকে মিশে আছে ঐতিহ্য।

  3. শান্তি ও বিলাসিতা: শহরের কোলাহল থেকে দূরে, অথচ রাজকীয় আরামে।

  4. স্থানীয় অর্থনীতিতে সহায়তা: হেরিটেজ পর্যটন গ্রামীণ মানুষকে নতুন কর্মসংস্থান দেয়।

  5. ইকো-ট্যুরিজম ও সংরক্ষণ: রাজবাড়িগুলো রক্ষা করা মানে সংস্কৃতি রক্ষা করা।


ভ্রমণ টিপস

  • বুকিংয়ের আগে রিসর্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করে নিন।

  • স্থানীয় গাইড নিন, যাতে ইতিহাসের তথ্য ভালোভাবে জানতে পারেন।

  • রাজবাড়ির আসবাব বা মিউজিয়াম স্পর্শ করা এড়িয়ে চলুন।

  • স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতিকে সম্মান করুন।

একটা সময়ে রাজপ্রাসাদ মানে ছিল বিলাসিতা, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু আজ সেই প্রাসাদগুলিই খুলে দিয়েছে দরজা আপনার মতো পর্যটকদের জন্য। আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন, স্থাপত্যে মুগ্ধ হন, কিংবা একটু অন্যরকম ছুটি কাটাতে চান তবে রাজবাড়ির ছুটি হতে পারে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।মেঘলা সকালে প্রাসাদের বারান্দায় চা, বিকেলের সূর্যাস্তে ঝাড়বাতির আলোয় ডিনার, আর রাতের নিস্তব্ধতায় রাজকীয় সুর এ যেন অতীতের রূপকথা আজ বাস্তবের ছোঁয়া পাচ্ছে। তাই এবারের ছুটিতে পাহাড় বা সমুদ্র নয়, ঘুরে আসুন এক রাজপ্রাসাদে। ইতিহাস আপনাকে স্বাগত জানাবে রাজকীয় আতিথ্যে, ঐতিহ্যের সৌন্দর্যে, আর এক অবিস্মরণীয় ছুটির স্বপ্নে।

Archive

Most Popular