ভ্রমণ
নিজস্ব প্রতিনিধি
দুর্গাপুজো বাঙালির প্রাণের উৎসব। পুজোর দিনগুলোয় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরজুড়ে আলো, রঙ, গান, গন্ধ, ঢাকের বাদ্য, মণ্ডপসজ্জা আর প্রতিমার মহিমায় মেতে ওঠে প্রত্যেক মানুষ। কলকাতা তখন যেন এক বিশাল মেলার মাঠ প্রতিটি পাড়ায় প্যান্ডেল, প্রতিটি রাস্তায় মানুষের ঢল, প্রতিটি কোণায় আনন্দের জোয়ার। তবে এই আনন্দময় উচ্ছ্বাসের মধ্যেও অনেকেই চান ভিন্ন স্বাদ। শহরের ভিড়, যানজট আর হৈচৈ থেকে বেরিয়ে একটু প্রকৃতির কাছাকাছি, একটু নিরিবিলি পরিবেশে কয়েকটা সময় কাটানো যেন পূজোর ছুটির অন্যতম আনন্দ। আসলে উৎসব মানেই কেবল শহরের কোলাহল নয়; বরং জীবনের গতি থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে পরিবার, আত্মীয় বা বন্ধুদের সঙ্গে দূরে কোথাও চলে যাওয়াই প্রকৃত আনন্দের পরিপূরক। বিশেষত দুর্গাপুজোর সময় হাতে কয়েক দিনের ছুটি থাকে, আবহাওয়াও থাকে মনোরম। বর্ষার ভিজে মেঘ তখন অনেকটা সরে গিয়েছে, আর শীতও পুরোপুরি এসে পড়েনি এই সময় ভ্রমণের জন্য একেবারে উপযুক্ত। তাই কলকাতার মানুষরা চিরকাল পুজোর দিনগুলোয় কাছাকাছি কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
কলকাতার আশেপাশে রয়েছে বহু গন্তব্য, যেগুলি একইসঙ্গে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। শান্তিনিকেতন যেমন শিল্প-সংস্কৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার, তেমনই দিঘা বা মন্দারমণি নিয়ে আসে সমুদ্রের উচ্ছ্বাস। আবার সুন্দরবন তার অরণ্য, নদী আর রহস্যময় সৌন্দর্য দিয়ে মোহিত করে ভ্রমণপিপাসুদের। অন্যদিকে চন্দননগরের মতো শহর অতীতের ফরাসি উপনিবেশের ছাপ বহন করে এখনও। কলকাতার আশেপাশের এই গন্তব্যগুলি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় কারণ এখানে পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগে না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। পুজোর সময় শহরের ভেতরে মণ্ডপ ঘোরার আলাদা মজা আছে ঠিকই, তবে একইসঙ্গে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়াটাও প্রয়োজন। একদিকে দেবী দুর্গার আরাধনা, অন্যদিকে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে নতুন জায়গা দেখা এই সমন্বয়েই উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায়। ভ্রমণের মাধ্যমে আমরা কেবল নতুন পরিবেশের স্বাদ পাই না, আমাদের সম্পর্কও আরও গভীর হয়। একসঙ্গে সময় কাটানো, নতুন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এগুলোই আমাদের উৎসবকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
তাই এবারের দুর্গাপুজোয় যদি আপনি ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে একটু অন্যরকম সময় কাটাতে চান, তবে কলকাতার কাছাকাছি কয়েকটি মনোরম জায়গা আপনাকে দেবে সেই সুযোগ। শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ, সমুদ্রের ঢেউ, গঙ্গার ধারে হাঁটা বা লোকশিল্পীদের সৃষ্টিশীল আবহ সবই রয়েছে এই গন্তব্যগুলির মধ্যে। একদিনের জন্য হোক বা দু’দিনের ছোট সফরে, এই জায়গাগুলি আপনার পূজোর ছুটিকে করে তুলতে পারে আরও বিশেষ। সুতরাং, দুর্গাপূজোর মণ্ডপসজ্জার মতোই এবার ভ্রমণ-পরিকল্পনায়ও হোক নতুন রঙের ছোঁয়া। কলকাতার কাছাকাছি কয়েকটি গন্তব্যে ঘুরে আসা শুধু শরীর-মনের ক্লান্তি দূর করবে না, বরং উৎসবের আনন্দকে করবে বহুগুণে বাড়িয়ে। এবার তবে জেনে নেওয়া যাক কলকাতার কাছাকাছি পুজোয় ঘুরতে যাওয়ার ৬টি জায়গার হদিশ।
দূরত্ব: প্রায় ১৬০ কিমি (রাস্তায় ৩.৫–৪ ঘণ্টা)
কেন যাবেন: শান্ত পরিবেশ, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি, শিল্পের আবহ—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
কি করবেন: বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, আম্রকানন, ছাতিমতলা, কলাভবন, স্থানীয় হস্তশিল্প কেনাকাটা।
বিশেষত্ব: পুজোর সময় এখানকার বোলপুর হাটে লোকশিল্পীদের ভিড় জমে ওঠে।
দূরত্ব: প্রায় ১৮০ কিমি (৪–৫ ঘণ্টা)
কেন যাবেন: সমুদ্র ভালোবাসলে পুজোর সময় মন্দারমণি দারুণ অপশন।
কি করবেন: সাগর তটে হাঁটা, সমুদ্রের ঢেউয়ের খেলা দেখা, ঝাউবনের পাশে সময় কাটানো।
বিশেষত্ব: লম্বা ড্রাইভিং বিচ, হালকা জনসমাগম, নিরিবিলি পরিবেশ।
দূরত্ব: প্রায় ৫০ কিমি (১.৫ ঘণ্টা)
কেন যাবেন: ফরাসি উপনিবেশের স্মৃতি ও গঙ্গার ধারে অপূর্ব সৌন্দর্য।
কি করবেন: স্ট্র্যান্ডে হাঁটা, চন্দননগর মিউজিয়াম, পুরোনো গির্জা দর্শন।
বিশেষত্ব: রাতে আলোকসজ্জা আর গঙ্গার ধারে মেলা—পুজোর আমেজে রঙিন।
দূরত্ব: প্রায় ৪০ কিমি
কেন যাবেন: প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ, নদী ও সবুজে ঘেরা।
কি করবেন: দিন কাটানো, ফটোগ্রাফি, পিকনিক।
বিশেষত্ব: শহরের ভিড় এড়িয়ে পরিবারের সঙ্গে আরাম করে পুজোর ছুটি কাটানোর আদর্শ স্থান।
দূরত্ব: প্রায় ১৮৫ কিমি (৪.৫ ঘণ্টা)
কেন যাবেন: পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত।
কি করবেন: সৈকতে হাঁটা, সামুদ্রিক খাবার খাওয়া, নিউ দিঘা অ্যাকোয়ারিয়াম দেখা।
বিশেষত্ব: পুজোর সময় দিঘায় পর্যটকের ভিড় হলেও এর আলাদা রোমাঞ্চ থাকে।
দূরত্ব: গোসাবা পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিমি (তারপর নৌকায়)
কেন যাবেন: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস।
কি করবেন: নৌকাভ্রমণ, বনভ্রমণ, স্থানীয় গ্রাম দেখা।
বিশেষত্ব: প্রকৃতির কোলে পুজোর ছুটি কাটানোর অনন্য অভিজ্ঞতা।
কলকাতার কাছেই রয়েছে শান্তিনিকেতন থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত অসংখ্য মনোরম গন্তব্য। পুজোর দিনগুলোয় শহরের মণ্ডপে ঘোরা যেমন অপরিহার্য, তেমনই সময় করে একদিন বা দু’দিন বেরিয়ে পড়া আপনাকে এনে দেবে অন্যরকম আনন্দ। তাই এবারের পুজোয় শুধু কলকাতার আলো নয়, প্রকৃতি, ইতিহাস আর সমুদ্রের ডাকও শোনা যাক।