11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ঘাড় গুঁজে কাজ করে বেঁকে গিয়েছে পিঠ? কী করবেন?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্তমান কর্মজীবনের একটি বড় বাস্তবতা হল দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করা। অফিস হোক বা বাড়ি কম্পিউটার, ল্যাপটপ কিংবা মোবাইলের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানো এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস। কাজের চাপ, সময়সীমা এবং ব্যস্ততার কারণে অনেকেই খেয়ালই করেন না যে কখন ধীরে ধীরে শরীরের ভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। ঘাড় সামনে ঝুঁকে পড়ছে, পিঠ বাঁকা হয়ে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে ব্যথা ও অস্বস্তি। অনেকেই এটাকে সাধারণ ক্লান্তি বলে এড়িয়ে যান, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে তা শরীরের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

মানবদেহের মেরুদণ্ড এমনভাবে তৈরি যে এটি সোজা অবস্থায় থাকলে শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে যারা সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, কাজ করতে করতে মানুষ অজান্তেই সামনে ঝুঁকে পড়ছেন। এতে ঘাড় ও কাঁধের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং পিঠের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সমস্যাকে অনেক সময় “টেক নেক” বা “টেক্সট নেক” বলেও উল্লেখ করা হয়। মোবাইল ফোনের দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার ফলে ঘাড়ের পেশির উপর যে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তার ফলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, কাঁধে ব্যথা, পিঠে টান লাগা বা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

পিঠ বাঁকা হয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হল দীর্ঘ সময় ধরে একই ভঙ্গিতে বসে থাকা। আমাদের শরীর নিয়মিত নড়াচড়া করার জন্য তৈরি। কিন্তু যখন আমরা একটানা কয়েক ঘন্টা একইভাবে বসে থাকি, তখন পেশি ও জয়েন্টের উপর চাপ বাড়তে থাকে। এতে পিঠের পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি নষ্ট হতে শুরু করে। তবে সুখবর হল, এই সমস্যার অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রথমেই যেটা জরুরি, তা হল নিজের বসার ভঙ্গির দিকে সচেতন হওয়া। কাজ করার সময় পিঠ সোজা রাখা এবং কাঁধ শিথিল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারের সঙ্গে পিঠ পুরোপুরি ঠেকিয়ে বসা উচিত। অনেক বিশেষজ্ঞই বলেন, এমন চেয়ার ব্যবহার করা ভালো যাতে পিঠের নিচের অংশে যথেষ্ট সমর্থন থাকে।

কম্পিউটারের স্ক্রিনের উচ্চতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্ক্রিন যদি খুব নিচে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ঘাড় ঝুঁকে যায়। তাই স্ক্রিন এমন উচ্চতায় রাখা উচিত যাতে চোখের সমতলে থাকে। এতে ঘাড় সোজা রাখা সহজ হয়। একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়াও খুব জরুরি। প্রতি ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট অন্তর কয়েক মিনিটের জন্য উঠে দাঁড়ানো, হাঁটা বা হালকা স্ট্রেচিং করলে শরীর অনেকটাই স্বস্তি পায়। এতে পেশিগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যথার সম্ভাবনা কমে।

শরীরচর্চাও এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পিঠ ও কাঁধের পেশি শক্তিশালী হয়। যোগব্যায়াম, স্ট্রেচিং বা হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে পিঠ ও কাঁধের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এই ক্ষেত্রে উপকারী। ঘুমের ভঙ্গিও অনেক সময় পিঠের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার করলে ঘাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তাই মাঝারি উচ্চতার বালিশ ব্যবহার করা ভালো, যাতে ঘাড় ও মেরুদণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই শরীরের ছোটখাটো ব্যথাকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু পিঠে ব্যথা বা ঘাড়ে টান দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক সময় ফিজিওথেরাপি বা বিশেষ ব্যায়ামের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যদি শরীরের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই কাজের ফাঁকে শরীরের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিঠ বাঁকা হয়ে যাওয়া বা ঘাড়ে ব্যথা এই সমস্যাগুলো আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও সচেতনতা থাকলে এগুলো অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলাই পারে এই সমস্যার সহজ সমাধান হতে। শরীর আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই তার যত্ন নেওয়াই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Archive

Most Popular