11th Jun 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

গরম পড়তেই শরীরে জলশূন্যতা! ডিহাইড্রেশন এড়াতে কী খাবেন, কী এড়াবেন?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


এপ্রিল মাস পড়তেই প্রকৃতির রূপ যেন এক লহমায় বদলে যায়। বসন্তের নরম হাওয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে জায়গা করে দেয় তীব্র গরমকে। দুপুরের রোদ যেন আগুন ঝরায়, আর এই সময়েই আমাদের শরীর পড়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে—জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন। অনেকেই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না, ভাবেন জল তো খাচ্ছিই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শুধুমাত্র জল খেলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না; কীভাবে শরীর জল ধরে রাখছে, কী খাওয়া হচ্ছে, আর শরীরের প্রয়োজন ঠিক কতটা এসবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডিহাইড্রেশন আসলে এমন একটি অবস্থা, যখন শরীর থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জল বেরিয়ে যায় এবং সেই ঘাটতি পূরণ হয় না। গরমকালে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। শুধু জল নয়, সঙ্গে বেরিয়ে যায় সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট। এই ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হলেই শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে শুরু করে। ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এই সব সমস্যাগুলো একে একে দেখা দিতে থাকে।

ডিহাইড্রেশন ধীরে ধীরে শরীরকে গ্রাস করে, তাই অনেক সময় শুরুতে বিষয়টি বোঝা যায় না। কিন্তু শরীর কিছু সংকেত দেয়, যেগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। যেমন বারবার তৃষ্ণা পাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা মাথা ঘোরা এই লক্ষণগুলো দেখলেই সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ এই ছোট ছোট উপসর্গই বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা। গরমকালে এমন খাবার বেছে নেওয়া উচিত, যা শরীরকে শুধু পুষ্টিই দেবে না, একই সঙ্গে হাইড্রেটেডও রাখবে। জলসমৃদ্ধ ফল এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর। তরমুজ, বাঙ্গি, শসার মতো ফলগুলিতে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে, যা শরীরের জলের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। বিশেষ করে দুপুরের গরমে এক বাটি তরমুজ বা শসার সালাদ শরীরকে অনেকটা সতেজ করে তোলে।

ডাবের জল গরমকালের এক অমূল্য উপহার। এটি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, শরীরে হারিয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রোলাইটও পূরণ করে। রোদ থেকে ফিরে এক গ্লাস ডাবের জল পান করলে শরীর দ্রুত চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি লেবুর শরবতও অত্যন্ত উপকারী। লেবুতে থাকা ভিটামিন সি শরীরকে সতেজ রাখে, আর সামান্য নুন-চিনি মিশিয়ে নিলে এটি প্রাকৃতিক ওআরএস-এর মতো কাজ করে।

দই বা ঘোলও গরমকালের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এগুলো শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে। বিশেষ করে দুপুরের খাবারের সঙ্গে এক বাটি দই বা এক গ্লাস ঘোল শরীরকে অনেকটা স্বস্তি দেয়। একইভাবে টমেটো, শসা, নারকেলের মতো খাবারও শরীরের জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

তবে শুধু কী খাবেন সেটাই নয়, কী খাবেন না সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই গরমে ঠান্ডা লাগার জন্য সফট ড্রিঙ্ক বা কোল্ড ড্রিঙ্কের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এগুলোতে থাকা অতিরিক্ত চিনি শরীরকে আরও ডিহাইড্রেট করে। একইভাবে অতিরিক্ত চা বা কফিও শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর, কারণ এতে থাকা ক্যাফেইন শরীর থেকে জল বের করে দেয়।

গরমে ভাজাভুজি বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার খাওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত। এই ধরনের খাবার শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ঘাম বেশি হয়, ফলে শরীর দ্রুত জলশূন্য হয়ে পড়ে। অ্যালকোহলও এই সময়ে খুবই ক্ষতিকর, কারণ এটি শরীরের জল ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

ডিহাইড্রেশন এড়াতে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন বাইরে বেরোলে সবসময় সঙ্গে জল রাখা, রোদে যাওয়ার আগে জল খেয়ে নেওয়া, এবং একসঙ্গে বেশি জল না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার জল পান করা—এই অভ্যাসগুলো খুবই কার্যকর। এছাড়া খুব বেশি রোদে না থাকা এবং হালকা, আরামদায়ক পোশাক পরাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হয় শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে। তাদের শরীর দ্রুত জল হারায় এবং অনেক সময় তারা তৃষ্ণা অনুভব করতে পারেন না। ফলে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। তাই নিয়মিত তাদের জল খাওয়ানো এবং শরীরের লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।

গরমকাল আমাদের শরীরের জন্য একটি পরীক্ষা। এই সময়ে সামান্য অসাবধানতা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। কিন্তু সচেতন থাকলে এবং কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে এই সমস্যাকে সহজেই এড়ানো সম্ভব। সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত জল এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস—এই তিনটি বিষয়ই গরমে সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি। তাই নিজের শরীরের যত্ন নিন, তার প্রয়োজন বুঝুন, আর এই গরমেও থাকুন প্রাণবন্ত ও সুস্থ।

Archive

Most Popular