স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
গ্রীষ্মকালে রাতের ঘুম অনেকের কাছেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত গরম, ঘাম, অস্বস্তি এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘুম বারবার ভেঙে যায়। এর ফলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি, কাজে মনোযোগের অভাব এবং নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে কিছু সহজ অভ্যাস রোজকার জীবনে অন্তর্ভুক্ত করলে গরমের মধ্যেও আরামদায়ক ও গভীর ঘুম পাওয়া সম্ভব। মানবদেহের একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ঘড়ি বা বডি ক্লক রয়েছে। ঘুমানোর আগে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে। কিন্তু গরমের সময় বাইরের উচ্চ তাপমাত্রা এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। তাই প্রথমেই ঘুমের পরিবেশকে আরামদায়ক করে তোলা জরুরি। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সম্ভব হলে সন্ধ্যার পর জানালা খুলে দিন যাতে গরম বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। ফ্যান বা এসি ব্যবহার করলে তাপমাত্রা খুব কম না রেখে স্বাভাবিক আরামদায়ক মাত্রায় রাখাই ভালো।
ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে হালকা গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জল দিয়ে স্নান করলে শরীর অনেকটা ঠান্ডা হয়। এতে শরীরের পেশি শিথিল হয় এবং ঘুম আসতে সুবিধা হয়। অনেকেই মনে করেন বরফঠান্ডা জল দিয়ে স্নান করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে, কিন্তু এতে উল্টো শরীর তাপমাত্রা ধরে রাখতে চেষ্টা করে এবং অস্বস্তি বাড়তে পারে। গরমের সময় রাতে খাবারের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। অতিরিক্ত মশলাদার, তেলযুক্ত বা ভারী খাবার হজমে সময় নেয় এবং শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাই রাতের খাবারে হালকা ভাত, ডাল, সবজি, সালাদ বা সহজপাচ্য খাবার রাখা ভালো। ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলি স্নায়ুকে সক্রিয় রাখে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।
সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গরমে শরীর থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায়। ডিহাইড্রেশন হলে মাথাব্যথা, অস্থিরতা এবং ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত জল না খাওয়াই ভালো, কারণ বারবার বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘুম ভেঙে যেতে পারে। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহারও ঘুমের বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। এসব ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো মস্তিষ্ককে জাগ্রত থাকার সংকেত দেয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়। তাই শোবার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। তার বদলে বই পড়া, হালকা গান শোনা বা ধ্যানের অভ্যাস করা যেতে পারে।
পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া দরকার। ঘুমানোর সময় ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরলে শরীর আরাম পায়। সিনথেটিক কাপড় ঘাম আটকে রাখে এবং অস্বস্তি বাড়ায়। বিছানার চাদর ও বালিশের কভারও সুতি হলে ভালো হয়। গরমে অনেকেই দুপুরে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে নেন। এতে রাতে ঘুমের ছন্দ নষ্ট হতে পারে। প্রয়োজনে দুপুরে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের বেশি না ঘুমোনোই ভালো। একই সঙ্গে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শোওয়া ও ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক নিয়মিত থাকে।
মানসিক চাপও ঘুমের অন্যতম শত্রু। কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা দুশ্চিন্তা নিয়ে বিছানায় গেলে ঘুম আসতে দেরি হয়। তাই শোবার আগে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করুন। কয়েক মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, প্রার্থনা বা মেডিটেশন উপকারী হতে পারে। গরমের রাতকে আরামদায়ক করতে ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনই বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, ঠান্ডা ও পরিষ্কার ঘুমের পরিবেশ এবং নিয়মিত রুটিন বজায় রাখলে গরমেও নিশ্চিন্তে গভীর ঘুম উপভোগ করা সম্ভব। সুস্থ শরীর ও সতেজ মনের জন্য ভালো ঘুমের কোনও বিকল্প নেই।