প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
দিনভর কাজের পর রাতের ভালো ঘুম শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেকেই অভিযোগ করেন, বিছানায় যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসে না। আবার কারও ঘুম এলেও মাঝরাতে বারবার ভেঙে যায়। এর ফলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগের অভাব এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় আমরা ঘুম না আসার জন্য মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজ বা শারীরিক সমস্যাকে দায়ী করি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শোবার ঘরের কিছু সাধারণ ভুলও ঘুমের গুণমান নষ্ট করতে পারে। অজান্তেই এমন কিছু অভ্যাস তৈরি হয়, যা মস্তিষ্ককে বিশ্রামের পরিবর্তে জাগ্রত অবস্থায় রাখে।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলির একটি হল বিছানায় শুয়ে মোবাইল, ট্যাব বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা। ঘুমানোর আগে সামাজিক মাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা বা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রামের সংকেত পায় না। ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে নির্গত নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়। শোবার ঘরে অতিরিক্ত আলোও ঘুমের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অনেকেই নাইট লাইট, টিভির আলো বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের আলো জ্বালিয়ে ঘুমান। কিন্তু অন্ধকার পরিবেশ মস্তিষ্ককে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। তাই যতটা সম্ভব ঘরকে অন্ধকার ও শান্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত।
ঘরের তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খুব বেশি গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা ঘর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরামদায়ক ও স্বস্তিকর তাপমাত্রা গভীর ঘুমের জন্য সহায়ক। তাই শোবার ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা দরকার। অনেকের অভ্যাস থাকে বিছানায় বসে অফিসের কাজ করা, খাওয়া বা দীর্ঘক্ষণ টেলিভিশন দেখা। এর ফলে মস্তিষ্ক বিছানাকে শুধু ঘুমের সঙ্গে নয়, অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত করতে শুরু করে। ফলে বিছানায় গেলেই ঘুম আসার স্বাভাবিক প্রবণতা কমে যেতে পারে। তাই বিছানাকে মূলত ঘুম এবং বিশ্রামের জন্যই ব্যবহার করা ভালো।
অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন শোবার ঘরও মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। চারপাশে অতিরিক্ত জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে অনেকের মন অজান্তেই অস্থির হয়ে ওঠে। পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল এবং শান্ত পরিবেশ ঘুমের জন্য অনেক বেশি সহায়ক। রাতের খাবারের অভ্যাসও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে। ঘুমানোর ঠিক আগে খুব ভারী, তেল-মশলাযুক্ত বা অতিরিক্ত মশলাদার খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ও ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই রাতের খাবার হালকা এবং সহজপাচ্য হওয়াই ভালো।
অনেক সময় ঘড়ির দিকে বারবার তাকানোও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। “এখনও ঘুম এল না” বা “আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর উঠতে হবে”—এই চিন্তা ঘুমকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। তাই ঘুম না এলে বারবার সময় দেখার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত। ঘুমের জন্য একটি নিয়মিত রুটিন তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ওঠার চেষ্টা করলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে। এতে ঘুমের মানও উন্নত হয়।
তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে অনিদ্রার সমস্যা চলতে থাকে, বা ঘুমের অভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে শুরু করে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কখনও কখনও অনিদ্রা অন্য কোনও শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। ভালো ঘুম কোনও বিলাসিতা নয়, সুস্থ জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। তাই ঘুমের সমস্যা হলে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে নিজের শোবার ঘর এবং দৈনন্দিন অভ্যাসগুলির দিকেও নজর দিন। অনেক সময় ছোট ছোট পরিবর্তনই আপনাকে গভীর ও আরামদায়ক ঘুমের পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।