স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
পেটে বা কুঁচকির কাছে অস্বাভাবিক ফুলে ওঠা অংশ, মাঝেমধ্যে ব্যথা কিংবা টান ধরার অনুভূতি—এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে অনেকেই প্রথমে গুরুত্ব দেন না। কেউ ভাবেন গ্যাসের সমস্যা, কেউ বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে গেলে জানা যায়, এটি হার্নিয়ার লক্ষণ। রোগটি ধরা পড়ার পর থেকেই অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, তা হল—অস্ত্রোপচার ছাড়া কি কোনও উপায় নেই? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকেই ঘরোয়া চিকিৎসা, ভেষজ উপাদান বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত নানা টোটকার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আসলে হার্নিয়া এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে পেটের পেশি বা টিস্যুর কোনও দুর্বল অংশ দিয়ে অন্ত্র বা অন্য কোনও অঙ্গ বাইরে স্ফীত হয়ে আসে। বয়স বাড়া, অতিরিক্ত ওজন, দীর্ঘদিনের কাশি, ভারী জিনিস তোলার অভ্যাস বা আগের অস্ত্রোপচারের কারণে পেটের দেয়াল দুর্বল হয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথম দিকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যথা খুব বেশি না থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। সেই কারণেই রোগীরা সহজ ও কম খরচের সমাধানের খোঁজ করেন।
বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম খুললেই নানা ধরনের দাবি চোখে পড়ে। কোথাও বলা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ খেলে হার্নিয়া সেরে যায়, কোথাও আবার বিশেষ ধরনের তেল মালিশ বা যোগব্যায়ামের মাধ্যমে অপারেশন এড়ানো সম্ভব বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের দাবির অধিকাংশেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কারণ হার্নিয়ার মূল সমস্যা হল পেশির দুর্বলতা বা টিস্যুর ফাঁক তৈরি হওয়া। একবার সেই গঠনগত পরিবর্তন হয়ে গেলে তা শুধুমাত্র কোনও খাবার, ওষুধ বা ঘরোয়া উপায়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে জীবনযাত্রার কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বরং কিছু অভ্যাস হার্নিয়ার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। যেমন অতিরিক্ত ওজন কমানো, কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো, ধূমপান বন্ধ করা এবং ভারী জিনিস না তোলা। এগুলি হার্নিয়ার অগ্রগতি কিছুটা ধীর করতে পারে এবং ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষত যাঁদের হাইয়াটাল হার্নিয়া রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অল্প অল্প করে বারবার খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।
অনেকেই হার্নিয়া বেল্ট বা ট্রাস ব্যবহার করেন। এই ধরনের বেল্ট ফোলা অংশকে কিছুটা চেপে ধরে রাখে বলে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু এটিকে চিকিৎসা বলে ভুল করা উচিত নয়। কারণ বেল্ট ব্যবহারে হার্নিয়ার গঠনগত সমস্যা দূর হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ভুলভাবে ব্যবহার করলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ধরনের সহায়ক সামগ্রী ব্যবহার করা ঠিক নয়।
আরও একটি প্রচলিত ধারণা হল, মালিশ বা ম্যাসাজের মাধ্যমে হার্নিয়াকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা বিপজ্জনক। কারণ জোরে চাপ প্রয়োগ করলে আক্রান্ত অংশে আঘাত লাগতে পারে, প্রদাহ বাড়তে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে জটিল অবস্থাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যদি অন্ত্র কোনও অংশে আটকে যায়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, অনেক রোগী দীর্ঘদিন ঘরোয়া চিকিৎসার উপর নির্ভর করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। ফলে এমন এক সময় আসে, যখন হার্নিয়া জটিল আকার ধারণ করে। যদি ফোলা অংশ শক্ত হয়ে যায়, তীব্র ব্যথা শুরু হয়, বমি হতে থাকে বা ফোলা অংশ আর ভেতরে না যায়, তাহলে সেটি জরুরি চিকিৎসার পরিস্থিতি হতে পারে। এই অবস্থাকে অবহেলা করলে অন্ত্রের রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা জীবনহানির কারণও হতে পারে।
বর্তমানে হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও উন্নত। ল্যাপারোস্কোপিক বা মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। তাই শুধুমাত্র অপারেশনের ভয় থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। চিকিৎসকেরা রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, উপসর্গের মাত্রা এবং হার্নিয়ার ধরন বিচার করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরোয়া উপায়কে সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়। ইন্টারনেটের তথ্য বা লোকমুখে শোনা পরামর্শের উপর নির্ভর না করে বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ হার্নিয়া এমন একটি সমস্যা, যা অনেক সময় দীর্ঘদিন নীরব থাকলেও হঠাৎ জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং হার্নিয়ার ব্যথা কমাতে কিছু জীবনযাত্রাগত পরিবর্তন উপকারী হলেও শুধুমাত্র ঘরোয়া উপায়ের উপর ভরসা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সাময়িক স্বস্তির আড়ালে অনেক সময় বড় বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ থাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।