11th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মহিলারা নাকি পুরুষদের সুখ সহ্য করতে পারেন না! ভাইরাল দাবির পিছনে কতটা সত্য?

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


সামাজিক মাধ্যমের যুগে প্রতিদিনই নতুন নতুন মতামত, গবেষণার দাবি কিংবা সম্পর্ক বিষয়ক তত্ত্ব ভাইরাল হয়। এর মধ্যে কিছু তথ্য বাস্তবের ভিত্তিতে তৈরি হলেও অনেক দাবিই হয় অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর বা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সম্প্রতি এমনই একটি দাবি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে—‘মহিলারা নাকি পুরুষদের সুখ সহ্য করতে পারেন না।’ কেউ বলছেন, কোনও পুরুষ জীবনে সফল হলে বা নিজের মতো সুখে থাকলে মহিলারা তা মেনে নিতে পারেন না। আবার কেউ দাবি করছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েনের নেপথ্যেও নাকি এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে।এই ধরনের বক্তব্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণও রয়েছে। সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিবাহ কিংবা নারী-পুরুষের পারস্পরিক আচরণ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বরাবরই বেশি। ফলে কোনও চটকদার মন্তব্য বা বিতর্কিত দাবি সহজেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ধারণার পিছনে আদৌ কোনও মনস্তাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে কি? নাকি এটি কেবল একটি সামাজিক স্টিরিওটাইপ, যা নারী ও পুরুষ—উভয়ের সম্পর্ককে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে?মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের আবেগ এবং আচরণকে শুধুমাত্র লিঙ্গের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত সরলীকৃত একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কোনও ব্যক্তি অন্যের সুখ, সাফল্য বা আনন্দ দেখে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, তা নির্ভর করে তাঁর ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের প্রকৃতির উপর। শুধুমাত্র তিনি নারী বা পুরুষ বলেই তাঁর আচরণ নির্ধারিত হয় না।আসলে এই ধরনের দাবির উৎস অনেক সময় ঈর্ষা বা সামাজিক তুলনার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। মনোবিজ্ঞানে ‘সোশ্যাল কম্প্যারিজন’ বা সামাজিক তুলনা একটি পরিচিত বিষয়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করে। সহকর্মী পদোন্নতি পেলে, বন্ধু নতুন বাড়ি কিনলে বা পরিচিত কেউ বিশেষ সাফল্য অর্জন করলে অনেকের মধ্যেই হিংসা, অস্বস্তি বা অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।গবেষণায় দেখা গেছে, ঈর্ষা বা তুলনামূলক অস্বস্তি কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এটি একটি মানবিক আবেগ। তবে এর প্রকাশভঙ্গি ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে। কেউ সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান, কেউ নিজের মধ্যে রাখেন, আবার কেউ তা ইতিবাচক প্রেরণায় পরিণত করেন। ফলে কোনও নারী কোনও পুরুষের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হতে পারেন, যেমন কোনও পুরুষও কোনও নারীর সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। এটিকে একটি লিঙ্গের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা ভুল।সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের ধারণার পিছনে দীর্ঘদিনের কিছু সামাজিক ধ্যানধারণাও কাজ করে। বহু সমাজে পুরুষদের সাফল্যকে শক্তি, প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে মহিলাদের আবেগপ্রবণ, প্রতিযোগিতাবিমুখ বা সম্পর্ককেন্দ্রিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই ধরনের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক সময় এমন ভুল সিদ্ধান্ত তৈরি হয় যে, কোনও নারী যদি কোনও পুরুষের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা সমালোচনা করেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই তাঁর সুখ সহ্য করতে পারছেন না। অথচ বাস্তবে সেই সমালোচনার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্নও হতে পারে।সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পারস্পরিক সমর্থন। কোনও সম্পর্ক যদি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং যোগাযোগের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে এক পক্ষের সাফল্যে অন্য পক্ষ সাধারণত আনন্দই অনুভব করেন। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর সাফল্যে আন্তরিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করতে পারা সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে ‘ক্যাপিটালাইজেশন’ বলা হয়, যেখানে একজন নিজের সুখের অভিজ্ঞতা অন্যজনের সঙ্গে ভাগ করে নেন এবং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পান।তবে সব সম্পর্ক যে এমন হবে, তা নয়। কোনও সম্পর্কে যদি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা অবহেলার অনুভূতি থাকে, তাহলে একজনের সাফল্য অন্যজনের কাছে হুমকি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিকে নারী বা পুরুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি সম্পর্কের গুণগত অবস্থার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।সামাজিক মাধ্যম এই ধরনের বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। কারণ সেখানে জটিল সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে অনেক সময় কয়েকটি বাক্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ‘সব মহিলা এমন’, ‘সব পুরুষ তেমন’—এই ধরনের সাধারণীকরণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না। বরং তা ভুল ধারণা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়াতে পারে।বিশেষজ্ঞরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন। অনেক সময় কোনও ব্যক্তি নিজের ব্যর্থতা বা হতাশার কারণ খুঁজতে গিয়ে অন্যকে দায়ী করতে চান। তখন তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তাঁর সাফল্যের পথে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মানসিকতা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই দেখা যেতে পারে। ফলে ‘মহিলারা পুরুষদের সুখ সহ্য করতে পারেন না’—এই ধরনের বক্তব্য অনেক সময় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাধারণীকরণ মাত্র।বাস্তব জীবনের উদাহরণও ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা বা ব্যবসার জগতে অসংখ্য নারীকে দেখা যায়, যাঁরা তাঁদের স্বামী, সহকর্মী, বন্ধু বা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সাফল্যে সক্রিয়ভাবে পাশে থাকেন। আবার পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় সত্য। মানুষে মানুষে সহযোগিতা, সমর্থন এবং উৎসাহের উদাহরণ সমাজে অনেক বেশি, যদিও সেগুলি ভাইরাল হয় কম।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনও ব্যক্তির সুখ বা সাফল্য অন্যের মধ্যে যে আবেগ তৈরি করবে, তা নির্ভর করে তাঁর আত্মপরিচয় এবং আত্মসম্মানবোধের উপর। যাঁদের আত্মবিশ্বাস বেশি, তাঁরা সাধারণত অন্যের সাফল্যকে হুমকি হিসেবে দেখেন না। বরং তা থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারেন। অন্যদিকে আত্মমর্যাদাবোধে ঘাটতি থাকলে তুলনা ও ঈর্ষার প্রবণতা বাড়তে পারে। এই বিষয়টি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।তাই ‘মহিলারা পুরুষদের সুখ সহ্য করতে পারেন না’—এই ভাইরাল দাবিটি বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি সরলীকৃত এবং বিভ্রান্তিকর। মানুষের আচরণকে শুধুমাত্র লিঙ্গের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা যেমন বৈজ্ঞানিক নয়, তেমনই সামাজিকভাবেও ক্ষতিকর। সম্পর্কের জটিলতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক পরিবেশ এবং মানসিক অবস্থার মতো বহু বিষয় মানুষের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

অতএব, কোনও ভাইরাল বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার আগে তার পিছনের তথ্য ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি। কারণ সম্পর্কের জগতে নারী ও পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে বোঝার চেষ্টা করাই বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যায়। সুখ, সাফল্য, ঈর্ষা কিংবা সমর্থন—এসবই মানবিক অনুভূতি, কোনও একক লিঙ্গের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়।

Archive

Most Popular

মহিলারা নাকি পুরুষদের সুখ সহ্য করতে পারেন না! ভাইরাল দাবির পিছনে কতটা সত্য?

11th Jul 2026

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি

Read More
সবুজ পাহাড়, মেঘের ছোঁয়া আর হিমালয়ের রূপ, সিকিম কি ডাকছে আপনাকে?

11th Jul 2026

ভ্রমণ

নিজস্ব প্রতিনিধি

Read More