18th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

সুস্থ অন্ত্রের চাবিকাঠি কি প্রোবায়োটিক? জানুন বিশেষজ্ঞদের মত !

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি



স্বাস্থ্য সচেতনতার জগতে গত কয়েক বছরে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘প্রোবায়োটিক’। বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যম, স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্লগ কিংবা চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়ই শোনা যায় যে সুস্থ অন্ত্রের জন্য প্রোবায়োটিক অপরিহার্য। অনেকেই মনে করেন, নিয়মিত প্রোবায়োটিক খেলে হজমশক্তি বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হয়, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যেরও উপকার হয়। বাজারে প্রোবায়োটিক দই, পানীয়, ক্যাপসুল এবং নানা ধরনের খাদ্যপণ্যও ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রোবায়োটিক কি সত্যিই সুস্থ অন্ত্রের চাবিকাঠি? নাকি বিষয়টি বাস্তবে আরও জটিল?চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রোবায়োটিক হল এমন জীবন্ত অণুজীব, যা পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু ইস্টকে প্রোবায়োটিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের শরীরের অন্ত্রে লক্ষ-কোটি অণুজীবের বাস, যাদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় ‘গাট মাইক্রোবায়োম’। এই অণুজীবগুলির অনেকেই হজম, পুষ্টি শোষণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।একসময় মনে করা হত, শরীরে ব্যাকটেরিয়া মানেই ক্ষতিকর কিছু। কিন্তু আধুনিক গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষের শরীরের অসংখ্য অণুজীব আসলে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অন্ত্রে থাকা এই উপকারী জীবাণুগুলি খাদ্য ভাঙতে সাহায্য করে, কিছু ভিটামিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রোবায়োটিক নিয়ে আগ্রহের মূল কারণ এখানেই। ধারণা করা হয়, নির্দিষ্ট কিছু উপকারী জীবাণু গ্রহণ করলে অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এই বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ সব প্রোবায়োটিক একই রকম কাজ করে না এবং সব মানুষের শরীরেও এর প্রভাব একরকম হয় না।গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রোবায়োটিক উপকারী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে অনেক সময় অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুসমষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট প্রোবায়োটিক উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে কিছু ধরনের ডায়রিয়া, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-সম্পর্কিত ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রোবায়োটিকের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য রয়েছে।এছাড়া ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিএস-এর মতো কিছু হজমজনিত সমস্যায়ও নির্দিষ্ট প্রোবায়োটিক উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এখানেও মনে রাখতে হবে, সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যায় না। কারও ক্ষেত্রে উপকার মিললেও অন্য কারও ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন নাও দেখা যেতে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়েও ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ নামে পরিচিত একটি জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বলছেন, যার মাধ্যমে অন্ত্র এবং মস্তিষ্ক একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। এই কারণেই অনেকেই দাবি করেন, প্রোবায়োটিক উদ্বেগ, মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে। যদিও এ বিষয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও তথ্য প্রয়োজন।প্রোবায়োটিকের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি কিছু ভুল ধারণাও তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, প্রোবায়োটিক যত বেশি খাওয়া যাবে, তত বেশি উপকার হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ধারণা সঠিক নয়। কারণ অন্ত্রের স্বাস্থ্য শুধু প্রোবায়োটিকের উপর নির্ভর করে না। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, ঘুম, মানসিক চাপ, শারীরিক কার্যকলাপ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।আসলে অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টিকে সুস্থ রাখতে শুধু উপকারী জীবাণু গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, তাদের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত পরিবেশও প্রয়োজন। এখানেই আসে ‘প্রিবায়োটিক’-এর ভূমিকা। প্রিবায়োটিক হল এমন কিছু খাদ্য উপাদান, যা অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর খাদ্য হিসেবে কাজ করে। কলা, পেঁয়াজ, রসুন, ওটস, ডাল এবং বিভিন্ন ধরনের ফল ও শাকসবজিতে প্রিবায়োটিক উপাদান পাওয়া যায়। ফলে শুধুমাত্র প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার বদলে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।পুষ্টিবিদদের মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রোবায়োটিক গ্রহণ করাই অনেক ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হতে পারে। দই, ঘরে তৈরি টক দই, কিছু ফারমেন্টেড খাদ্য এবং ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবারে প্রাকৃতিকভাবে উপকারী অণুজীব থাকতে পারে। তবে কোন খাদ্যে কত পরিমাণ এবং কী ধরনের জীবাণু রয়েছে, তা সবসময় নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তাই কোনও নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধুমাত্র খাদ্যের উপর নির্ভর করা উচিত নয়।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাজারে পাওয়া সব প্রোবায়োটিক পণ্যের কার্যকারিতা এক নয়। কোন জীবাণু ব্যবহার করা হয়েছে, কত পরিমাণে রয়েছে, সংরক্ষণের পদ্ধতি কেমন এবং সেই জীবাণু শরীরে পৌঁছে কার্যকর থাকতে পারছে কি না—এসব বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ফলে শুধুমাত্র ‘প্রোবায়োটিক’ লেখা রয়েছে বলেই কোনও পণ্যকে সমানভাবে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে অকারণে প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সবসময় থাকে না। বেশিরভাগ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুমই অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার মূল ভিত্তি। বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সেটিকে অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।বর্তমান গবেষণা অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—অন্ত্রের স্বাস্থ্য সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই হজমের সমস্যা, বারবার পেটের অস্বস্তি বা দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের সমস্যাকে অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু এটিকে একমাত্র চাবিকাঠি বলা অতিসরলীকরণ হবে। সুস্থ অন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত আঁশ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা। প্রোবায়োটিক সেই বৃহত্তর ছবির একটি অংশ মাত্র। তাই বিজ্ঞাপনের প্রলোভন বা ভাইরাল দাবির বদলে বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুস্থ অন্ত্রের পথ কোনও একক খাদ্য বা সাপ্লিমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে।

Archive

Most Popular