18th Jul 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

গরম পড়লেই কেন বাড়ে গ্যাস, অম্বল আর বদহজমের সমস্যা?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


গরমকাল এলেই অনেকেরই এক পরিচিত সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। খাওয়ার পর পেট ভার লাগা, বুক জ্বালা, ঢেকুর ওঠা, অম্বল, গ্যাস জমে থাকা কিংবা বদহজমের মতো উপসর্গ হঠাৎ করেই যেন বেড়ে যায়। কেউ ভাবেন, হয়তো আগের রাতের খাবার ঠিকমতো হজম হয়নি। কেউ আবার দোষ দেন অতিরিক্ত মশলাদার খাবারকে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, গ্রীষ্মকালে হজমজনিত সমস্যা বাড়ার পিছনে শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, আবহাওয়া এবং শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।তাপমাত্রা বাড়লে আমাদের শরীরকে নিজেকে ঠান্ডা রাখতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই সময় শরীরের একটি বড় অংশের রক্তপ্রবাহ ত্বকের দিকে চলে যায়, যাতে ঘামের মাধ্যমে তাপ বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে হজমপ্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় রক্তসঞ্চালনে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। যদিও সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত গুরুতর সমস্যা তৈরি করে না, তবে যাঁদের আগে থেকেই হজমের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়তে পারে।গরমের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে শরীরের জলীয় ভারসাম্যের উপর। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে প্রচুর জল এবং খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত জল না খেলে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে জলের ঘাটতি হলে হজমপ্রক্রিয়াও প্রভাবিত হয়। অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা বাড়তে পারে এবং পেটে অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় কোষ্ঠকাঠিন্য থেকেই গ্যাস এবং পেট ফাঁপার সমস্যা শুরু হয়।গরমের দিনে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে অনেকেরই ক্ষুধা কমে যায়। কেউ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন, আবার কেউ হালকা কিছু খেয়ে দিন কাটিয়ে দেন। দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে পাকস্থলীতে উৎপন্ন অ্যাসিড জমতে থাকে, যা অনেকের ক্ষেত্রে অম্বল বা বুক জ্বালার কারণ হতে পারে। আবার দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে বেশি খাবার খেলে হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।এই সময় রাস্তার খাবার এবং ঠান্ডা পানীয়ের চাহিদাও বেড়ে যায়। শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অনেকেই বরফ দেওয়া পানীয়, ফাস্ট ফুড বা অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ধরনের খাবার হজমে তুলনামূলক বেশি সময় নেয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে গ্যাস বা অম্বলের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও বেশি দেখা যায়।গ্রীষ্মকালে খাদ্যে বিষক্রিয়া এবং পেটের সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে খাবারটি দূষিত হয়ে গিয়েছে। সেই খাবার খাওয়ার পর পেটব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, গ্যাস বা বদহজমের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই গরমের সময়ে খাবার সংরক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।বিশেষজ্ঞরা আরও একটি কারণের দিকে নজর দিচ্ছেন—মানসিক চাপ। গরমের কারণে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি এবং বিরক্তিভাব বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ এবং হজমের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্ক এবং অন্ত্রের মধ্যে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, তাকে ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ বলা হয়। মানসিক চাপ বাড়লে হজমের স্বাভাবিক ছন্দও বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে গ্যাস, অম্বল বা পেটের অস্বস্তি বেড়ে যেতে পারে।অনেকের ক্ষেত্রে গরমের দিনে অতিরিক্ত চা, কফি বা সফট ড্রিঙ্ক খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যদিও এগুলি সাময়িকভাবে সতেজতা দিতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফিন পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়াতে পারে। ফলে অম্বল বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের উপসর্গ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত কার্বনেটেড পানীয় অনেকের ক্ষেত্রে পেটে গ্যাস জমার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।চিকিৎসকদের মতে, গরমকালে হজমের সমস্যা এড়াতে কিছু সহজ অভ্যাস অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। পর্যাপ্ত জল পান করা তার মধ্যে অন্যতম। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী জল খেলে হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি মৌসুমি ফল, শাকসবজি এবং আঁশযুক্ত খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তরমুজ, শসা, ডাবের জল কিংবা লেবুর শরবতের মতো জলসমৃদ্ধ খাবার গরমে শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।খাবারের সময় এবং পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থেকে অল্প অল্প করে নিয়মিত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত বা ভারী খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া ভালো। বিশেষ করে রাতে দেরি করে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা অম্বলের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।যাঁদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের মতো সমস্যা রয়েছে, তাঁদের গরমকালে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এই সময় উপসর্গের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চলতে থাকলে বা উপসর্গের তীব্রতা বাড়লে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের ‘ডিটক্স ড্রিঙ্ক’ বা ‘ম্যাজিক হোম রেমেডি’-র প্রচার দেখা যায়, যেগুলি নাকি মুহূর্তের মধ্যে গ্যাস ও অম্বল দূর করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দাবির অধিকাংশেরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বা ভুল উপাদান ব্যবহার করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই কোনও ঘরোয়া উপায় নিয়মিত অনুসরণ করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।গরমের সঙ্গে হজমের সমস্যার সম্পর্ক বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য। তবে এটি কোনও অবশ্যম্ভাবী সমস্যা নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জলপান, পরিচ্ছন্ন খাবার এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এই অস্বস্তি এড়ানো সম্ভব। শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

অতএব, গ্রীষ্মকাল এলেই গ্যাস, অম্বল বা বদহজম বেড়ে যাওয়ার পিছনে শুধুমাত্র খাবার দায়ী নয়; আবহাওয়া, জলশূন্যতা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং জীবনযাপনের নানা দিকও এর সঙ্গে জড়িত। তাই সমস্যার মূল কারণ বুঝে সচেতন পদক্ষেপ নিলেই গরমের দিনগুলো আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলা সম্ভব।

Archive

Most Popular