প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কাজ মোবাইল হাতে নেওয়া, অফিস বা কলেজে যাওয়ার পথে সামাজিক মাধ্যম স্ক্রোল করা, কাজের ফাঁকে ফাঁকে রিল দেখা, আবার রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও ফোনে চোখ রাখা—আজকের দিনে এই অভ্যাস অনেকের কাছেই পরিচিত। কখন যে কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নেওয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টার স্ক্রোলিংয়ে পরিণত হয়, তা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না। সামাজিক মাধ্যম, শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অবিরাম ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে আমরা যেন ক্রমশ পর্দানির্ভর হয়ে উঠছি।তবে এই অভ্যাসকে ঘিরে একটি প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে—ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রোলিং কি সত্যিই মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে? সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, অতিরিক্ত স্ক্রোলিংয়ের ফলে মনোযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, স্মৃতিশক্তি কমছে, এমনকি মস্তিষ্কের গঠনও বদলে যাচ্ছে। কিন্তু এই দাবিগুলির পিছনে কতটা বিজ্ঞান রয়েছে?বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মস্তিষ্কের ক্ষতি’ কথাটি অনেক সময় অতিরঞ্জিতভাবে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে সাধারণ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার সরাসরি মস্তিষ্ককে ধ্বংস করে দেয়। তবে গবেষণায় এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রোলিং মস্তিষ্কের কাজ করার ধরন, মনোযোগের ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় সম্ভব সেখানে কাটান। একটির পর একটি ভিডিও, অন্তহীন নিউজফিড, নতুন নোটিফিকেশন এবং আকর্ষণীয় কনটেন্ট আমাদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়। প্রতিবার নতুন কিছু দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হতে পারে, যা আনন্দ বা প্রত্যাশার অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। ফলে মানুষ বারবার ফোন চেক করার প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন মস্তিষ্ক ক্রমাগত নতুন উদ্দীপনার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন ভিডিও, নতুন ছবি বা নতুন তথ্য পাওয়ার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যদিও এটি স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি নয়, তবে মনোযোগের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে।বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা বাড়ছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত থাকে, তাদের মধ্যে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সামাজিক মাধ্যমই একমাত্র কারণ। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, জীবনযাত্রা এবং অন্যান্য পরিবেশগত কারণও এখানে ভূমিকা পালন করে।অতিরিক্ত স্ক্রোলিংয়ের সঙ্গে ঘুমের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই রাতে বিছানায় শুয়ে ফোন ব্যবহার করেন এবং ঘুমের সময় পিছিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে অনেক সময় মানুষ মনে করেন স্ক্রোলিংয়ের কারণে তাঁদের মস্তিষ্ক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, অথচ এর নেপথ্যে আসলে দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি কাজ করছে।মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যের জীবন, সাফল্য, ভ্রমণ বা বাহ্যিক সুখের ছবি দেখতে দেখতে অনেকের মধ্যে তুলনামূলক অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের সমস্যা এবং মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে। যদিও এই অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়, তবুও অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তথ্যের অতিরিক্ত চাপ। প্রতিদিন আমরা এত বেশি তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছি যে মস্তিষ্ককে ক্রমাগত সেগুলি প্রক্রিয়া করতে হচ্ছে। একে অনেক সময় ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ বলা হয়। এর ফলে মানসিক ক্লান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং মনোযোগের বিচ্যুতি বাড়তে পারে। অনেকেই অনুভব করেন যে তাঁরা সারাদিন ব্যস্ত থেকেও কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে অতিরিক্ত ডিজিটাল বিভ্রান্তির ভূমিকা থাকতে পারে।তবে প্রযুক্তিকে একতরফাভাবে দায়ী করাও ঠিক নয়। স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যম যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং সৃজনশীলতার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং ব্যবহারের ধরনে। সীমিত এবং সচেতন ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম। অর্থাৎ আমরা যেভাবে অভ্যাস গড়ে তুলি, মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে সেই অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেয়। যদি দিনের বড় অংশ দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল কনটেন্টের মধ্যে কাটে, তাহলে গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয় এমন কাজ তুলনামূলক কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু সুখবর হল, সচেতন অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ পদক্ষেপের উপর জোর দিচ্ছেন। যেমন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, শোয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার কমানো এবং দিনের কিছু সময় সম্পূর্ণ প্রযুক্তিমুক্ত রাখা। এছাড়া বই পড়া, শরীরচর্চা, ধ্যান বা প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর মতো অভ্যাস মনোযোগ এবং মানসিক সুস্থতার জন্য উপকারী হতে পারে।অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিশুরা বড়দের আচরণ দেখেই শেখে। যদি পরিবারে সবাই সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুদের মধ্যেও একই অভ্যাস তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।সব মিলিয়ে বলা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রোলিং সরাসরি মস্তিষ্ককে নষ্ট করে দেয়—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রোলিং মনোযোগ, ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন কার্যক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির নয়, বরং মস্তিষ্কের কাজ করার অভ্যাসে পরিবর্তনের।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা সম্ভব নয়, আবার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু নিজের সময়, মনোযোগ এবং মানসিক সুস্থতার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতাকে সুস্থ পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদেরই।